এর পর নূরুর রহমান সাহেব ঘন-ঘন আমাকে তাঁর কার্যকলাপের রিপোর্ট দিতে লাগিলেন। তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য কোট, কম্বল, সোয়েটার ইত্যাদি গরম কাপড় সংগ্রহে আমার স্ত্রী ও পরিবারের অন্যান্যের সহযোগিতা নিতে লাগিলেন। তার মধ্যে একটি পন্থা এই ছিল যে, তিনি তাঁর গাড়ির ‘বুটে’ করিয়া বাণ্ডিল-বাণ্ডিল উল সূতা আনিয়া আমার বাড়িতে রাখিয়া যাইতেন। আমার স্ত্রী সেসব উল পুত্রবধু, বোন-ভাগিনী ও অন্যান্য বিশ্বস্ত আত্মীয় জনদের মধ্যে বিলি করিতেন। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তাঁরা সোয়েটার বুনিয়া আমার বাড়িতে পৌঁছাইতেন। নূরুর রহমান সাহেব নির্ধারিত সময়ে আসিয়া সেগুলো নিয়া যাইতেন। এ সব কাজ অতি সাবধানেই করা হইত সত্য, কিন্তু পাক-বাহিনীর গোয়েন্দাগিরিও কম যাইত না। তবে আমাদের তরুণরাও ইতিমধ্যে বেশ খবরদার হইয়া উঠিয়াছিল। তাদের জমা-করা সেই সব কাপড়-চোপড় এমনকি অস্ত্রপাতিও তারা এক-একদিন এক-এক জায়গায় লুকাইত। একবার আমার এক আত্মীয়াবিধবা মহিলা বিপদে পড়িতে-পড়িতে বাচিয়া গিয়াছিলেন। এই মহিলার জ্যেষ্ঠ পুত্র ও তার বন্ধুরা গেরিলাদের পোশাক-পাতি ও অস্ত্রশস্ত্র এই মহিলার বাড়িতে এক গুপ্ত স্থানে লুকাইয়া রাখিয়াছিল। পাক-বাহিনীর গোয়েন্দারা জানিতে পারিয়া এই বাড়ি থানা-তল্লাসি করে। কিন্তু ছেলেরা আগের দিন এই তল্লাসির আঁচ পাইয়া জিনিসপত্র সরাইয়া ফেলিয়াছিল। এতে এটাই প্রমাণিত হয় যে, সরকারী গোয়েন্দর উপর গোয়েন্দাগিরি করার কৌশলও আমাদের ছেলেরা ইতিমধ্যে আয়ত্ত করিয়া ফেলিয়াছিল।
এইসব ঘটনা যতই আমার কানে আসিতে লাগিল, আমি নুরুর রহমানের নিরাপত্তা সম্পর্কে ততই ভীত-সন্ত্র ও চিন্তানিত হইতে লাগিলাম। একদিন তাঁরে ফেলিয়াই বলিলাম তুমি এত সব করিয়াও পাকবাহিনীর হাত হইতে বাঁচিয়া যাইতেছ কেমন করিয়া? উত্তরে হাসিয়া বন্ধুবর যা বলিলেন, তার অর্থ ‘হাস্টিং উইথ দি হাউণ্ড এণ্ড রানিং উইথ দি হেয়ার’, অর্থাৎ তিনি আর্মি অফিসারদের সাথে দুস্তি বজায় রাখিয়াছেন। সাবেক ক্যাপটেন বলিয়া পাক-বাহিনীর কোনও-কোনও অফিসার তাঁকে জানিতেন। সেই সুবাদে তিনি আর্মি ক্লাবে যাতায়াত করিতেন এবং অফিসারদের সাথে বন্ধুত্ব করিতেন। তাঁদেরে খাওয়াইতেন। অর্থাৎ ভারত হইতে ফিরিয়া আসিয়া মুজিব নগরী সরকার যাকে দালালি আখ্যা দিলেন, নূরুর রহমান সাহেব সেই কাজটিই করিয়াছেন ঢাকায় বসিয়া এবং জান-মালের রিস্ক লইয়া। নূরুর রহমানের জন্য ছিল এটা ঘোরর রিস্ক। কারণ তাঁর দুই পুত্ৰই যে মুক্তিযোদ্ধা এটা গোপন রাখা আর সম্ভব ছিল না। ততদিনে দুই পুত্রই মুক্তিযুদ্ধে আহত হইয়াছিল। একজন গুরুতর রূপে। এত গুরুতর যে তাকে যুদ্ধ চলাকালেই নিজের খরচে লণ্ডনেও স্বাধীনতার পরে সরকারী খরচে জি.ডি. আরে অনেকদিন চিকিৎসা করিতে হইয়াছিল।
এই সময়কার আরেকটি ঘটনা দল-মত-নির্বিশেষে সকল পূর্ব-পাকিস্তানীর ঐক্যমত ও সংগ্রামের জন-যুদ্ধ প্রকৃতি প্রমাণিত করিয়াছিল। এই সময়ে পাকিস্তানী রেডিও-টেলিভিশন হইতে প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে প্রচার করা হইতেছিল যে শেখ মুজিবের তথাকথিত বিচার হইয়া গিয়াছে এবং সে বিচারে মুজিবের ফাঁসির হুকুম হইয়াছে। এর কিছুদিন আগে সরকারীভাবে ঘোষণা করা হইয়াছিল যে সরকার মুজিবের সম্মতিক্রমে মিঃ এ, কে, ব্রোহীকে আসামী পক্ষের উকিল নিযুক্ত করিয়াছেন। এই ঘোষণা হইতে পূর্ব-পাকিস্তানীরা ধরিয়া নিয়াছিল যে উকিল হিসাবে মিঃ ব্রোহীর যোগ্যতা সত্ত্বেও শেখ মুজিব সুবিচার পাইবেন না। তার পর পরই মুজিবের ফাঁসির হুকুমের গুজব শুনিয়া সকল দলের সকল শ্রেণীর পূর্ব-পাকিস্তানীরা উদ্বেগ ও ব্যাকুলতায় অস্থির চঞ্চল হইয়া উঠে। আমি নিজেও দুশ্চিন্তায় অস্থির হইয়া পড়িয়াছিলাম। এই মূদ্দতে যে দলের যে শ্রেণীর যাঁরাই আমার সাথে দেখা করিতেন, সবাই একবাক্যে আমাকে খুব পীড়াপীড়ি করিয়া বলিতেন। শেখ মুজিবের প্রাণরক্ষার জন্য আমার সাধ্যমত সব চেষ্টা করা উচিৎ। আমি নিতান্ত অসহায়, নিরূপায়, শক্তিহীন, প্রভাব-প্রতিপত্তিবিহীন জানিয়াও তাঁরা আমাকে এই অনুরোধ করিতেন। দল-মত-নির্বিশেষে সবাই এই এক কথা বলায় দুইটা কথা প্রমাণিত হইত। এক, শেখ মুজিবের বাচিয়া থাকার রাজনৈতিক প্রয়োজন সম্বন্ধে সারাদেশে ঐক্যমত আছে। দুই, পাকিস্তানের সামরিক সরকার মুজিব হত্যার মত নিষ্ঠুর ও অদূরদশী কুকর্ম করিতে পারেন। প্রথমটায় শেখ মুজিবের প্রতি জাতীয় আস্থা সূচিত হইত। দ্বিতীয়টায় পাকিস্তান সরকারের প্রতি পূর্ণ অনাস্থা প্রমাণিত হইত।
৫. আওয়ামী লীগে ভাংগনের অপচেষ্টা
শেখ মুজিবের জীবন সম্বন্ধে পূর্ব-পাকিস্তানীদের মধ্যে যখন এমনি একটা সামগ্রিক আশংকা বিদ্যমান, যে-সময়ে ওয়ার্ল্ড কমিশন-অব-জুরিস্টস ও ওয়ার্ল্ডপিস কাউন্সিলসহ দুনিয়ার বিভিন্ন রাষ্ট্রনায়ক মুজিবের সামরিক বিচার ও তাঁর জীবনাশংকা লইয়া উদ্বেগ প্রকাশ করিতেছিলেন এবং অনেকেই প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার নিকট তারবার্তা পাঠাইতেছিলেন, এমনি সময়ে আমাদের প্রিয় পলোলোকগত নেতা শহীদ সাহেবের একমাত্র আদরের কন্যা এবং আমাদের সকলের স্নেহ ও শ্রদ্ধার পাত্রী মিসেস আখতার সোলেমান ঢাকায় আসেন। আমার সাথে তাঁর ব্যক্তিগত কথা হয় নাই। কাজেই আমি জানিতাম না তিনি প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া বা পাকিস্তান সরকারের তরফ হইতে কোন মিশন লইয়া আসিয়াছেন কিনা। তবু আমি খুশী হই। কারণ এই ঘটনায় আমি মুজিবের জীবন সম্বন্ধে নিশ্চিন্ত হইয়া এই সিদ্ধা করি যে মুজিবের প্রাণনাশের ইচ্ছা পাকিস্তান সরকারের নাই। তবে তাঁর জীবন নাশের হুমকি দিয়া পলিটিক্যাল ব্ল্যাকমেইল করিবার দুরভিসন্ধি তাঁদের খুবই আছে। অনেকদিন পরে আমার পরম স্নেহাস্পদ ও বিশ্বস্ত আওয়ামী নেতা যহিরুদ্দীন আমার সাথে দেখা করিলেন। আমার ধারণা ছিল, তিনি কলিকাতা চলিয়া গিয়াছেন। কারণ আওয়ামী নেতাদের মধ্যে তাঁরই কলিকাতা যাওয়ার সুবিধা ছিল সবচেয়ে বেশি। যহিরুদ্দীনের বাপ-দাদারা কলিকাতার সংগতিপূর্ণ ভদ্র পরিবার। পাকিস্তান হওয়ার পরেও তাঁর পরিবারের অনেকেই কলিকাতায় থাকিয়া যান। আজও তাঁরা প্রতিপত্তি ও সম্মান লইয়া কলিকাতায় বসবাস করিতেছেন। প্রথম চোটেই যহিরুদ্দীনের পক্ষে কলিকাতা যাওয়া খুবই স্বাভাবিক ছিল।
