৬. সনাতন নীতির বরখেলাফ
এ বিষয়ে এখানে এত কথা বললাম এ জন্য যে, ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ তারিখে পাকিস্তান সরকার পূর্ব-পাকিস্তান সরকারের মাধ্যমে প্রচলিত নিয়ম ও ধারায় কাজ করেন নাই। পাকিস্তান সরকারের সর্বোচ্চ কর্মকর্তা প্রেসিডেন্ট। তাঁর অধীনস্ত ও হকুমবরদার গবর্নর। গবর্নরের হকুমবরদার চিফ সেক্রেটারি, হোম সেক্রেটারি, আই. জি, ডি, সি, এস, পি, ইত্যাদি সরকারী অংগ-প্রত্যংগ সবই মওজুদ ছিল ঘটনার দিন। আওয়ামী লীগ নেতারা প্রেসিডেন্টের সাথে রাজনৈতিক আলাপ-আলোচনার আঁড়ালে সশস্ত্র বিপ্লবের আয়োজন করিতেছেন, এটা বুঝিতে পারার সংগে সংগেই তাঁদের সবাইকে এবং শহরে উপস্থিত আরও কিছু নেতৃস্থানীয় আওয়ামী লীগারকে গ্রেফতার করিলেই সনাতন প্রচলিত সরকারী নিয়মে কাজ করা হইত। এই গ্রেফতারের প্রতিক্রিয়ায় ছাত্র-তরুণ ও জনগণের মধ্যে বিক্ষোভ দেখা দিলে তারও প্রতিরোধ করার সনাতন পন্থা সরকারের জানা ছিল। শাসনযন্ত্রের মেশিনারি তাতে অভ্যস্ত ছিল। ঐ সনাতন পন্থায় সরকার অগ্রসর হইলে ২৫শে মার্চ ও তার পরে যা যা ঘটিয়াছিল, তাও ঘটিত না। অত-অত লোক-ক্ষয়ও হইত না। শক্তিশালী যালেম শাসক ও নিরস্ত্র মযলুম শাসিতের সম্পর্কের বেলা বরাবর যা হইয়াছে, এখানেও তাই হইত।
কিন্তু ঐ দিনকার পাকিস্তান সরকার ঐ সনাতন শাসক-শাসিতের সনাতন পন্থা গ্রহণ না করিয়া, এমনকি সে চিন্তা না করিয়া, দুই যুধমান শত্রু পক্ষের মনোভাব ও কর্মপন্থা গ্রহণ করিয়াছিলেন কেন? এ প্রশ্নের উত্তর পাওয়া কঠিন। কঠিন বলিয়াই তৎকালীন পাক-সরকার পরবর্তীকালেও উত্তর দিবার চেষ্টা করেন নাই। চেষ্টা করিবার পথও তাঁরাই রুদ্ধ করিয়াছিলেন। কারণ আওয়ামী লীগের নেতা, সরকারের নযরে সবচেয়ে বড় অপরাধী, শেখ মুজিবকেসত্য-সত্যই তাঁরা গ্রেফতার করিয়াছিলেন। শেখ মুজিবও বরাবন্ত্রের মতই বিনা-বাধায় ধরা দিয়াছিলেন। সরকারের কথিত বুধমান প্রতিপক্ষের সেনাপতির মত তিনি আত্মরক্ষার উদ্দেশ্যে কোন বাধাও দেন নাই, আত্মগোপনের চেষ্টাও করেন নাই। এটা কি আক্রমণোদ্যত শত্রুপক্ষের সেনাপতির কাজ? নিশ্চয়ই না। অতএব শেখ মুজিবের ঐ দিনকার আচরণই ‘হোয়াইট পেপারে’ বর্ণিত আওয়ামী লীগের পরিকল্পিত হামলার অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণ করিয়াছে।
৭. প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার আচরণ
তারপর ধরা যাক, প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার ২৫শে মার্চের আচরণটা। ঐ দিনকার দৈনিক কাগসমূহে প্রকাশিত খবরে জানা গিয়াছিল যে, আগের সন্ধায় আওয়ামী লীগ নেতারা তাঁদের চূড়ান্ত বক্তব্য প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার নিকট লিখিতভাবে পেশ করিয়াছেন এবং ২৫শের সন্ধ্যা-তক প্রেসিডেন্টের উত্তরের অপেক্ষা করিতেছেন। প্রেসিডেন্টের জবাব নুকূল হইবে বলিয়াই তাঁরা আশা করিতেছে। কিন্তু ২৫শে মার্চের সন্ধ্যায় বাস্তবে কি ঘটিয়াছিল? রাত আটটার দিকে প্রেসিডেন্টের তরফ হইতে কোনও আহট না পাইয়া আওয়ামী নেতারা জানিতে পারিলেন, প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া প্রেসিডেন্ট ভবন ছাড়িয়া ক্যান্টনমেন্টে চলিয়া গিয়াছেন। পরে শুনিতে পাইলেন, তিনি সন্ধ্যা ছয়টার সময়েই করাচির পথে ঢাকা ত্যাগ করিয়াছেন। পরদিন ২৬শে মার্চ পাকিস্তান রেডিওতে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া আওয়ামী নেতা শেখ মুজিবকে গাল দিয়াও আওয়ামী লীগ বে-আইনী ঘোষণা করিয়া যে অসাধু ও অভদ্র বিবৃতি দিলেন, আওয়ামী লীগ নেতাসহ পূর্ব-পাকিস্তানীরা বিশ্বয়ে সে বক্তৃতা শুনিল এবং বুঝিল প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া সত্য-সত্যই আগের সন্ধ্যায় গোপনে ঢাকা ত্যাগ করিয়াছিলেন। এটা কি একজন হেড-অব-দি-স্টেট ও হেড-অব-দি গবর্নমেন্টের যোগ্য কাজ হইয়াছিল? কেন তিনি নিজের এবং রাষ্ট্রের এমন মর্যাদাহানিকর কাজ করিলেন। যে সব কথা তিনি ২৬শে মার্চের রেডিও পাকিস্তানের ব্রডকাস্টে বলিয়াছিলেন, তার একটা কথাও তিনি ঢাকায় বসিয়া, আলোচনা চলাকালে অথবা আলোচনা শেষে,বলেন নাই। আলোচনাঅচলাবস্থায় আসিয়াছেবাভাংগিয়া যাইতেছে, এমন কোনও আভাসও তিনি বা তাঁর পক্ষে অন্য কেউ দেন নাই। শেখ মুজিবকে ও আওয়ামী লীগকে তিনি যে দেশদ্রোহী এবং সেজন্য যে অনেক আগেই তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিৎ ছিল, একথা ঘুণাক্ষরেও তিনি দেশবাসীকে জানিতে দেন নাই। সে সব কথাই কি তিনি ঢাকা রেডিওতে বলিতে পারিতেন না। তিনি কি আওয়ামী লীগ-নেতাদের সামনেই বলিতে পারিতেন না যে, তাঁদের দাবি-দাওয়া পাকিস্তানের অখণ্ডতা-ও স্থায়িত্ব-বিরোধী; অতএব তিনি তা গ্রহণ করিতে পারিলেন না? তিনি ঢাকা বসিয়াই আওয়ামী লীগকে সশস্ত্র ষড়যন্ত্রের দায়ে বে-আইনী ঘোষণা করিতে পারিতেন না? তিনি কি নিজের নিরাপত্তা সম্পর্কে ভয় পাইয়াই এই সাবধানতা অবলম্বন করিয়াছিলেন? সোজা কথায়, তিনি কি ভয়ে ঢাকা হইতে পলাইয়াছিলেন? আমার বিশ্বাস হয় না। আমার বিবেচনায় তিনি ভয়ে পলান নাই, পলাইয়াছিলেন তিনি লজ্জায়। একজন জেনারেল ত দূরের কথা, একজন সামান্য সৈনিকও এমন ভীরু হইতে পারেন, আমার মন তা মানিয়া লইতে পারিতেছে না। তাছাড়া, তিনি যদি নিজের নিরাপত্তা সম্বন্ধেই এত ভয় পাইয়াছিলেন, তবে আর সবার নিরাপত্তার কথা তাঁর মনে পড়ে নাই কেন? সামরিক গবর্নরসহ আরও অনেক কয়জন জেনারেল ও লক্ষাধিক সৈন্য তখনও ঢাকা ও পূর্ব-পাকিস্তানের অন্যান্য শহরে মোতায়েন ছিলেন। ওঁদের কারও নিরাপত্তার কথা তিনি ভাবেন নাই কেন? কাজেই তিনি ভয়ে নয়, লজ্জায় পলাইয়াছিলেন। ২৬শে মার্চের বক্তৃতায় তিনি যেসব উক্তি করিয়াছিলেন, আওয়ামী নেতাদের মুখামুখি মোকাবেলায় তিনি সেসব কথা বলিতে পারিতেন না। জঘন্য অপরাধী মন লইয়া কারও মুখামুখি ওসব কথা বলা যায় না। রেডিওই ঐ ধরনের উক্তির উপযুক্ত মিডিয়াম। কথার মর্ম যাই হোক, আর যে মাধ্যমইে কথাগুলো বলা হোক, প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার কথায় ও আচরণে স্পষ্টতঃই প্রমাণিত হইয়াছে যে, আওয়ামী লীগের সহিত আলোচনা ব্যর্থ হইবার এবং ফলে পাকিস্তান দুই টুকরা করিবার মূল দায়িত্ব প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার, আওয়ামী লীগের নয়।
