কিন্তু ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চের পর, বিশেষ করিয়া জুলাই-আগস্ট মাসে, পূর্ব-পাকিস্তানের অবস্থা তা ছিল না এই কয়মাসে পাকবাহিনীর নিষ্ঠুরতায় পার্টি দল-মত-নির্বিশেষে পূর্ব-পাকিস্তানের জনগণ ও শিক্ষিত সমাজ স্তম্ভিত হইয়া গিয়াছেন। এদের মধ্যেকার আওয়ামী লীগ-বিরোধীরাও নূতন করিয়া চিন্তা করিতে বাধ্য হইয়াছেন। এদের বেশকিছু লোক আওয়ামী লীগের সংগ্রামের সমর্থক হইয়া পড়িয়াছেন। আর বাকীরা অন্ততঃপক্ষে কেন্দ্রীয় সরকারের প্রতি সহানুভূতি ও সহযোগিতার মনোভাব হারাইয়া ফেলিয়াছেন। এক কথায়, পাঞ্জাবী নেতৃত্ব ও পাক বাহিনী ততদিনে সারা পূর্ব-পাকিস্তানকে পিটাইয়া আওয়ামী লীগের দলে ভিড়াইয়া দিয়াছে। আমি-এর আগে আমার শেরে বাংলা হইতে বংগবন্ধু পুস্তকে লিখিয়াছিলাম : ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চের আগে পূর্ব-পাকিস্তানের একজনও পাকিস্তান ভাংগিবার পক্ষে ছিল না; ২৫শে মার্চের পরে একজন পূর্ব-পাকিস্তানীও পাকিস্তান বজায় রাখিবার পক্ষে ছিল না। কথাটা ছিল এই সময়কার সঠিক চিত্র। এ সময় পূর্ব-পাকিস্তানের জনতা সত্যসত্যই এক জন-যুদ্ধে লিপ্ত হইয়া পড়িয়াছে। দেশের কবি-সাহিত্যিক, লেখক-অধ্যাপক, সরকারী কর্মচারি, শিল্পপতি-ব্যবসায়ী সবাই প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এই জন-যুদ্ধে শরিক হইয়া পড়িয়াছেন। এমন অবস্থায় স্বাধীনতা-সংগ্রামে লিপ্ত অন্যান্য দেশে যা-যা ঘটিয়াছে, আমাদের দেশেও তাই ঘটিয়াছে। চিনে চিয়াং কাইশেকের তথাকথিত সমর্থকদের প্রায় সবাই যেমন কার্যতঃ মাও সেতুং-এর পক্ষে কাজ করিয়াছিলেন, চিয়াংবাহিনীকে-দেওয়া সমস্ত মার্কিন অস্ত্র যেমন মাও বাহিনীর হাতে চলিয়া গিয়াছিল, দক্ষিণ ভিয়েৎনামের সাহায্যে দেওয়া অধিকাংশ অস্ত্র যেমন ভিয়েৎকং-এর হাতে হস্তান্তরিত হইয়া গিয়াছে, পূর্ব পাকিস্তানের বেলাও ঠিক তাই ঘটিয়াছে। শুধু ছোট-বড় অফিসাররাই না, পাক সরকার নিয়োজিত শান্তি কমিটি, রেকার ও বদর বাহিনীর বহু লোকও তলে-তলে মুক্তিযুদ্ধের ও মুক্তিযোদ্ধাদের সহায়তা করিয়াছেন। বস্তুতঃ নিজেদের স্বরূপ ঢাকিবার মতলবেই এঁদের বেশির ভাগ শান্তি কমিটি রেকার ও বদর বাহিনীতে নাম লেখাইয়াছেন। এমনকি পাক-বাহিনীর দেওয়া অস্ত্র দিয়াই এদের অনেকে পাক সৈন্যকে গুলি করিয়াছেন। এইভাবে এই মুতের সংঘর্ষটা পূর্ব-পাকিস্তানীদের পক্ষে হইয়া উঠে একটা সামগ্রিক ও সর্বাত্মক জন-যুদ্ধ। এই পরিবেশে পাক-সরকার ও তাঁদের সৈন্য বাহিনী পূর্ব-পাকিস্তানে যা কিছু ভাল-মন্দ নীতি অবলম্বন করিয়াছিলেন তা ব্যর্থ হইতে বাধ্য ছিল। এ সম্পর্কে আমার ব্যক্তিগতভাবে জানা ও দেখা দুই একটি দৃষ্টান্ত দিলেই যথেষ্ট হইবে।
৪. জন-যুদ্ধের বিচিত্র রূপ
প্রথমেই উল্লেখ করিতে হয় আমার অন্যতম প্রিয় বন্ধু জনাবনূরুররহমানের নাম। ইনি বর্তমানে ভাসানী ন্যাপের ভাইস-প্রেসিডেন্ট। কিন্তু আওয়ামী লীগের জন্ম হইতেই তিনি আমাদের অন্যতম প্রধান সহযোগী। ১৯৫৬-৫৭ সালে তিনি সুহরাওয়ার্দী ক্যাবিনেটে একজন স্টেট মন্ত্রী ছিলেন এবং সেটা তিনি ছিলেন আমারই সহকর্মী রূপে। আমার দফতর শিল্প-বাণিজ্যের তিনি প্রতিমন্ত্রী ছিলেন। দুই-একদিনেই তিনি যোগ্যতায় আমার এত আস্থা অর্জন করিয়াছিলেন যে আমি অনেকগুলি ডিভিশনই তাঁর হাতে হস্তান্তর করিয়া নিজের পরিশ্রম লাঘব করিয়াছিলাম।
তিনি একজন এক্সসার্ভিসম্যান। কমিশনপ্রাপ্ত অফিসার অবসরপ্রাপ্ত ক্যাপটেন। তিনি অনেক সময় আমার কাজে লাগিতেন। প্রাইম মিনিস্টারের অনুপস্থিতিতে আমি যখন তাঁর এ্যাকটিনি করিতাম, তখন প্রধানমন্ত্রীর সব দফতরের সংগে প্রতিরক্ষা দফতরও আমার অধীনে আসিত। এ সময় আমি নূরুর রহমানের সাথে প্রায়ই পরামর্শ করিতাম। তার আগে আমি যখন জেনারেল আইউবের সাথে পূর্ব ও পশ্চিম-পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা লইয়া বাহাসে লিপ্ত হই, তখন আমার জেলার তৎকালীন এস.পি জনাব সাদেক আহমদ চৌধুরীই প্রতিরক্ষা ব্যাপারে আমার প্রাইমারি শিক্ষক ছিলেন বটে, তবে নূরুর রহমান সাহেবও কিছুটা সেকেণ্ডারি শিক্ষকের কাজ করিয়াছিলেন। পরবর্তীকালে আইউব শাহি আমলে দুই পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা ব্যাপারে নূরুর রহমান সাহেব আমাকে আরও নতুন নতুন জ্ঞান দান করিয়াছিলেন।
১৯৭১ সালের জুলাই-আগস্ট মাসে নূরুর রহমান এক দুঃসাহসিক কাজে ব্রতী হইলেন। কাজটা হইল ঢাকায় আগত মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয় দেওয়া ও রাতে শুইতে দেওয়ার জন্য বিভিন্ন ছদ্মনামে ষোলটি বাড়ি ভাড়া করিয়াছিলেন। এসব খবর আমাকে দিয়াছিলেন তিনি পরে ও কিস্তিতে-কিস্তিতে। তাঁর এই গোপন কার্যকলাপ আমার নযর আসে প্রথমে আমার কনিষ্ঠ ছেলে মহফুয আনাম (তিতুর মুক্তিযুদ্ধে যোগদান উপলক্ষ করিয়া। ততদিনে নুরুর রহমানের দুই পুত্রের উতমেই মুক্তিবাহিনীতে যোগ দিয়া ফেলিয়াছে। তখনই আমি তাঁর কাছে জানিতে পারি, তিনি দুই-তিন মাস আগে হইতেই ঢাকায় মুক্তিযোদ্ধা রিক্রুট করিয়া আগরতলা সীমান্তে সোনাইমুড়ি ও ধর্মনগর পথে তাদেরে ত্রিপুরায় পার করিতেছেন। তথায় ট্রেনিংপ্রাপ্ত গেরিলারা বোমাবাবি ও সাবোটাশ কার্য চালাইতে ঢাকায় আসিয়া তাঁরই আশ্রয়ে থাকিতেছে। শেষ পর্যন্ত তাঁরই ব্যবস্থামত আমার ছেলেও আগরতলায় পাড়ি দিল। এ কাজে আমার ছেলেদের বন্ধু আমার পাতা ভাগিনা আবদুস সাত্তার মাহমুদ যে দুঃসাহসিকতার পরিচয় দিয়াছেন, তাতে আমি আমাদের তরুণদের প্রতি শ্রদ্ধায় নুইয়া পড়িয়াছি। এই আবদুস সাত্তার আমার কলিকাতা জীবনের প্রতিবেশী, আলিয়া মাদ্রাসার অধ্যাপক মওলানা সুলতান মাহমুদের পুত্র। সাত্তর কোহিনূর কেমিক্যালের একজন সাবেক চিফ-একযিকিউটিভ। পশ্চিমা মালিকের চাকুরি করিয়াও তিনি এ কাজের ঝুঁকি লইতেছেন দেখিয়া আমি শংকিত হইলাম। আমার আপত্তি অগ্রাহ্য করিয়া তিনি তাঁর নিজের গাড়িতে নিজে ডাইভ করিয়া আমার ছেলেকে সোনাইমুড়ি পৌঁছাইয়া দিলেন। পথে কত কৌশল ও প্রত্যুৎপন্নমতিত্বে এই অসাধ্য সাধন করিয়াছিলেন, সে এক দুঃসাহসিক ব্রোমাঞ্চকর কাহিনী। এই ধরনের অনেক কাজই সাত্তার করিয়াছিলেন নিজের ও চাকুরির তোয়াক্কা না করিয়া। অবশ্য তাঁর পূর্ব-পাকিস্তানী-প্রীতির জন্য ইতিপূর্বেই তিনি মালিকের নযরে পড়ায় তাঁকে চাকুরি হইতে বয়তরক করা হইয়াছিল। কিন্তু তাতেও তাঁর কর্মোদ্যম বিন্দুমাত্র কমে নাই। সান্ত্বনার কথা এই যে স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ সরকার সাত্তারকে কোহিনূর কেমিক্যালের প্রশাসক নিযুক্ত করিয়া তাঁর যোগ্যতার মর্যাদাদান ও দেশ-সেবার সাহসিকতাকে পুরস্কৃত করিয়াছেন। তিনি এখন পরম মোগ্যতার সাথেই দেশের এই বৃহত্তম শিল্প-প্রতিষ্ঠান চালাইতেছেন।
