কিন্তু পাকিস্তান সরকারের পক্ষেও যথেষ্ট যুক্তি ছিল। পূর্ব-পাকিস্তানের ব্যাপারে এইবারই ভারত সরকার ও তারতের নেতৃবৃন্দ বরাবরের নিরপেক্ষ নীতি পরিহার করিয়া একটু বেশি মাত্রায়, এমনকি আন্তর্জাতিক নিয়ম-কানুন ও নীতি-প্রথা লংঘন করিয়া, পাকিস্তানের আভ্যন্তরীণ ব্যাপারে সোজাসুজি মত প্রকাশ ও হস্তক্ষেপ করিতে শুরু করেন।
৮. ভারতের উদ্দেশ্য
বলা যাইতে পারে এবং বলা হইয়াছেও যে পূর্ব-পাকিস্তানে পাক সামরিক বাহিনীর বর্বরতায় পাশ্ববর্তী ভারতীয় এলাকায় প্রায় এক কোটি লোক শরণার্থী হওয়ায় ভারতের অভ্যন্তরে যে আর্থিক, সামাজিক, প্রশাসনিক ও আইন-শৃংখলার সমস্যার সৃষ্টি হইয়াছিল, তাতে এ ব্যাপারে কথা বলিবার ও পন্থা গ্রহণ করিবার সম্পূর্ণ অধিকার ভারত সরকারের ও ভারতবাসীর উপর বর্তাইয়াছিল। এর জবাবে বলা যাইতে পারে এবং বলা হইয়াছেও যে ওসব সমস্যা সৃষ্টি হইবার অনেক আগে হইতেই ভারত সরকার ও ভারতবাসীর হস্তক্ষেপ শুরু হইয়াছিল। দৃষ্টান্ত স্বরূপ ২৭শে মার্চের ভারতীয় লোকসভার প্রস্তাবের কথা বলা যায়। ২৫শে মার্চের মধ্যরাত্রে পূর্ব-পাকিস্তানে পাক বাহিনীর হামলা শুরু হয়। ২৭শে মার্চ, মানে একদিনে ভারতের ভূমিতে কোনও শরণার্থী সমস্যা সৃষ্টি হয় নাই। ভারতীয় লোকসভার প্রস্তাবেও কাজেই এ ধরনের কোনও ভারতীয় সমস্যার কথা বলা হয় নাই। প্রস্তাবে যেসব কথা বলা হইয়াছে, তার সবই ভাল-ভাল কথা। কাজেই কারও প্রতিবাদের বা আপত্তির কিছুনাই। পূর্ব-বাংলায় নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নিকট ক্ষমতা হস্তান্তর না করার এবং তার বদলে নগ্ন শক্তি প্রয়োগের নিন্দা করা দোষের নয়। সাড়ে সাত কোটি পূর্ব-বাংগালীর সংগ্রামে সহানুভূতি ও সহায়তার আশ্বাসকেও দোষের বলা যাইতে পারে না। তবে এটাও সত্য কথা যে শরণার্থী-সমস্যা সৃষ্টি হইবার আগে হইতেই ভারত সরকার ও ভারতবাসী পূর্ব পাকিস্তানের রাজনীতিতে, সুতরাং পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে, হস্তক্ষেপ করিতেছিলেন। ভারতের এ কাজকে আমি অন্যায়ও বলিতেছি না, এর নিন্দাও করিতেছি না। ইতিমধ্যে আমার লেখা একাধিক বই-পুস্তকে ও প্রবন্ধে ভারতের এ কাজের বরং সমর্থনই করিয়াছি এবং এর চেয়ে গুরুতর কিছুকরিলেও দোষের হইত না, বলিয়াছি। কিন্তু এখানে আমার প্রতিপাদ্য এই যে, শরণার্থী সমস্যায় প্রত্যক্ষভাবে জড়িত হইবার আগেই ভারতীয় নেতৃত্ব পূর্ব-পাকিস্তানের ব্যাপারে কিছু কিছু ভাল মন্দ কার্যকলাপ শুরু করিয়াছিলেন। ভারতীয় নেতৃত্বের জন্য এটা নূতন। তাঁদের সাবেক সনাতন নিরপেক্ষ নীতির এটা খেলাফ। এই কারণেই প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার ৫ই আগস্টের হোয়াইট পেপারে ভারত সরকার ও ভারতীয় নেতৃত্বকে পূর্ব-পাকিস্তানের পরিস্থিতির জন্য দায়ী করা সম্ভব হইয়াছিল।
যা হোক, প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার এই সত্য-মিথ্যা-মিশ্রিত হোয়াইট পেপার ভারতের খুব কাজে লাগিয়াছিল। ৫ই আগস্ট পাকিস্তান সরকারের হোয়াইট পেপার বাহির হয়। আর তার তিন দিনের মধ্যে ৮ই আগস্ট রুশ-ভারত চুক্তি সম্পাদিত হয়। যদিও চুক্তিটির নাম দেওয়া হইয়াছিল শান্তি, মৈত্রী ও সহযোগিতার চুক্তি। আসলে এটা ছিল কিন্তু একটা দস্তুরমত সামরিক চুক্তি। চুক্তির মুদ্দা কথা ছিল : যদি কেউ ভারত বা সোভিয়েত ইউনিয়ন আক্রমণ করে, তবে তারা পরস্পরকে সাহায্য করিবে। একে অপরের প্রতিরক্ষা ব্যাপারে শত্রুপক্ষকে সাহায্য করিবে না। শান্তি-মৈত্রী সম্বন্ধে অনেক ভাল-ভাল কথার মধ্যে এই সামরিক সহযোগিতার কথাটাই ঝলমল করিয়া সকলের চোখে পড়িল। জোটনিরপেক্ষতা ও সামরিক চুক্তি-বিরোধিতা নেহরুর বহু বিঘোষিত সুপ্রতিষ্ঠিত ও কড়াকড়িভাবে প্রতিপালিত পররাষ্ট্র নীতি। তাঁরই মেয়ে মিসেস ইন্দিরা গান্ধী পিতার এই দীর্ঘদিনের নীতি পরিত্যাগ করিয়া সামরিক জোটবদ্ধ হইলেন, এতে দেশের ভিতরে-বাহিরে হৈ চৈ পড়িয়া গেল। শত্রুদের ত কথাই নাই, বহু বন্ধু ও সমর্থকও ইন্দিরা দেবীর সমালোচনায় মুখর হইয়া উঠিলেন।
কিন্তু অল্পদিনেই সমালোচকদের কণ্ঠ নীরব হইল। শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধীর দূরদর্শিতার তাঁরা মুখে না হইলেও মনে মনে তারিফ করিতে বাধ্য হইলেন। পাকিস্তানের জংগী সরকার যে পূর্ব-পাকিস্তানের নিতান্ত ন্যায়সংগত গণতান্ত্রিক সংগ্রামটাকে পাক-ভারতের আন্তর্জাতিক সংঘাত রূপে চিত্রিত করিবার চেষ্টা করিতেছিলেন, তার প্রধান উদ্দেশ্যেই ছিল এই সংঘাতে চীন-মার্কিন ইত্যাদি কতিপয় বন্ধুরাষ্ট্রকে পাকিস্তানের পক্ষে জড়াইয়া ফেলিবার অপচেষ্টা। মিসেস ইন্দিরা গান্ধী যথাসময়ে এই রুশ-ভারত চুক্তির লাঠি উঁচা না করিলে পাকিস্তানের চেষ্টা যে সফল হইত না, তা কেউ জোর করিয়া বলিতে পারিবেন না। পাক-ভারত যুদ্ধের শেষ অবস্থায় পাকবাহিনীর পরাজয়ের সম্ভাবনার মুখে মার্কিন সপ্তম নৌবহরের ভারত মহাসাগরে প্রবেশ ও পশ্চাদপসারণের পিছনে সোভিয়েত ভীতি মোটেই কাজ করে নাই, এ কথাও বলা চলে না। কারণ মার্কিন সপ্তম নৌবহরের ভারত মহাসাগরে প্রবেশ করার খবরের সাথে সাথে এমন খবরও দেশ-বিদেশের বেতারে প্রচারিত হইয়াছিল যে সোভিয়েত নৌবহরও মার্কিন নৌবহরের অনুসরণ করিতেছে।
