২. হিটলারের পরাজয়
আরেকটি ব্যাপার দেখিয়া হিটলারের ইহুদি-নির্যাতনের কথা মনে পড়িত। প্রায় প্রতিদিন পূর্বাহে খোলা ট্রাক-বোঝাই লোক নেওয়া হইত। আমার বাসার সামনের সাতমসজিদ রোড দিয়াই এসব ট্রাক যাতায়াত করিত। উত্তর হইতে দক্ষিণে এবং দক্ষিণ হইতে উত্তরে উভয়দিকেই এসব ট্রাক যাতায়াত করিত। সব ট্রাকেই একই দৃশ্য।সট্রাকই লোক-তত্তি। লোকগুলোওধুমাখা দেখাযাইত। নিশ্চয়ই বসা। তবে কি ধরনের বসা, বাহির হইতে তা দেখা যাইত না। সবগুলি মাথা হেট করা। মাথার কালা চুল দেখিয়া বোঝা যাইত, সবাই হয়ত যুবক। অন্তত বুড়া কেউ নয়। মাথা হেট করিয়া খাকিত বোধহয় সৈন্যদের কড়া নির্দেশে। কারণ ট্রাকের উপরেই সংগীন তা-করা বন্দুকধারী দু-চার জন করিয়া সৈনিক দাঁড়াইয়া থাকিত। ভাবখানা এই যে, বন্দীরা মাথা নাড়িলেই গুলি করা হইবে। ওদের হাত-পা বাঁধা ছিল কি না, মানে তারা ইচ্ছা করিলেই ট্রাক থনে লাফাইয়া পলাইতে পারি কি না, তা বুঝিবার জু ছিল না।
লোকমুখে শোনা যাইত দুই রকম কথা। কেউ বলিত, এইসব যুবককে হত্যা করিয়া নদীতে ভাসাইয়া দেওয়া হইতেছে। আর কেউ বলিত, এদেরে দিয়া বাধ্যতামূলক শ্রমিকের কাজ করান হইতেছে। এই দুই কথার একটারও সত্যতা যাচাই করার উপায় ছিল না।
দু’চার দিনের মধ্যেই বুঝিতে পারিয়াছিলাম, সরকার আমাকে আপাততঃ রেহাই দিতেছেন। কেন এমন দয়া করিয়াছিলেন, সেটা বুঝিয়াছিলাম আরও পরে জুন মাসের শেষ দিকে। সে কথা পরে বলিতেছি। প্রথম যখনই বুঝিতে পারিলাম, আমি আপাতত নিরাপদ, তখনই আওয়ামী নেতাদের নিরাপত্তার চিন্তায় পড়িলাম। শেখ মুজিব ধরা দিয়াছেন, একথা পাকিস্তান রেডিও ও অন্যান্য রেডিও হইতেই শুনিয়াছিলাম। পাকিস্তান রেডিও যখন মুজিবের গ্রেফতারির দাবি করিয়াছে, তখন তাঁর জীবন সম্পর্কে নিশ্চিন্ত হইলাম। সহজেই বুঝিলাম, শেখ মুজিবকে প্রাণে মারিবার ইচ্ছা থাকিলে পাক-বাহিনী কদাচ তাঁর গেব্রেফতারের কথা স্বীকার করিত না। তখন অন্যান্য নেতাদের জীবনের নিরাপত্তা লইয়া বিশেষ চিন্তাযুক্ত হইলাম। আর কারও গেব্রেফতারের কথা পাক-বাহিনী স্বীকার করিতেছে না কেন? নিশ্চয়ই দুরভিসন্ধি আছে।
কয়েকদিনের মধ্যেই যে কয়জন বন্ধু-বান্ধব আমার সাথে দেখা করিলেন,তাঁদের মধ্যে নূরুর রহমান ও ইয়ার মোহামদ খাঁর নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এরা দুইজনই বড়লোক, গাড়ির মালিক। কিন্তু গাড়ি না চড়িয়া ঐরা পায় হাঁটিয়া আমার সাথে দেখা করিলেন। আমাকে বুঝাইলেন, গাড়ি চড়া অপেক্ষা পায় হাঁটা অনেক নিরাপদ। রাস্তার মোড়ে-মোড়ে পাক-বাহিনী। পথচারীর উপর ওদের নযরে নাই। গাড়ি দেখিলেই থামায়। যদিও দুইজন পৃথক-পৃথকভাবে ভিন্ন-ভিন্ন সময়ে আসিলেন, কিন্তু দুইজনই একটা যুক্তি দিলেন বলিয়া আমি তাঁদের কথা সত্য বলিয়া বুঝিয়া নিলাম। এই দুই বন্ধুই খবর দিলেন, তাঁরা নিজেরা কয়েকজন প্রধান আওয়ামী নেতাকে ঢাকার বাহিরে পাচার করিয়া দিয়াছেন কাউকে টুপি আর কাউকে বোরকা পরাইয়া। তাঁরা অবশ্য নেতাদের নাম বলিয়াছিলেন : কিন্তু সুস্পষ্ট কারণেই আমি এখানে তাঁদের নাম উল্লেখ করিলাম না। যদিও এতে কোন লজ্জা বা অগৌরবের কিছু নাই; বরং গৌরবের কথা আছে।
বন্ধু বান্ধবদের সম্বন্ধে এইভাবে নিশ্চিন্ত হইয়া সামরিক সরকারের নির্বুদ্ধিতার রাজনৈতিক পরিণতি ও বর্বরতার সামরিক পরিণামের কথা ধীরভাবে চিন্তা করিবার অবসর পাইলাম। আমি লক্ষ্য করিলাম, জুন মাসের শেষার্ধ্ব হইতে জংগী সরকারের নীতির খানিকটা বদল হইতেছে। সেনাপতিদের যেন এই সর্বপ্রথম মনে পড়িল, দেশবাসীর অন্ততঃ একাংশের সমর্থন না পাইযুেদ্ধেও জিতা যায় না। এই বোধোদয় ঘটিবার আশু বাধ্যকর কারণও ঘটিয়াছিল। এই সময় মুক্তিফৌজের বিচ্ছুরা’ প্রতিরাত্রে ঢাকায় বোমা ফাটাইতে শুরু করিল। এতেই বোধহয় জংগী সরকারের মনে পড়িল, যেমন করিয়া থোক, জনগণের অন্ততঃ একাংশের সহযোগিতা পাওয়া দরকার। এই সময় হইতেই পাক বাহিনীর নেতারা দেশে সিভিলিয়ান সরকার, মহল্লায়-মহল্লায় ‘শান্তি কমিটি’, ‘রেযাকার’ ‘আলবদর” ইত্যাদি তথাকথিত স্বেচ্ছাসেবী বাহিনী গঠনে তৎপর হইলেন।
৩. জন-যুদ্ধ শুরু
কিন্তু বড় দেরিতে এটা ঘটিয়াছিল। কাজেই এ পথে অগ্রসর হওয়ার উপায় ছিল না। পূর্ব-পাকিস্তানে আওয়ামী লীগবিরোধী অনেক পার্টি ছিল। নির্বাচনে এরা সম্পূর্ণ পরাজিত হইলেও এবং কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক পরিষদে এরা নিশ্চিহ্ন হইয়া গেলেও দেশে এদের সমর্থক অনেকেই ছিলেন। নির্বাচনে এঁরা সকলেই বেশ কিছু সংখ্যক ভোট পাইয়াছিলেন। এই সব দলের অনেকগুলোই সুগঠিত সংগঠন ছিল। তাঁদের নিষ্ঠাবান কর্মী-সংখ্যাও ছিল অনেক। কেন্দ্রীয় সরকার ২৫শে মার্চের আগে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে যে-কোন অগণতান্ত্রিক ও বে-আইনী দমননীতিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করিলেও এসব পার্টি মনে-মনে খুশীই হইত। ধরুন, প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে যে সব মিথ্যা অভিযোগ আনিয়া ১লা মার্চ পরিষদের বৈঠক অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ করিয়া দিয়াছিলেন, বা যে সব অভিযোগের পুনরাবৃত্তি করিয়া ৬ই মার্চ আবার পরিষদের বৈঠক ডাকিয়াছিলেন, ঐসব অভিযোগে যদি ‘৭০ সালের নির্বাচন বাতিল করিয়া পুনর্নিবাচন দিতেন, তবে পরাজিত পার্টিসমূহ সানন্দে সে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করিতেন, এবং প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার ভাষাতেই আওয়ামী লীগকে গালাগালি দিয়া ভোট ক্যানভাস করিতেন। এমন নির্বাচনের ফলাফল কি হইত বলা যায় না, তবে দেশবাসী ও তোটারদের মধ্যে যে বড় রকমের বিভ্রান্তি ও মতভেদ দেখা দিত, তা নিশ্চয় করিয়া বলা যায়।
