২১শে মার্চ ঘটনার বা দুর্ঘটনার আরও উন্নতি বা অবনতি হয়। পনর জন সহকর্মী লইয়া পিপলস পার্টির নেতা যুলফিকার আলী ভুট্টো ঢাকা আসেন। তিনি বলেন, প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার ডাকেই তিনি আসিয়াছেন।
ঐ দিন তিনি প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার সাথে দেখা করেন। শেখ মুজিবও ঐদিন প্রেসিডেন্টের সাথে দেখা করেন। কিন্তু দুইজনই আলাদাভাবে।
৪. পরিষদ আবার মুলতবি
পরদিন সোমবার (২২শে মার্চ) প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া, শেখ মুজিব ও মিঃ ভুট্টোর মধ্যে সাক্ষাৎকার হয়। এর পর ২৩শে মার্চ প্রেসিডেন্ট ভবন হইতে এক ঘোষণায় বলা হয় যে, ২৫শে মার্চ পরিষদের যে বৈঠক হওয়ার কথা ছিল, তা অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত হইল। পরিষদ-বৈঠক স্থগিতের এই ঘোষণা শেখ মুজিবের সম্মতিক্রমে হইয়াছিল বলিয়া ঘোষণায় দাবি করা হইয়াছিল।
শেখ মুজিব বা আওয়ামী লীগের তরফ হইতে এই স্থগিতের ঘোষণার কোন প্রতিবাদ করা হয় নাই। শেখ মুজিব ও মিঃ ভুট্রোর সহিত আলোচনার পরপরই প্রেসিডেন্ট এই ঘোষণা করায় যুক্তিসংগতভাবেই সকলেরই এই ধারণা হইয়াছিল যে, শেখ সাহেবের সম্মতিক্রমেই এটা ঘটিয়াছিল। প্রেসিডেন্টের ঘোষণায় প্রকৃত অবস্থাই বলা হইয়াছে।
এই কারণে এই ঘোষণা প্রকাশের সাথে-সাথেই আমার মনে হইয়াছিল যে শেখ মুজিব শুধু চালে ভুল করেন নাই, তিনি ইয়াহিয়া-ভুট্রোর পাতা ফাঁদে পা দিলেন। বাস্তবিক পক্ষে আসন্ন পরিষদ-বৈঠকই ছিল শেখ মুজিবের হাতের প্রধান হাতিয়ার। এটা কি করিয়া তিনি বিরুদ্ধ পক্ষের হাতে তুলিয়া দিলেন, একথা আমি তখনও বুঝি নাই, আজও বুঝিতে পারি নাই।
বস্তুতঃ মুজিবের আন্তরিক শুভানুধ্যায়ী ও সমর্থক হওয়া সত্ত্বেও, বরঞ্চ এই কারণেই, মুজিব-চরিত্রের এই দিকটা আমাকে পীড়া দিয়াছে। ঘটনাকে নিয়ন্ত্রণ না করিয়া বরঞ্চ ঘটনার দ্বারাই তিনি নিয়ন্ত্রিত হইয়াছেন বেশি। মুজিব অক্লান্ত পরিশ্রমী, দুর্জয় সাহসী ও দক্ষ সংগঠক হওয়া সত্ত্বেও দরকারের সময় সিদ্ধান্ত নিতে তিনি দ্বিধা করিয়াছেন। এই দ্বিধার সুযোগে ঘটনা নিজের গতিতে বা অন্য কোন অদৃশ্য শক্তির প্রভাবে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত হইয়াছে। তাতেও মুজিবের দৃশ্যমান কোন ক্ষতি হয় নাই। দৃশ্যতঃ মুজিব কোনও কাজে অসফল হন নাই। কিন্তু তাঁর সবগুলো সাফল্যই চান্স বা ঘটনাচক্রের দান। এ বিষয়ে আমার জানা সব রাজনৈতিক নেতার মধ্যে শেখ মুজিবই সবচেয়ে ভাগ্যবান। শত্রু-মিত্র, পক্ষ-বিপক্ষ প্রকৃতি-পরিবেশ সবাই যেন মুজিবের অনুকূলে ষড়যন্ত্র করিয়াই বিভিন্ন দিকে ভিন্ন-ভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করিয়াছেন। যিনি যাই করিয়া থাকুন, পক্ষেই করিয়া থাকুন, আর বিপক্ষেই করিয়া থাকুন, সব গিয়া যোগ হইয়াছে মুজিবের জমার খাতায়। এতে নিঃসন্দেহে লাভ হইয়াছে প্রচুর। কিন্তু লোকসান হইয়াছে তার চেয়ে বেশি। তফাত শুধু এই যে, লাভটা দৃষ্টিগোচর, আর লোকসানটা অদৃশ্য। উভয়টাই আপাত। ভাগ্য তাঁর পক্ষে, অগণিত ঘটনায় তা প্রমাণিত হইয়াছে। তাঁর ধারণাও সুদৃঢ় ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত হইয়াছে। সে বিশ্বাসের কথা তিনি একাধিকবার সগৌরবে প্রকাশও করিয়াছেন। এই বিশ্বাসেই তিনি তাঁর ভাগ্যকে, তথা ঘটনাকে, নিজের কাজে লাগাইবার বদলে ঘটনা-স্রোতে গা ভাসাইয়া দিয়াছেন। আলোচ্য ঘটনা এই দিককার সব চেয়ে বড় নযিরের একটি।
সকলেরই মনে থাকিবার কথা, ৩রা মার্চ তারিখে ঢাকায় ন্যাশনাল এসেমরির বৈঠক বসিবে, প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার এই ঘোষণার পর হইতেই পশ্চিমা পাকিস্তানের বিভিন্ন পার্টির নেতারা ঢাকায় আসিয়া শেখ মুজিবের সাথে দেখা করিতে, ও তাঁকে সমর্থনের আশ্বাস দিতে শুরু করেন। আর পশ্চিম পাকিস্তানী এম, এন, এ.-রা পি, আই. এ.র ঢাকার টিকিট কিনিতে শুরু করেন। ১৫ই ফেব্রুয়ারি মিঃ ভুট্টো পেশোয়ার হইতে ঢাকার বৈঠক বয়কট করার হুমকি দেওয়ার পরও পশ্চিম-পাকিস্তানী মেম্বরদের ঢাকার টিকিট কিনার এই হিড়িক অব্যাহত থাকে। এটা সংবাদপত্রে প্রকাশিত সত্য যে, ভুট্রোর হুমকির পরও ৭৭ জন পশ্চিম-পাকিস্তানী এম. এন. এ. ঢাকার বৈঠকে যোগদানে আগ্রহী ছিলেন। পিপলস পার্টি ছাড়া আর সব পার্টি-নেতারাই ভুট্টোর এই হুমকির নিন্দা করিয়াছিলেন। খোদ পিপল্স পার্টিরও কতিপয় মেম্বর তাই করিয়াছিলেন। পশ্চিম-পাকিস্তানের মোট এম. এন. এ. সংখ্যা ১৪৪ জনের মধ্যে ৮৫ জনই পিপলস পার্টির। অবশিষ্ট ৫৯ জনই শুধু অন্য পার্টির। ঢাকা-যাত্রী মেম্বর সংখ্যা ৭৭ জন হওয়ায় স্পষ্টই প্রমাণিত হয় যে, অন্ততঃ ১৮ জন পিপল্স পার্টির এম. এন. এ. মিঃ ভুট্টোর নির্দেশ অমান্য করিয়াই ঢাকা বৈঠকে যোগদানে ইচ্ছ ছিলেন।
এটা পার্লামেন্টারি রাজনীতিতে খুবই স্বাভাবিক। শেখ মুজিব পাকিস্তান জাতীয় পরিষদে একক ক্লিয়ার মেজরিটি পার্টির নেতা। কিন্তু তাঁর এই একক মেজরিটিতে পশ্চিম-পাকিস্তানের কোনও মেম্বর না থাকায় তিনি পশ্চিম-পাকিস্তানের যেকোনও পার্টির সহিত কোয়ালিশন করিয়া স্থায়ী কেন্দ্রীয় মন্ত্রিত্ব চালাইতে পারেন, এটা সকলের নিকট সুস্পষ্ট হইয়া উঠিয়াছিল। তাই শেখ মুজিবের সমর্থন লাভের জন্য প্রতিযোগিতা লাগিয়া গেল। শুধু মন্ত্রিত্বের লোভের কথা নয়। মন্ত্রিত্বে শরিক হইতে পারিলে দলগত সুবিধাও আপনিই হইবে, এটাও সকলের জানা কথা। মিঃ ভুট্টো পশ্চিম-পাকিস্তানের রাজনীতিতে নবাগত। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে জয়লাভটা তাঁর একান্তই আকস্মিক সৌভাগ্য। মিঃ ভুট্টোর এই আকস্মিক বিজয়ে মিঃ মমতাজ দওলতানা, মিঃ ওয়ালী খাঁ, মওলানা মওদুদী প্রভৃতি পশ্চিম-পাকিস্তানী প্রবীণ নেতারা নিশ্চয়ই খুবই বিস্মিত, দুঃখিত ও লজ্জিত হইয়াছিলেন। এটাকে নিতান্ত সাময়িক দুর্ঘটনা বলিয়াও তাঁরা মনে করিয়াছিলেন। পূর্ব-পাকিস্তানের একক নেতা শেখ মুজিবের সমর্থনে কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভায় ঢুকিতে পারিলে অল্পদিনেই তাঁরা এই সাময়িক পরাজয় পাড়ি দিতে পারিবেন, এমন আশা তাঁরা নিশ্চয়ই করিয়াছিলেন। এই আশায় তাঁরা ছয়-দফা-ভিত্তিক শাসনতান্ত্রিক সংবিধান রচনায়ও রাযী হইতেন। আসলে ‘ছয়-দফা’ যে পাকিস্তানের সংহতি-বিরোধী ছিল না, এ বিষয়ে ইয়াহিয়া ভুট্টো, দওলতানা-ওয়ালী খাঁ, মওদুদী-মাহমুদ সবাই একমত ছিলেন। ছয়-দফার জন্য যে মুজিব ভুট্টো-ইয়াহিয়া আলোচনা ভাংগে নাই, সত্য কথা এই যে আপোস আলোচনা মোটেই ভাংগে নাই, ২৫শে মার্চের হামলা যে সম্পূর্ণ অন্য কারণে হইয়াছিল, সে কথার বিস্তারিত আলোচনা অন্যত্র করিয়াছি। এখানে এ বিষয়টার উল্লেখ করিলাম এই জন্য যে, ছয়-দফা-ভিত্তিক সংবিধান রচনায় শেখ মুজিবের সমর্থন করিতে পশ্চিম-পাকিস্তানের অন্য সব পার্টিই রাযী হইতেন। পশ্চিম পাকিস্তানের সুস্পষ্ট মেজরিটি দল পিপলস পার্টিকে বাদ দিয়া পাকিস্তানের সংবিধান রচনা রাজনৈতিক বা ন্যায়নৈতিক দিক হইতে ঠিক হইত কি না, সেটা আলাদা কথা। কিন্তু পিপলস পার্টিকে বাদ দিয়া অন্য যে-কোনও বা সব পার্টিকে লইয়া মন্ত্রিত্ব গঠন যে কোনও দিক হইতেই শেখ মুজিবের পক্ষে অন্যায় হইত না, এ বিষয়ে কোনও তর্কের অবকাশ নাই। শেখ মুজিবের মত সংগ্রামী ও অভিজ্ঞ নেতা এ ব্যাপারে কোনও ভূল করিতে পারেন না, এ বিশ্বাসেই পশ্চিম-পাকিস্তানের অন্যান্য সব পার্টিসমূহের নেতারা সদলবলে শেখ মুজিবের এমন জোর সমর্থন দিয়াছিলেন।
