৯. পাকিস্তানের আক্রমন
ভারতের বিরুদ্ধে সত্য-মিথ্যা অভিযোগ করিয়া কার্যতঃ ও পরিণামে পাকিস্তানের সামরিক শাসন-কর্তারা ভারতের সুবিধা করিয়াই দিতেছিলেন। পূর্ব-পাকিস্তানের অসন্তোষ ও বিদ্রোহ যে পরিণামে ভারতের স্বার্থেরই অনুকূল, এটা ভারত সরকার ও ভারতীয় জনগণ বরাবর বুঝিতেন। যে-কোন কান্ডজ্ঞানীরই তা বুঝিবার কথা। পাকিস্তানী শাসকদের তা বুঝা উচিৎ ছিল। কিন্তু তাঁরা তা বুঝেন নাই বলিয়াই মনে হয়। এ অবস্থা ভারতের অনুকূল হওয়ায় ভারত সরকার ও ভারতবাসী যে পূর্ব পাকিস্তানের অসন্তোষে ও বিদ্রোহে ইন্ধন যোগাইবেন, এটাও স্বাভাবিক। সবাই এমন করেন। পাকিস্তানীরাও সুযোগ পাইলে তাই করিতেন। এটা পাকিস্তানী শাসকরাও নিশ্চয় বুঝিয়াছিলেন। কিন্তু রাজনৈতিক প্রজ্ঞার অভাবে তার প্রতিকার করিতে পারেন নাই। বরঞ্চ নির্বুদ্ধিতার দরুন ভারতের উদ্দেশ্য পূরণের সহায়তাই করিয়াছেন। ফলে ২৭শে হইতে ৩০শে মার্চ পর্যন্ত ভারতীয় লোকসভার বিতর্কে ও প্রস্তাবটায় যে টুকুন ভূল ছিল, পাকিস্তানের শাসকরা ভারতের সে ভুল অসামান্য দ্রুতগতিতে সংশোধন করিয়াছিলেন। গতির সে দ্রুততায় পাকিস্তান ভারতকে অনেক পিছনে ফেলিয়া দিয়াছিল। ভারতের সে দ্রুততা ছিল বস্তুতঃ অতিআগ্রহ ও অতিব্যস্ততার ফল। ২৫শে মার্চের শেষ রাত্রে পাক-বাহিনীর হামলার মাত্র একদিন পরেই ভারতীয় লোকসভার বিতর্ক শুরু হওয়ার ব্যাপারটা, বিশেষতঃ তার ভাষা ও মর্ম সবই ছিল অতিরিক্ত ব্যস্ততার অশোভন প্রকাশ। ওটাকে নিরপেক্ষ বিদেশী রাষ্ট্র, সরকার ও নেতারা অতি সহজেই অন্যের আভ্যন্তরীণ ব্যাপারে হস্তক্ষেপ বলিতে পারিতেন এবং বলিয়াও ছিলেন। মার্চ মাসে এটা না করিয়া এপ্রিল মে-জুনে করিলে ভারতকে কেউ দোষ দিতে পারিতেন না। পাক-বাহিনী যখন মিলিটারি এ্যাকশন শুরু করিয়াছে, তখন পূর্ব পাকিস্তানিদের এক বিরাট অংশ ভারত-ভূমিতে আশ্রয় লইবেই, ওটা বরাবরের জানা কথা। দুদিন অপেক্ষা করিয়া শরণার্থীদের ভিড়ের যুক্তিতে ৩০শে মার্চের প্রস্তাবের চেয়েও কঠোর প্রস্তাব গ্রহণ করিলেও ভারতকে কেউ কিছু বলিতে পারিতেন না। ২রা এপ্রিল তারিখে অর্থাৎ মিলিটারি এ্যাশনের সাতদিনের মধ্যে সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রেসিডেন্ট পদগনী প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার নামে যে সুন্দর পত্রখানা লিখিয়াছিলেন, ভারতের প্রেসিডেন্ট ঐরূপ একখানা পত্র লিখিবার পর যদি লোকসভা বিতর্কে বসিত, তবে ব্যাপারটা কতই না সুন্দর হইত। সুন্দর হয় নাই বলিয়াই ওটা অশোভন হইয়াছে। অতি-উৎসাহ, অতি-আগ্রহ ও অতি-ব্যস্ততার সময় অমন এক আধটু অশোভন কাজ হইয়াই থাকে।
কিন্তু পাকিস্তানের শাসকা ভারতের এই ভুল সংশোধন করিয়া দিলেন ৫ই আগস্ট হোয়াইট পেপার বাহির করিয়া এবং ৩রা ডিসেম্বর ভারত আক্রমণ করিয়া পাকিস্তানী শাসকদের মাথায় এটা ঢুকেই নাই যে ভারত এটাই চাইতেছিল। কিন্তু বাইরে এই আগ্রহ চাপিয়া রাখিতেছিল। মার্চ মাসে অতি উৎসাহ দেখাইয়া ভারতীয় নেতৃত্ব যে ভুল করিয়াছিলেন, পরবর্তী আট মাস অসাধারণ ধৈর্য্য ধরিয়া সে চপলতার ক্ষতিপূরণ করিয়াছিলেন।
৩রা ডিসেম্বর (১৯৭১) বিকাল সাড়ে পাঁচটায় (ভারতীয় সময়) পাকিস্তানী বিমান বাহিনী অমৃতসর, পাঠানকোট, শ্রীনগর, অবন্তীপুর, যোধপুর, আলা ও আগ্রা ইত্যাদি ভারতীয় বিমান ঘাটিতে হাওয়াই হামলা চালায়। পাকিস্তান এটা করে কোন যুদ্ধ ঘোষণা না করিয়াই। বিনা-নোটিসে ও বিনা কারণে। জবাবে ভারতীয় বিমান বাহিনী রাত সাড়ে এগারটায় শিয়ালকোট, সারগোদা, মিয়ানওয়ালী, করাচি, রিসালপুর ও লাহোর বিমানঘাটি আক্রমণ করে।
ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে ফর্মাল যুদ্ধ বাঁধিয়া যায়। ভারত ও পাকিস্তান উভয় দেশের রেডিও হইতে এবং বিবিসি ও ভয়েস অব আমেরিকা হইতে যথাসময়ে মোটামুটি একই ধরনের খবর শুনিলাম। স্পষ্টই প্রতীয়মান হইল পাকিস্তানই আগে হামলা করিয়াছে। ভারত জবাবী হামলা করিয়াছে।
তখনই আমার মনে হইয়াছিল পাকিস্তান ভূল করিয়াছে। ভারতের পাতা ফাঁদে পা দিয়াছে। বেশ কিছুদিন ধরিয়া পাকিস্তানের ভুলের আশায় ভারত অপেক্ষা করিতেছিল। ৩রা ডিসেম্বরের সন্ধ্যাকালে পাকিস্তান ভারতের সে আশা পূর্ণ করিল। পাকিস্তানকে দিয়া এই ভূল করাইবার জন্য ভারতকেও কিছু বুদ্ধি-কৌশল ও ফন্দি-ফিকির করিতে হইয়াছিল। সে কৌশলটা ছিল ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী মিসেস ইন্দিরা গান্ধীর ৪ঠা ডিসেম্বরের নির্ধারিত কলিকাতার গড়ের মাঠের জনসভাকে অত্যন্ত অকস্মাৎ ৩রা ডিসেম্বরে আগাইয়া আনা। মিসেস ইন্দিরার কলিকাতার জনসভার সাথে পশ্চিম সীমান্তে আগ্রাসনের একটা অচ্ছেদ্য সম্পর্ক ছিল। সেই সম্পর্মে দরুনই ইন্দিরা গান্ধী ৩রা ডিসেম্বর কলিকাতা জন-সভা করায় পাকিস্তানও ৩রা তারিখে ভারত আক্রমণ করিল। তার ফলে ঐ রাতেই মিসেস গান্ধী তাঁর বেতার ভাষণে বলিতে পারিলেন : ‘বাংলাদেশের যুদ্ধ ভারতেরই যুদ্ধ’। অতঃপর এই ঘোষণা-মতই কাজ হইল। পক্ষান্তরে যদি মিসেস গান্ধী ৩রা ডিসেম্বর কলিকাতা জন-সতা না করিয়া পূর্বনির্ধারিত ৪ঠা তারিখে করিতেন, তবে পাক-বাহিনী ৪ঠা ডিসেম্বর বিকালে পশ্চিম সীমান্ত আক্রমণ করিত। বাংলাদেশের যুদ্ধকে ভারতের যুদ্ধ ঘোষণা করিতে একদিন দেরি হইয়া যাইত। এই একদিন বিলম্বে কি অসুবিধা হইত, তা আরও কেউ-কেউ হয়ত জানিতেন। কিন্তু ভারতের প্রধানমন্ত্রী নিশ্চয়ই জানিতেন। সেই কারণেই তিনি উক্ত সভার উদ্যোক্তা, পশ্চিম-বাংলা সরকার ও কংগ্রেস নেতাদের প্রতিবাদ ও জনগণের অসন্তোষ অগ্রাহ্য করিয়া নির্ধারিত দিনের মাত্র একাদশ ঘন্টায় সভার দিন-ক্ষণ আগাইয়া আনিয়াছিলেন। শ্রীমতি ইন্দিরার বক্তৃতায় সমবেত জনতা নিরাশ ও অসন্তুষ্ট হইয়াছিল। চমকপ্রদ কথা ত তিনি কিছুই বলিলেন না। তবে কেন তিনি এই সভা ডাকিয়াছিলেন? কেনইবা তিনি সেই সভার দিন আগাইয়া আনিলেন? শুধুই কি এটা প্রধানমন্ত্রীর খাম-খেয়াল? পন্ডশ্রম? না। মিসেস গান্ধী জানিতেন, তার উদ্দেশ্য সফল হইয়াছে। এমন সফল সভা তিনি জীবনে আর করেন নাই। কলিকাতা বসিয়াই তিনি খবর পাইলেন, পাকিস্তান ভারতের পশ্চিম সীমান্ত আক্রমণ করিয়াছে। তিনি মুখে গাম্ভীর্য ও দুশ্চিন্তা ফুটাইয়া এবং মনে-মনে হাসিয়া দিল্লী ফিরিয়া গেলেন। নিয়মমাফিক ইমার্জেন্সি ও যুদ্ধ ঘোষণা করিলেন।
