কিন্তু তিনি কলিকাতা যান নাই। বিভিন্ন জায়গায় তিনি চার-পাঁচ মাস আত্মগোপন করিয়াছিলেন। মিসেস সোলেমান ঢাকায় আসায় তাঁর আত্মগোপনের আবশ্যকতা আপাততঃ আর নাই। তাই তিনি গোপন স্থান হইতে বাহিরে আসিতে সাহস পাইয়াছেন।
আমি খুশী হইলাম। তাঁর সাথে একাধিকবার লম্বা আলোচনা করিলাম। মুজিবের জীবন লইয়া রাজনৈতিক দর কষাকষির পাকিস্তানী অভিপ্রায় সম্বন্ধে আমার সন্দেহ দৃঢ়তর হইল। দর কষাকষির ভাব দেখাইয়া পাকিস্তানকে হিউমারে রাখা মন্দ নয়। এ বিষয়ে যহিন্দীনের সাথে আমি একমত হইলাম। এ বিষয়ে আমার অনুমোদনক্রমে দুই-একটি বিবৃতিও তিনি দিলেন। কিন্তু পাকিস্তানী নেতাদের দাবি-মত শেখ মুজিবের বদলে নিজে আওয়ামী লীগের নেতা হইতে বা আওয়ামী লীগের নাম পরিবর্তন করিয়া নতুন নামের পার্টি করিতে তিনি রাযী হন নাই। এ বিষয়ে তৎকালে খবরের কাগযে যহিরুদ্দীনের রাজনীতি সম্পর্কে যে সব জল্পনা-কল্পনা বাহির হইয়াছিল, তার অধিকাংশই ছিল হয় ভিত্তিহীন, নয় ত বিকৃত ও অতিরঞ্জিত।
পরবর্তীকালে স্বাধীনতার পর ঐ সব বিকৃত রিপোর্টের উপর নির্ভর করিয়া আওয়ামী নেতারা যহিরুদ্দীনের প্রতি যে ব্যবহার করিয়াছেন, তা ছিল যহিরুদ্দীনের প্রতি ঘঘারতর অবিচার। আওয়ামী লীগও তাতে ক্ষতিগ্রস্ত হইয়াছিল। আমি কোনও কোনও প্রভাবশালী আওয়ামী নেতার কাছে যহিরুদ্দীনের কথা তুলিয়াছিলাম। আওয়ামী লীগের প্রতি তাঁর অতীতের নিঃস্বার্থ সেবার উল্লেখ করিয়াছিলাম। তাতে এক সুরসিক আওয়ামী নেতা হাসিয়া জবাব দিয়াছিলেন : বিনা-ফিসে আওয়ামী নেতাদের রাজনৈতিক মামলায় উকালতি করাই ছিল আওয়ামী লীগের প্রতি যহিরুদ্দীনের বড় অবদান। আমরা আওয়ামী লীগাররাই এখন সরকার হওয়ায় তাঁর আর দরকার হইবে। বরঞ্চ আওয়ামী লীগ-বিরোধীদের জন্যই যহিরুদ্দীনের সেবার বেশি দরকার হইবে।’
যহিরুদ্দীনের মত দক্ষ পার্লামেন্টারিয়ান আওয়ামী লীগে আর থাকিবেননা, একথাও বলিয়াছিলাম আরেকজন বড় নেতার কাছে। জবাবে তিনিও বলিয়াছিলেন : আপনাদের আমলের মত পার্লামেন্ট আর থাকিবে কি না, তাই আগে দেখিয়া নেন।
এ কথার তাৎপর্য বুঝিয়াছিলাম আরও অনেক পরে। সংবিধান রচনার পর ১৯৭৩ সালের মার্চের সাধারণ নির্বাচনের ফলে যে পার্লামেন্ট গঠিত হইল, তাতে ‘লিডার অবদি হাউস’ আছে, কিন্তু লিডার-অব-দি অপযিশন’ নাই। মাত্র আটজন অপযিশন মেম্বরের নেতা বলিয়া জনাব আতাউর রহমান খাঁকে প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান ‘লিডার অব-দি-অপযিশন’ মানিয়া লন নাই। ফলে সারা দুনিয়ায় একমাত্র বাংলাদেশেই লিডার-অব-দি অপযিশন-হীন পার্লামেন্ট বিরাজ করিতেছে।
৬. উপ-নির্বাচনের প্রহসন
যা হোক, আমাদের স্বাধীনতাযুদ্ধের দ্বিতীয় স্তরে জন-যুদ্ধের কথায় ফিরিয়া আসা যাক। জন-যুদ্ধ মূদ্দরে পাঁচ মাস সময়ের সরকারী দিশাহারা পাগলামির আরেকটা প্রমাণ তথাকথিত উপ-নির্বাচনের ব্যবস্থা। মিসেস আখতার সোলেমানের নরম আওয়ামী লীগ নেতাদের মধ্যে অনুপ্রবেশের চেষ্টা ব্যর্থ হইবার পরই সামরিক সরকার প্রথমে ৭৮ জন আওয়ামী এম, এন, এ. ও ১০৫ জন এম. পি. এ কে এবং পর আরও ৮৮ জন এম, পি, এ.-কে ডিসকোয়ালিফাই করিয়া তাঁদের সীটে উপনির্বাচনের হুকুম জারি করেন। পাকিস্তান সরকারের এই আহাম্মকিতে বাংলাদেশের এই সময়কার জন-যুদ্ধের বুনিয়াদ গণ-ঐক্য আরও দৃঢ়তরভাবে প্রমাণিত হইল। এই তথাকথিত উপ-নির্বাচনের জন্য প্রার্থী পাওয়া দুষ্কর হইল। গত নির্বাচনে যামানত বাযেয়াক্ত শ্রেণীর কয়েকজন ঝটপট প্রার্থী হইয়া গেলেন বটে, কিন্তু অত-অত ভ্যাকেট সীটের জন্য যথেষ্ট প্রার্থী পাওয়া গেল না। এমনকি, জমাতে ইসলামী ও পিপলস-পার্টির মত আওয়ামী লীগ-বিরোধীরাও প্রার্থী দাঁড় করাইতে সাহস পাইলেন না। একমাত্র এয়ার মার্শাল আগসর খাঁর ইতেকলাল পার্টি পূর্ব পাকিস্তানের বর্তমান অস্বাভাবিক অবস্থায় সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন হইতে পারে না, এই যুক্তিতে এই উপ-নির্বাচন বয়কট করিলেন। অবস্থা এমন দাঁড়াইল যে সামরিক অফিসাররা মফস্বলে ঘূরিয়া-ঘুরিয়া প্রার্থী যোগাড়ে লাগিয়া গেলেন। অনেককে ভয় দেখাইয়া, লোত দেখাইয়া, যবরদস্তি করিয়া প্রার্থী রাযী করিলেন। অনেকের যামানতের টাকাও এঁরাই যোগাড় করিয়া দিলেন।
ফলে ৫৫ জন প্রার্থী বিনা-নির্বাচনে নির্বাচিত হইয়া গেলেন। আমার কিছু-কিছু সাংবাদিক বন্ধুকে বলিয়াছিলাম, এরা ]বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হইয়াছেন’ না লিখিয়া বিনা-নির্বাচনে নির্বাচিত লেখাই উচিৎ। উর্দুভাষী বন্ধুদের বলিলাম : বেলা ইতেখাব মুনুতেখাব। বন্ধুরা আমার রসিকতাটা উপভোগ করিলেন। অনেক সাংবাদিকরাও ‘বিনা-নির্বাচনে নির্বাচিত’ লিখিলেন।
অবিশিষ্ট আসনসমূহের জন্য ডিসেম্বরের শেষের দিকে নির্বাচনের তারিখ ঘোষিত হইল। কিন্তু অবস্থা-গতিকে সে সব উপ-নির্বাচন আর হইতে পারিল না। বিনা নির্বাচনে নির্বাচিতদের অনেকেই পিভিতে পাড়ি জমাইলেন। কারণ এটা ঠিক হইয়া গিয়াছিল যে ন্যাশনাল এসেম্বলির পয়লা বৈঠক ঢাকার বদলে পিন্ডিতেই হইবে।
৭. পাক-ভারত যুদ্ধ
এইবার আসা যাক, মুক্তিযুদ্ধের তৃতীয় স্তরের দুই মাসের আলোচনায়। নবেম্বর ডিসেম্বরের মুদ্দতটা আসলে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের চেয়ে পাক-ভারতের আন্তর্জাতিক যুদ্ধ-মন্দুতই ছিল বেশি। নবেম্বর মাসে প্রথম দিক হইতেই, বরং অক্টোবরের শেষ দিক হইতে, ভারত সরকার পাকিস্তানের বিরুদ্ধে এবং পাকিস্তান সরকার ভারতের বিরুদ্ধে পরস্পরের সীমা লংঘন ও আগ্রাসনের অভিযোগ প্রত্যভিযোগ শুরু করেন। নোয়াখালি জিলার বিলোনিয়া, ত্রিপুরা রাজ্যের ধর্মনগর, ময়মনসিংহ জিলার কামালপুর ইত্যাদি স্থানের নাম উভয় সরকারের রেডিওতে ঘন ঘন শুনা যাইতে লাগিল। শুধু স্থল সৈন্যের দ্বারা নয়, বিমান বাহিনীর দ্বারা পরস্পরের স্থল ও আকাশসীমা লংঘনের কথা বলা হইতে লাগিল। শুধু তাই নয়। উভয় পক্ষের সৈন্যবাহিনীর সংঘর্ষের কথাও প্রকাশিত হইতে লাগিল। এক পক্ষ আর এক পক্ষকে হারাইয়া দিয়াছে বলিয়া দাবি করা হইলেও স্পষ্ট ভাষায় এমন আশ্বাসও দেওয়া হইতে লাগিল যে অপর পক্ষের আক্রমণকারী সৈন্যদের মারিয়া তাড়াইয়া দেওয়া হইয়াছে বটে, কিন্তু তাড়াইতে-তাড়াইতে তাদের পিছু ধাওয়া করার বেলা অপর পক্ষের ভূমিতে প্রবেশ করা হয় নাই। বরঞ্চ পলায়মান অপর পক্ষের সৈন্যদেয়ে ধাওয়া করিতে করিতে আন্তর্জাতিক সীমায় গিয়াই আমাদের পক্ষের সৈন্যরা একদম থামিয়া গিয়াছিল। একেবারে দ্রুতগামী মোটর গাড়ির ব্রেক কষার মত আর কি। প্রতিদিন সকালে বিকালে রেডিওতে এই ধরনের সংবাদ প্রচারিত হইতে লাগিল। তার মানেই পাক ভারত সরকারদ্বয়ের মধ্যে লড়াই নাই বা লাগুক, উভয় সরকারের সৈন্যদের মধ্যে লড়াই তখন বাধিয়া গিয়াছে। ভারতের পক্ষ হইতে বলা হইল পাক-বাহিনীর লোকেরা বোমা পাতিবার উদ্দেশ্যে ভারতের ভূমিতে ঢুকিয়া পড়িতেছে। আর পাকিস্তানের পক্ষ হইতে বলা হইতে লাগিল ভারতের স্থলবাহিনী ও গোলন্দা বাহিনী পাকিস্তানের ভূমিতে ঢুকিয়া পড়িতেছে। পাকিস্তানের পক্ষ হইতে ভারতীয় অভিযোগের কোন জবাব দেওয়া হয় নাই। কারণ বোধ হয় জবাব দিবার মত তাদের কিছু ছিল না। কিন্তু ভারতীয় পক্ষ হইতে বলা হইল ভারতীয় সৈন্য শুধু বাংলাদেশের লিবারেটেড এরিয়াতেই ঢুকিয়াছে। বস্তুতঃ এটাকেই বলে অঘঘাষিত যুদ্ধ। এ সময়ে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে এই অঘঘাষিত যুদ্ধই চলিতেছিল। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে প্রায় সব রাষ্ট্রনায়ক ও সংবাদপত্রই এটাকে পাক-ভারত সংঘর্ষই বলিতেছিলেন। পূর্ব পাকিস্তানের এই সময়কার দাবিকে আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসনের দাবিই বলা হইক, আর পূর্ণ স্বাধীনতার সংগ্রামই বলা হউক, এর পিছনে ভারতের উস্কানি আছে, ফলে সংঘর্ষটা আসলে পাক-ভারত সংঘর্ষ, বিশ্ববাসীকে ওটা দেখাইয়া পূর্ব-পাকিস্তানের সংগ্রামকে আন্তর্জাতিক রূপ দিয়া পূর্ব-পাকিস্তানীদের দাবিকে মেঘাবৃত করিবার চেষ্টা পাকিস্তানের আগাগোড়াই ছিল। পূর্ব-পাকিস্তানের যে কোনও ছোট-বড় গণ আন্দোলনকে ভারতের উস্কানি বলিয়া চিহ্নিত করার প্রয়াস পাকিস্তানী শাসকদের সনাতন নীতি। কিন্তু আগের-আগের বার পাকিস্তানের নেতারা হাজার প্রভোকেশন দিয়াও ভারতীয় নেতাদেরে চেতাইতে পারেন নাই। ভাষা আন্দোলনের সময় নূরুল আমিন সাহেব যা পারেন নাই, আগরতলা ষড়যন্ত্রের কথা বলিয়া আইউব সাহেব যা পারেন নাই, এবার ইয়াহিয়া সাহেব তা পারিলেন। ভারতীয় নেতৃত্ব এবার সত্য-সত্যই চেতিলেন। পূর্ব-পাকিস্তানের জনতার উপর ২৫শে মার্চের বর্বর হামলার জন্য সভ্য মানুষ ও সরকারের মত অনুতপ্ত না হইয়া ইয়াহিয়া সরকার রাজনৈতিক ও সামরিক সব কাজের সমর্থনে ১৯৭১ সালের ৫ই আগস্ট ‘হোয়াট হ্যাপেন্ড’ এই শিরোনামায় একটি বিশালাকারের হোয়াইট পেপার বাহির করিলেন। এতে আওয়ামী লীগ এবং দেশরক্ষা ও পুলিশ বাহিনীর উপর, এমনকি সরকারী কর্মচারীদের উপর, ঢালাও মিথ্যা অপবাদ ত দিলেনই, ভারত সরকার ও ভারতীয় নেতৃবৃন্দের উপরও সত্য-মিথ্যা অভিযোগ করিলেন। এক কথায়, পূর্ব-পাকিস্তানের গোটা ব্যাপারটাকেই ভারতের উষ্কানি, উৎসাহ, সহায়তা ও সক্রিয় সাহায্যের দ্বারা পাকিস্তান ধ্বংসের ষড়যন্ত্র বলা হইল। এই সংগে পাকিস্তানের সংহতি রক্ষার দৃঢ় সংকল্পের কথা যে ভাবে যে ভাষায় বলা হইল, তাকে ভারতের বিরুদ্ধে হমকি বলিলে অসংগত হইবে না।
