৮. মিথ্যা অভিযোগ
আওয়ামী লীগকে দোষী সাব্যস্ত করিবার জন্য পরবর্তীকালের ৫ই আগস্ট) ‘হোয়াইট পেপারে’ আরো অনেক কথা বলা হইয়াছিল। তার মধ্যে প্রধান কথাটা এই যে, ২রা মার্চ হইতে আওয়ামী লীগের তথাকথিত অহিংস অসহযোগ অন্দোলন শুরু হওয়ার সাথে-সাথেই আওয়ামী লীগ ভলান্টিয়াররা এবং তাদের উস্কানিতে বাংগালীরা অবাংগালীদের উপর বর্বর নির্যাতন ও হত্যাযজ্ঞ শুরু করে। কথাটা যে সত্য নয়, তার প্রমাণ ৫ই আগষ্টে প্রকাশিত ‘হায়াইট পেপার’ নিজেই। এই হোয়াইট পেপারের এপেক্সি ‘জি’তে যে হিংসাত্মক কাজের তালিকা দেওয়া হইয়াছে, তাতে ২৬-২৭শে মার্চের চাটগাঁর ঘটনা হইতে শুরু করিয়া ৩০শে এপ্রিল পর্যন্ত মুদ্দতের দিনানুক্রমিক হিসাব দেওয়া হইয়াছে। লক্ষণীয় যে এই সবই ২৫শে মার্চের পরের ঘটনা। সত্য হইলেও এগুলোকে আগ্রাসনী কাজ বলা চলে না। বড়জোর প্রতিশোধমূলক নৃশংসতা বলা চলে। এইসব বিবরণে কোনও-কোনও জায়গার নৃশংসতাকে ২৩শে মার্চ হইতে ১লা এপ্রিলের ঘটনাবলিয়া এজমালি আকারে দেখান হইয়াছে। ২৩/২৪-এর ঘটনা বলিয়া আলাদা কোনও নৃশংসতার কথা বলা হয় নাই। অসদুদ্দেশ্যটা সুস্পষ্ট।
৩২.০৫ মুক্তিযুদ্ধ-জন-যুদ্ধ
মুক্তিযুদ্ধ-জন-যুদ্ধ
উপাধ্যায় পাঁচ
১. সংগ্রাম শুরু
২৫শে মার্চ হইতে ১৬ই ডিসেম্বরের ঘটনাবলী আমি সংক্ষেপে ডিংগাইয়া যাইতেছি। দুই কারণে। প্রথমত, এইসব ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ দেশী-বিদেশী খবরের কাগযে, বই-পুস্তিকায় এত বেশি বলা হইয়া গিয়াছে যে, পাঠকরা সবই জানিয়া ফেলিয়াছেন। আমি সে সবের পুনরাবৃত্তি করিতে চাই না। সে সব বিবরণীর মধ্যে যেটুকু অসংগতি ও পরস্পর-বিরোধিতা আছে, তারও অনেকগুলি পাঠকগণ নিজেরাই ধরিতে পারিয়াছেন। সেসব আলোচনার স্থানও এই পুস্তকে নাই; যোগ্যতাও আমার নাই। দ্বিতীয়ত : এই ঘটনাবলীর মধ্যে রাজনীতির চেয়ে যুদ্ধনীতিই বেশি। এর যতটুকু রাজনীতি, মাত্র ততটুকুই আমি প্রসংগত ও সংক্ষেপে উল্লেখ করিব।
ন মাসের এই মুদ্দতটাকে মোটামুটি তিন ভাগে ভাগ করা যায়। প্রথম দুই মাসের মুদ্দতটা ছিল একটা নির্বোধ জংগী সরকারের পক্ষে নিরস্ত্র নিরপরাধী দেশবাসীর বিরুদ্ধে সরকারী দমন নীতির নামে একটা বর্বর ও নিষ্ঠুর হত্যাযজ্ঞ। পরের পাঁচ মাস ছিল একটা বিদেশী দখলদার বাহিনীর বিরুদ্ধে গোটা দেশবাসীর সার্বিক জন-যুদ্ধ। শেষের দুই মাস ছিল এটা জনসমর্থনহীন পাকবাহিনী ও জন-সমর্থিত ভারতীয় বাহিনীর মধ্যে একটা আন্তর্জাতিক যুদ্ধ।
প্রথম দুই মাসের নিষ্ঠুরতার অনেকখানি আমি নিজ চোখে দেখিয়াছি। ২৫শে মার্চের পাকবাহিনীর অন্যতম টার্গেট পিলখানার ই. পি. আর, ছাউনি আমার বাড়ি থনে মাত্র তিন শ’ গজ দূরে। আর একটি টার্গেট ভার্সিটি ক্যাম্পাসও এক মাইলের মধ্যে। ওখানকার গোলাগুলির আওয়ায ও আর্তনাদ কানে শুনিয়াছি। আর ই. পি, আয়, ছাউনির গোলাগুলি চোখে দেখিয়াছি। ২৫শে মার্চের মধ্যরাত থনে ২৭শের সকাল পর্যন্ত অবিরাম বত্রিশ ঘন্টা এই গুলিবিনিময় হয়। তার বেশ কিছু সংখ্যক গুলি আমার বাড়িতেও পড়ে। আমার বাড়ির দক্ষিণ-পশ্চিম দিকটা গাছ-পালার ঘন জংগলে ঢাকা। একদম পাড়াগাঁয়ের বাড়ির মত। এই কারণে ওইসব গুলির অধিকাংশ ঐ জংগলে বাধা পাইয়া ছরছর শব্দে মাটিতে পড়িয়াছে। মাত্র দু’চারটা দেওয়ালে জানালায় লাগিয়াছে। আমার বাড়ির দক্ষিণ দিকার যে সব বাড়ি আমার বাড়ির মত জংগলে সুরক্ষিত নয়, তাদের অনেক ক্ষয়-ক্ষতি ও কিছু-কিছু খুন-জখমও হইয়াছিল।
দুই রাত ও একদিন এইভাবে ঘরে বন্দী থাকিবার পর ২৭শে মার্চের সকাল ন’ টার দিকে রাস্তায় লোকজন ও কিছু-কিছু রিকশা দেখা গেল। শোনা গেল কারফিউ কয়েক ঘন্টার জন্য তুলিয়া নেওয়া হইয়াছে। ঘন্টা খানেকের মধ্যেই রাস্তায় গমনশীল বিপুল জনতা দেখা গেল। সবাই শহর ছাড়িয়া পাড়াগাঁয়ের দিকে চলিয়াছে। কাঁধে মাথায় বিছানাপত্র, হাতে হাড়ি-পাতিল। মনে হইল শহর বুঝি খালি হইয়া গেল। খবর লইবার জুনাই। ২৫শে মার্চের মধ্যরাত্রি হইতেই টেলিফোন স্তব্ধ। গুজব রটিল, যারা যেভাবে পারিতেছেন, শহর ছাড়িয়া পলাইতেছেন। আমাদেরও পলাইবার কথা উঠিল। কিন্তু হইয়া উঠিল না। আমি অসুস্থ, অচল। আমার স্ত্রী যিদ ধরিলেন, রাস্তায় পড়িয়া মরার চেয়ে ঘরে মরা ভাল। কারণ ঘরে মরিলে কাফন-দাফন হইবে। রাস্তায় মরিলে লাশ শিয়াল-কুত্তায় খাইবে। কাজেই ঘরে বসিয়াই আজরাইলের অপেক্ষা করিতে থাকিলাম। এ বিষয়ে এর বেশি বলিবার কিছু নাই। কারণ এই মুদ্দতে এ দেশের যারা ভারতে পলাইয়া যান নাই, অথবা অন্য কারণে বিদেশে ছিলেন না, তাঁদেয়ে প্রায় সবারই এই একই অবস্থা ছিল। অধ্যাপক মফিযুল্লা কবির তাঁর বই-এ তাঁদের স্বদেশে নির্বাসিত এই চমৎকার বিশেষণ দিয়াছেন। সত্যই আমরা সবাই এই মুদ্দতটায় নিজেদের দেশে নির্বাসিত, এ্যাইল, ছিলাম। এক্যাইলদের চেয়েও দুরবস্থায় কাটাইয়াছেন যাঁরা ছিলেন ফিউজিটিভ নিজের দেশেই। কারণ নিজেদের ঘরবাড়ি ফেলিয়া সপরিবারে এরা স্থান হইতে স্থানান্তরে পলাইয়া বেড়াইতেন বর্বর পাক বাহিনীর ভয়ে। এই মুদ্দতের চোখে-দেখানৃশংসতার অনেকগুলির মধ্যে দুইটির উল্লেখ না করিয়া পারা যায় না। প্রতি রাত্রে ঢাকা নগরের একাধিক স্থান হইতে আসমান ছোঁয়া আগুনের লেলিহান শিখা দেখা যাইত। অনেকগুলি দুচার ঘন্টা এবং কোনও কোনোটা সারা রাত আসমান লাল করিয়া রাখিত। পরে শোনা যাইত, বিভিন্ন বস্তি ও পুরাণ শহরের বিভিন্ন মহল্লায় পাক-বাহিনী এই অগ্নিকাণ্ড ঘটাইতেছে। বলা হইত, বস্তি ও মহল্লার বাঁশিন্দারা পলাইবার চেষ্টা করিলে পাক-বাহিনী তাদেরে গুলি করিয়া হত্যা করি। কথাগুলির সত্যতা যাচাই করিবার জু ছিল না। তবে এটা ঠিক যে এইভাবে বেশ কিছুদিন ধরিয়া রাতের বেলা ঢাকা শহরে মহাকবি দান্তের ‘ইনফার্নো’ দেখা যাইত।
