ইয়াহিয়া-ভুট্রোর স্তোক বাক্যে বা চাপে শেখ মুজিব পরিষদের বৈঠক পুনরায় মুলতবি করেন এবং পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানী এম. এন. এ.-দের পৃথক-পৃথক অধিবেশনে রাযী হওয়াতেই ঐসব পশ্চিম-পাকিস্তানী নেতার স্বপ্নভংগ হইল। শেখ মুজিবের সহায়তায় তাঁদের হারানো নেতৃত্ব পুনরুদ্ধারের আশা সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হইল। তার উপর পূর্ব ও পশ্চিম-পাকিস্তানে পৃথক-পৃথকভাবে ক্ষমতা হস্তান্তরে শেখ মুজিব রাযী হওয়ায় পশ্চিম-পাকিস্তানী নেতারা স্পষ্টই বুঝিলেন, শেখ মুজিব গোটা পাকিস্তানের নেতৃত্বে নিজ হাতে না রাখিয়া পশ্চিম-পাকিস্তানের নেতৃত্ব ভুট্টোর হাতে ছাড়িয়া দিয়াছেন।
পশ্চিম-পাকিস্তানী নেতারা সম্পূর্ণ নিরাশ হইয়া দেশে ফিরিয়া গেলেন এবং একেবারেই নীরব ও নিরুৎসাহ হইয়া গেলেন। নির্বাচনে একটি সীটও না পাইয়া শেখ মুজিব সেখানে যে শক্তির অধিকারী হইয়াছিলেন, এভাবে তা হাতছাড়া হওয়ায় অতঃপর শেখ মুজিবের ভাগ্য সম্পূর্ণভাবে ইয়াহিয়া-ভুট্টোর হাতে ন্যস্ত হইয়া গেল। আমি সেদিনও বিশ্বাস করিতাম এবং আজও করি যে, পশ্চিম-পাকিস্তানের ঐসব নেতা শেখ মুজিবের সমর্থক থাকিলে ২৫শে মার্চের ঐ নিষ্ঠুরতম হত্যাকাণ্ড ও রাজনৈতিক মূঢ়তা সংঘটিত হইত না।
২৩শে মার্চ ছুটির দিন বলিয়া কোনও বৈঠক হয় নাই। যা হোক, ২৪শে মার্চও প্রেসিডেন্ট ভবনে আওয়ামী লীগের তিনজন নেতা জনাব সৈয়দ নয়রুল ইসলাম, জনাব তাজুদ্দিন আহমদ ও ডাঃ কামাল হুসেন প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার উপদেষ্টাদের সংগে সাক্ষাৎ করেন। এই বৈঠক সম্পর্কে ২৫শে মার্চের দৈনিক খবরের কাগযে আওয়ামী লীগের তরফে এইরূপ সংবাদ বাহির হয়?
আওয়ামী লীগ নেতৃবৰ্তমান রাজনৈতিক সংকট সমাধানের জন্য বংগবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান ও প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার মধ্যে মূলনীতি সংক্রান্ত যে সমঝোতা হইয়াছে, তদনুযায়ী বিশদ পরিকল্পনা গতকাল বুধবার প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার উপদেষ্টাদের কাছে সুস্পষ্টভাবে পেশ করিয়াছেন। বৈঠক শেষে জনাব তাজুদ্দিন আহমদ জানাইয়াছেন যে, বংগবন্ধুর সাথে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খাঁর মূলনীতি সংক্রান্ত যে মতৈক্য হইয়াছে, তদনুযায়ী তাঁরা গতকাল উপদেষ্টাদের কাছে বিশদ পরিকল্পনা পূর্ণাংগভাবে পেশ করিয়াছেন। পরিস্থিতির যাতে আরও অবনতি না ঘটে, তার জন্য আওয়ামী লীগ প্রেসিডেন্টের উপদেষ্টাদেরে বিল-নীতি পরিহার করার আহবান জানাইয়াছেন। তাঁরা জানাইয়াছেন যে, আওয়ামী লীগের ফরমূলা পুরাপুরি পেশ করা হইয়াছে। আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব এখন প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার ঘোষণার প্রতীক্ষা করিতেছেন।
৫. পাক-বাহিনীর হামলা
এই পরিবেশে ২৫শে মার্চের রাত সাড়ে এগারটায় পাক-বাহিনী হামলা করে। হামলাটা ছিল স্পষ্টতই আকস্মিক। নেতৃবৃন্সমধ্যে আলোচনা চলিতে থাকা অবস্থায় এমন আকখিক সামরিক হামলা হওয়াতে অনেকেই মনে করিয়াছেন এবং বলিয়াছেন যে, প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া ও তাঁর সংগীদের আওয়ামী নেতৃবৃন্দের সাথে আলোচনাটা ছিলনিতান্তই লোক-দেখানো ব্যাপার। দস্তুরমত শয়তানি। সামরিক প্রস্তুতির উদ্দেশ্যে তাঁরা সময় নিতেছিলেন মাত্র।
যাঁরা এমন মনে করেন বা বলেন, তাঁদের পক্ষে অবশ্য এটা অনুমান মাত্র। কিন্তু এই অনুমান সমর্থিত হইয়াছে সরকারী কথার দ্বারা। পরবর্তীকালে অর্থাৎ ১৯৭১ সালের ৫ই আগষ্ট তারিখে পাকিস্তান সরকারের পক্ষ হইতে ‘ইস্ট পাকিস্তান ক্রাইসেস : হোয়াট হাপেড’ শীর্ষক একটি হোয়াইট পেপার বাহির হয়। এটি একটি বড় আকারের পুস্তক। এই পুস্তকে বলা হয় যে, ২৫/২৬ মার্চের মধ্যরাত্রির পরে আওয়ামী লীগ সশস্ত্র বিপ্লবের মাধ্যমে স্বাধীন বাংলাদেশ ঘোষণা করিবার জন্য দিন ক্ষণ (যিরো আওয়ার নির্বাচিত করিয়াছিল। স্পষ্টতই ২৫শে মার্চের মধ্যরাত্রের আগেই সামরিক হামলার যুক্তিযুক্ততার সমর্থনেই পাকিস্তান সরকার এই ষড়যন্ত্রের অভিযোগ উথাপন করিয়াছেন। এই হোয়াইট পেপারে দাবি করা হইয়াছে যে, আলোচনা চলাকালেই সরকার এই ষড়যন্ত্রের কথা সুস্পষ্টভাবে জানিতে পারিয়াছিলেন। যে সব প্রমাণ সরকার পাইয়াছিলেন, হোয়াইট পেপারে তার বিস্তারিত বিবরণ দেওয়া হইয়াছে। সে সব প্রমাণে বিশ্বাস স্থাপন করিলেখীকার করিতেই হইবে যে ২৫শে মার্চের রাত্রিবেলার হামলাটা ছিল নিছক একটা ডিফেসিত মুভ। যুক্তিটা এই? ‘ওরাই আক্রমণ করিতে চাহিয়াছিল। তাই আমরাই আগে হামলা করিয়া তাদের অসদুদ্দেশ্য ব্যর্থ করিয়া দিলাম।‘ কথাটা তথ্য হিসাবে কতদুর সত্য, তার বিচারে তদন্ত দরকার। কিন্তু যুক্তি হিসাবে কথাটা কতটা টেকসই, তার বিচার এখনিরা চলে।
‘ওরা ও আমরা’ পক্ষ দুইটা এখানে আওয়ামী লীগ ও সরকার। আওয়ামী লীগ পার্টি সাম্প্রতিক নির্বাচনে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি দল। আর সরকার মিলিটারি বুরোক্রাসি সমর্থিত বিপুল ও অসাধারণ শক্তিশালী গবর্নমেন্ট। এই দুই পক্ষের মধ্যে সামরিক কায়দায় অফেনসিডিপেনসি স্ট্যাটিজির কথা সরকারের মাথায় ঢুকাটা নিতান্তই অদ্ভুত ও অসাধারণ। আওয়ামী লীগ নির্বাচনে বিজয়ী মেজরিটি পার্টি হইলেও তখনও রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় প্রতিষ্ঠিত হয় নাই। কাজেই এ এই বিরোধের দুই পক্ষকে দুইটি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার বিরোধ বলা চলে না। পূর্ব-পাকিস্তানে নির্বাচন-বিজয়ী দল রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হইবার পরও কেন্দ্রীয় সরকারের বিবেচনায় তাঁরা বেয়াড়া প্রতীয়মান হইলে তাঁদের ক্ষমতাচ্যুত করিয়া কেন্দ্রীয় শাসন প্রবর্তন একাধিকবার করা হইয়াছে। শেরে-বাংলা ফযলুল হকের নেতৃত্বে যুক্তফ্রন্টের বিজয়কে একটি ব্যালটবাক্স বিপ্লব আখ্যায়িত করা হইয়াছিল। কেন্দ্রীয় সরকারের মর্যাদায় ওটা একটা চরম আঘাতও বিবেচিত হইয়াছিল। প্রতিশোধ স্বরূপ কেন্দ্রীয় সরকার হক মন্ত্রিসভাকে এবং স্বয়ং হক সাহেবকে পূর্ব-পাকিস্তানের স্বাধীনতার যদুকারী দেশদ্রোহী অভিহিত করিয়াছিলেন। কেন্দ্রীয় সরকার কর্তৃক শেরে-বাংলাকে গৃহবন্দী করা হইয়াছিল এবং অন্যতম মন্ত্রী শেখ মুজিবর রহমানকে গ্রেফতার করা হইয়াছিল। কেন্দ্রীয় সরকারের নির্দেশেই এ সব কাজ করা হইয়াছিল বটে, কিন্তু হাতে-কলমে তা করিয়াছিলেন প্রাদেশিক সরকারের দেওয়ানী ও পুলিস অফিসাররাই। গ্রেফতারের পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত এইসব অফিসার মন্ত্রিগণকে মনিব বা বস মানিয়াছিলেন। তাঁদের হুকুমে কাজ করিয়াছিলেন। আর পর মুহূর্তেই কেন্দ্রীয় সরকারের নির্দেশে বকে গ্রেফতার করিতেও তারা দ্বিধা করেন নাই। কারণ এটাই তাদের ট্রেনিং। নিজস্ব ও ব্যক্তিগত মতামত ও অভিরুচির উর্ধ্বে ও বাহিরে ‘সরকারের’ নির্দেশ পালনই এদের শিক্ষা। সরকার এখানে ইমপার্সনেল অব্যক্তিক একটা ইনস্টিটিউশান, একটা প্রতিষ্ঠান। মন্ত্রীরা যতক্ষণ ক্ষমতায় থাকেন, ততক্ষণ তাঁরাও কার্যতঃ সরকার। কিন্তু তাঁদেরে সরকারের অংগ বলাই ঠিক। কারণ তাঁদেরে ছাড়াও, তাঁদের বাইরেও, সরকারের অস্তিত্ব আছে এবং সেটাই আসল সরকার। এটা বুরোক্র্যাসি, আমলা। এই অন্ত্র বা শাসনযন্ত্র কাজ করে প্রেসিডেন্ট, গবর্নর, চিফ সেক্রেটারি, হোম সেক্রেটারি, আই, জি, ডি, আই, জি, ডি, সি., এস. পি এই চ্যানেলের মাধ্যমে। এটাই বৃটিশ পার্লামেন্টারি সিস্টেমের ধারা এরা পার্মানেন্ট অফিশিয়াল বা স্থায়ী সরকারী কর্তকর্তা। নির্বাচিত সরকার বা মন্ত্রীরা এদের মাধ্যমে ও সহযোগিতায় সরকার পরিচালনা করেন।
