এতে একটা জটিল ব্যাপার খুবই সহজ হইয়া গেল। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে ভারত কাজে-কর্মে চার-পাঁচ মাস আগে হইতেই প্রত্যক্ষভাবে জড়াইয়া পড়িয়াছিল। তেমনভাবে জড়াইয়া পড়িবার ন্যায়নৈতিক, রাজনৈতিক, সামরিক, অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক অনেক সংগত কারণ ছিল। সে সব কারণের কথা আমি আমার একাধিক বই-এ লিখিয়াছি। এই বইয়েও পরে বলিব। এখানে শুধু এইটুকু বলা দরকার যে ওসব কারণ সত্ত্বেও ভারত আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের মাটিতে তার সৈন্যবাহিনী নামাইতে পারিতেছিল না। আন্তর্জাতিক নিয়ম-কানুন তার প্রতিবন্ধক ছিল। অক্টোবর নবেম্বর পর্যন্ত প্রায় আশি-নব্বই লক্ষ বাংলাদেশী নাগরিক যখন ভারতে শরণার্থী হইয়াছে, তার ফলে ভারতের অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক বিপর্যয় ঘটিয়াছে, তখন ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী সেটাকে সিভিল এগ্রেশন (দেওয়ানী আগ্রাসন) বলিতে পারিয়াছেন। কিন্তু সে কারণে পূর্ব-পাকিস্তানের সৈন্য নামাইতে পারেন নাই। ফর্মালি মানে দস্তর মাফিক পারেন নাই। ইনফর্মালি, বে-দস্তুরভাবে, পারিয়াছেন এবং যথেষ্ট করিয়াছেন। মুক্তি ফৌজ গঠনে, প্রশিক্ষণ ও পরিচালনে প্রচুর অর্থ ও লোক নিয়োগ করিয়াছেন। তাঁদের সহায়তায় ও আবরণে পূর্ব-পাকিস্তানের ভূমি দখলও করিয়াছেন। কিন্তু আন্তর্জাতিক কানুনহেতু এ সবই করিতে হইয়াছে মুক্তিবাহিনীর নামে। তাতে এ কাজে প্রচুর অর্থ ও দীর্ঘ সময় নষ্ট হয়। দস্তুর মাফিক, সুতরাং প্রকাশ্যভাবে, ভারত যদি পূর্ব পাকিস্তান আক্রমণ করিতে পারে, তবে এক সপ্তাহেই দখল সমাপ্ত করিতে পারে। ১৯৫৫ সালে জেনারেল আইউবের এস্টিমেট ছিল ছয় দিন। ১৯৭১ সালের ভারতীয় বাহিনী ন দিনে এ কাজ সমাপ্ত করিয়াছিল। জেনারেল আইউবের আযে খুব ভুল ছিল না।
৩রা ডিসেম্বর পাকিস্তান সরকার ভারতের পাতা ফাঁদে পা দিয়া এই কাজটিই সহজ করিয়া দিলেন। পাকিস্তান আক্রমণ করা ভারতের উদ্দেশ্য ছিল না। শুধু পূর্ব পাকিস্তান স্বাধীন করাই তার উদ্দেশ্য ছিল। কাজেই ৩রা ডিসেম্বর শেষ রাত্রে ভারতীয় সৈন্যবাহিনী পশ্চিম-পাকিস্তানে হামলা করিল বটে, দ্রুতবেগে অনেক জমি দখলও করিল বটে, কিন্তু তাদের আসল উদ্দেশ্য ছিল বাংলাদেশ মুক্ত করা। এই উদ্দেশ্যেই ভারত সরকার কালবিলম্ব না করিয়া স্বাধীন স্বার্বভৌম বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিলেন। বাংলাদেশের জনগণ পক্ষে থাকায় ভারতীয় বাহিনী অতি সহজেই এটা সম্পন্ন করিল। দুধ পাক-বাহিনীর এক লক্ষ সৈন্য কিছুই কাজে আসিল না। ভারতীয় বাহিনী ঝড়ের বেগে অগ্রসর হইতে থাকিল। আর সে ঝড়ের মুখে পাক-বাহিনী স্রোতের মুখে তৃণখন্ডের মত ভাসিয়া গেল। কথাটা নিতান্ত ভাষার অলংকার নয়। সত্য-সত্যই ভারতীয় বাহিনীর ৩রা ডিসেম্বরের হামলার দুই-তিন দিনের মধ্যেই, মানে ৬ই/৭ই ডিসেম্বর তারিখেই ঢাকার বিমানঘাটি নীরব হইয়া গেল। দুই একবারের বেশি আকাশ যুদ্ধ হইল না। বিমান-ধ্বংসী কামানের আওয়ায় একদিনেই নিস্তব্ধ হইয়া গেল। ভারতীয় বোমারু বিমান ঝাকে-ঝাকে একরূপ বিনা-বাঁধায় তেজগাঁও বিমান বন্দরে, কুর্মিটোলা বিমানঘাঁটিতে ও ছাউনিতে বেদেরেগ হামলা চালাইতে লাগিল। খোদ ঢাকা নগরীর উপর দিয়া, বলিতে গেলে আমাদের কানের কাছ দিয়া, ভারতীয় জংগী বিমান ভন ভন করিয়া উড়িয়া যাইতে লাগিল। কিন্তু শহরের অসামরিক অঞ্চলে বোমা ফেলিল না।
৬ই/৭ই ডিসেম্বরেই চৌগাছাসহ যশোর ছাউনি ও পূর্ব দিকে কুমিল্প ছাউনির পতন ঘটিল। ৮ই ডিসেম্বর হইতে ভারতীয় প্রধান সেনাপতি জেনারেল মানিকশাহ্ পাক-বাহিনীকে আত্মসমর্পণের আহবান জানাইলেন। পাক-বাহিনীর জিতিবার আর কোনও আশা নাই, আত্মসমর্পণ করা ছাড়া তাদের গত্যন্তর নাই, আত্মসমর্পণ করিলে জেনেভা কনভেনশন অনুসারে তাঁদের প্রতি সদ্ব্যবহার করা হইবে, ইত্যাদি ভাল-ভাল আশ্বাসবাণী দিয়া এই আত্মসমর্পণের আহ্বান সারাদিন আকাশবাণী হইতে পুনরুচ্চারিত হইতে লাগিল। ইংরেজী, উর্দু, বাংলা, পুশতু ভাষায় মুদ্রিত এই আহ্বানের লাখ লাখ কপি হাওয়াই জাহাজ হইতে ছড়ান হইতে লাগিল। পাক-বাহিনীও লড়াই ছাড়িয়া আত্মসমর্পণের জন্য প্রস্তুত হইতেছে, মনে হইল। কিন্তু আত্মসমর্পণ করিল না।
অবশেষে ১৪ই ডিসেম্বর ভারতীয় বিমান গবর্নর হাউস আক্রমণ করিল। গবর্নর ডাঃ এ. এম. মালিক ও তাঁর মন্ত্রিসভা পদত্যাগ করিয়া হোটেল ইন্টারকনে নিউট্রাল যোনে আশ্রয় নিলেন।
ঢাকার জনতা তখন রাস্তায় নামিয়া উল্লাস করিতেছিল। ঝাঁকে ঝাঁকে ভারতীয় বিমানের হামলার সময়েও জনতা রাস্তায় রাস্তায়, খোলা ময়দানে ও বাড়ির ছাদে ভিড় করিয়া তামাশা দেখিতেছিল। যেন বিমান মহড়া বা ঈদের চাঁদ দেখিতেছে। জনগণের উল্লাস-ধ্বনির মধ্যে ভারতীয় বাহিনী ১৬ই ডিসেম্বর ঢাকায় প্রবেশ করিল। পাক বাহিনী আত্মসমর্পণ করিল। ভারতীয় প্রধান সেনাপতি জেনারেল মানিকশার আশ্বাসমাফিক পাক-বাহিনীর সকলকে ভারতে নিয়া যাওয়া হইল ক্রুদ্ধ জনতার রোষ হইতে তাঁদেবোঁচাইবার উদ্দেশ্যে।
বাংলাদেশ স্বাধীন হইল। পাক-বাহিনীর দখলমুক্ত হইয়া বাংলাদেশের জনতা আনন্দ-উল্লাসের মধ্য দিয়া স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলিল।
স্বস্তি আসিল। কিন্তু শান্তি আসিল না। কারণ আমাদের প্রবাসী সরকার আরও ৮/১০ দিন কলিকাতা হইতে ঢাকায় আসিলেন না। তাঁদের অনুপস্থিতিতেই জনতা উল্লাস করিতে লাগিল। ভারতীয় সৈন্য ও সেনাপতিদের সাথে জনতা কোলাকুলি করিতে লাগিল। বহুদিন পরে দোকান-পাট খুলিল। সেসব দোকনপাট হইতে ভারতীয় সৈন্যদেকৃতজ্ঞতার উপহার দেওয়া হইল। সর্বত্র উল্লাস। এত উল্লাসের মধ্যে দোকানী ও জনতা একটা মজার অভিজ্ঞতা লাভ করিল। যালেম্বু পাঞ্জাবী সৈন্যের মতই এই বন্ধু ভারতীয় সৈন্যেরাও উর্দু ভাষায় কথা কয়, কি আশ্চার্য। ওরা তবে একই অঞ্চলের একই ভাষার লোক। কিন্তু ব্যবহারে কত পার্থক্য।
