যা হোক বেলা আড়াইটায় প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া ঢাকা পৌঁছিলেন। তাঁর সাথে আসিলেন প্রধান সেনাপতি জেনারেল আবদুল হামিদ, পীরযাদা ও গুলহাসান প্রভৃতি আরো কয়জন জেনারেল। এদের সংগে আসিলেন সুপ্রিম কোর্টের সাবেক প্রধান বিচারপতি জাস্টিস এ, আর, কর্নেলিয়াসও। তিনি তৎকালে প্রেসিডেন্টের আইনমন্ত্রীও ছিলেন।
এয়ারপোর্টে প্রেসিডেন্টকে অভ্যর্থনা করিতে গবর্নর লেঃ জেনারেল টিক্কা খান ও আরও কতিপয় সামরিক-অসামরিক অফিসার ছাড়া আর কেউ যান নাই। প্রেসিডেন্ট এয়ারপোর্ট সমবেত রিপোর্টারদের এড়াইয়া সোজা প্রেসিডেন্ট ভবনে চলিয়া যান। প্রেসিডেন্ট ভবনে সাংবাদিকরা তাঁর সাথে দেখা করিতে চাহিলে প্রেসিডেন্ট তাতেও অসম্মত হন। প্রেসিডেন্টের পি. আর, ও, সাংবাদিকদের আরও বলেন যে, প্রেসিডেন্ট কতদিন ঢাকায় থাকিবেন, কবে ফিরিয়া যাইবেন, তাও তিনি বলিতে পারিবেন না। মোট কথা, সমস্ত ব্যাপারটাই ছিল ঢাকৃঢাক ঘুরঘুর অবস্থা। তবে প্রেসিডেন্ট আওয়ামী নেতৃবৃন্দের সংগে সাক্ষাত করিবেন কিনা, এই প্রশ্নের উত্তরে প্রেসিডেন্টের পি, আর, ও, সাংবাদিকদেরে স্মরণ করাইয়া দিলেন যে, প্রেসিডেন্ট গত জানুয়ারি মাসের ১১ই ও ১২ই তারিখে আওয়ামী নেতৃবৃন্দের সহিত সাক্ষাৎ করিয়াছিলেন। পি. আর, ও, বোধ হয় পরোক্ষভাবে বলিতে চাহিয়াছিলেন যে প্রেসিডেন্ট আওয়ামী, নেতৃবৃন্দের সাথে কথাবার্তা বলিতেই আসিয়াছেন। কিন্তু এই সহজ কথাটাই সোজাভাবে বলিতে পারেন নাই। সব অবস্থা এমনই অনিশ্চিত ছিল। ১১ই ও ১২ই জানুয়ারি সত্যসত্যই প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া আওয়ামী নেতৃবৃন্দের সাথে কথাবার্তা বলিয়াছিলেন : প্রথম দিনের সাক্ষাতটা ছিল ইয়াহিয়া-মুজিবের মধ্যকার একান্ত ব্যক্তিগত মোলাকাত। কারও পক্ষে কোন সহযোগী ছিলেন না। দ্বিতীয় দিনের মোলাকাতে শেখ মুজিবের সংগে ছিলেন তাঁর প্রথম কাতারের সহকর্মীদের মধ্যে সৈয়দ নযরুল ইসলাম, তাজুদ্দিন আহমদ, খোন্দকার মুশতাক আহমদ, ক্যাপ্টেন মোহাম্মদ মনসুর আলী, এ, এইচ, এম কামরুজ্জামান। প্রেসিডেন্টের সহযোগী ছিলেন লেঃ জেঃ পীরযাদা ও পূর্ব-পাকিস্তানের তৎকালিন গবর্নর ভাইস-এডমিরাল আহসান। সে আলোচনা সন্তোষজনক হইয়াছিল বলিয়া তৎকালে জানান হইয়াছিল।
২. বৈঠক শুরু
সংবাদপত্র রিপোর্টাররা তথা জনসাধারণ আগে হইতে কিছু জানিতে না পারিলেও পরদিন ১৬ই মার্চ প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া ও আওয়ামী নেতৃবৃন্দের মধ্যে বৈঠক শুরু হয়। প্রথম দিনের বৈঠক ১৫০ মিনিট স্থায়ী হয়। উভয় পক্ষেই কয়েকজন করিয়া সহকারী ছিলেন। দ্বিতীয় দিনের (১৭ই মার্চ) বৈঠকও ১৫০ মিনিট স্থায়ী হয়। এই দিনের বৈঠক ছিল একান্ত। প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া বা শেখ মুজিবের সাথে কোনও সহকারী ছিলেন না। তবে দ্বিতীয় দিনের বৈঠকে যোগদানের আগে শেখ সাহেব তাঁর প্রথম কাতারের নেতাদের সাথে আলাপ-আলোচনা করিয়া গিয়াছিলেন।
এই বৈঠক চলে বিরতিহীনভাবে ২০শে মার্চ পর্যন্ত। দুই পক্ষ হইতে যুক্তভাবে কি কোনও পক্ষ হইতে এককভাবে এইসব আলোচনার বিষয়বস্তু বা আলোচনার ধারার বিষয়ে কোনও বিবৃতি বাহির হয় নাই। কিন্তু সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে শেখ মুজিব নিজে, কখনও তাঁর সহকর্মীদের কেউ-কেউ, বলিয়াছেন : আলোচনায় অগ্রগতি হইতেছে।
এই মুদ্দতের মধ্যে পশ্চিম পাকিস্তানের অনেক নেতা শেখ মুজিবের সাথে তাঁর বাড়িতে দেখা-সাক্ষাত ও আলোচনা করেন। এঁদের মধ্যে ন্যাপ নেতা আবদুল ওয়ালী খা মুসলিম লীগের নেতা মমতাজ দণ্ডলতানা, জমিয়তে-ওলামার নেতা মুফতি মাহমুদ প্রভৃতির নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। কিন্তু এদের সংগে শেখ মুজিবের কি আলোচনা হইয়াছে, তা প্রকাশ নাই।
৩. বৈঠক ব্যর্থ
তবে এই আলোচনা চলিতে থাকাকালেই ২১শে মার্চ তারিখে স্টুডেন্টস্ অ্যাকশন কমিটি দেশবাসীর উদ্দেশ্যে এই আপিল করেন যে ২৩শে মার্চকে বরাবরের মত ‘পাকিস্তান-দিবস’ রূপে পালন না করিয়া প্রতিরোধ দিবস উদযাপন করিতে হইবে এবং পাকিস্তান নিশানের বদলে স্বাধীন বাংলাদেশ পতাকা উত্তোলন করিতে হইবে। বলা আবশ্যক যে ‘স্বাধীন বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা’ রূপে একটি পতাকা একদল ছাত্র ইতিমধ্যেই চালু করিয়াছিল। ৭ই মার্চের ঘৌড়দৌড় মাঠের সভায় এই পতাকা অনেক দেখা গিয়াছিল। শেখ মুজিবকে দিয়া এই পতাকা উড়াইবার মানে বাংলার স্বাধীনতা ঘোষণা করিবার খুব জোর চেষ্টা হইয়াছিল। শেখ মুজিব বুদ্ধিমত্তার সাথে এই চেষ্টা প্রতিহত করেন।
এ অবস্থায় ২১শে মার্চ (বুধবার) ছাত্র-সংগ্রাম কমিটির ঐ ঘোষণায় অনেকেই বিভ্রান্ত হইয়াছিলেন। অনেকেই ধরিয়া নিয়াছিলেন যে, ইয়াহিয়া-মুজিব বৈঠক ব্যর্থ হইতে যাইতেছে। একদিকে শেখ মুজিবসহ আওয়ামী নেতৃবৃন্দ বলিতেছেন আলোচনার অগ্রগতি হইতেছে, অপর দিকে আওয়ামী লীগের ছাত্রফ্রন্ট বলিতেছেন, ‘স্বাধীন বাংলা পতাকা উড়াইতে এবং পাকিস্তান দিবস’ পালন না করিতে। এটা স্পষ্টতঃ অনেকের জন্যই বিভ্রান্তিকর ছিল। কিন্তু আমার মত অনেক বুদ্ধিমান এই বলিয়া ও ভাবিয়া সান্ত্বনা পাইয়াছিলেন যে, আলোচনায় প্রেসিডেন্ট ও পশ্চিম-পাকিস্তানী নেতাদেরে চাপ দিবার উদ্দেশ্যেই আওয়ামী নেতারা ছাত্রদেরে দিয়া ওটা করাইতেছেন। আসলে ওটা স্বাধীনতা-টাধীনতা কিছু নয়।
