৯. অপর দিক
এ সমস্ত ব্যাপারটারই অন্য একটা দিক আছে, সে কথাও আগেই বলিয়াছি। সে দিকটারই আলোচনা এখন করা যাউক।
আমি যেমন মনে করি, ৭ই মার্চের সভায় শেখ মুজিব ভুল করিয়াছিলেন প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার পরিষদ ডাকার ব্যাপারটার সুযোগ গ্রহণ না করিয়া, তেমনি একশ্রেণীর লোক আছেন যাঁরা মনে করেন, ৭ই মার্চে শেখ মুজিব ভুল করিয়াছিলেন ঐ দিন স্বাধীনতা ঘোষণা না করিয়া। এদের কেউ কেউ কাগযে-কলমে সে কথা বলিয়াছেন, অনেকে আমার সাথে তর্কও করিয়াছেন। তাঁদের মত এই যে, শেখ মুজিব যদি ৭ই মার্চের ঘোড়-দৌড়-ময়দানের পঁচিশ লাখ লোকের সমাবেশে স্বাধীনতা ঘোষণা করিয়া গবর্নর হাউস, রেডিও স্টেশন ও ক্যান্টনমেন্ট দখল করিতে অগ্রসর হইতেন, তবে একরূপ বিনা-রক্তপাতে তিনি বাংলাদেশকে স্বাধীন করিতে পারিতেন। তাতে পরবর্তী কালের নিষ্ঠুর হত্যাকাণ্ড ও নয় মাসের যুদ্ধ, তাতে ভারতের সাহায্য, এসব কিছুরই দরকার হইত না।
এই মতের আমি দৃঢ়তার সংগে প্রতিবাদ করি। আমার ক্ষুদ্র বিবেচনায়, এ ধরনের কথা যাঁরা বলেন অথবা চিন্তা যাঁরা করেন, তাঁদের রাজনীতি বা সমরনীতির কোনও অভিজ্ঞতা নাই। তাঁরা বড় জোর থিওরিস্ট মাত্র। ৭ই মার্চের সভায় স্বাধীনতা ঘোষণাটা না করিয়া মুজিব কত বড় দূরদর্শিতার পরিচয় দিয়াছিলেন, সেটা বুঝিবার মত জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা ঐসব থিওরিস্টের নাই। এ সম্পর্কে অনেক কথাই বলা যায়। সে সব কথারই মোটামুটি দুইটা দিক আছে। ৭ই মার্চ শেখ মুজিবের সামনে সে দুইটা দিকই সমান জোরে উপস্থিত ছিল। এক, যুক্তির দিক। দুই, বাস্তব দিক। সংক্ষেপে এই দুইটা দিক সম্বন্ধেই বলা চলে, কোন দিক হইতেই ৭ই মার্চ স্বাধীনতা ঘোষণা করা সমীচীন হইত না। যুক্তির দিক হইতে হইত না এই জন্য যে, প্রেসিডেন্টের পক্ষে বেআইনীভাবে পরিষদের বৈঠক বাতিল করাটাই স্বাধীনতা ঘোষণার পক্ষে যথেষ্ট কারণ ছিল না। আর বাস্তবতার দিক হইতে এটা সমীচীন হইত না এই জন্য যে তাতে সভায় সমবেত বিশ লাখ নিরস্ত্র জনতাকে সংগীন উঁচা-করা সুসজ্জিত সামরিক বাহিনীর গুলির মুখে ঠেলিয়া দেওয়া হইত। তাতে নিরস্ত্র জনতাকে জালিয়ানওয়ালা বাগের হত্যাকাণ্ডের চেয়ে বহুগুণে বিপুল নিষ্ঠুরতম হত্যাকাণ্ডের শিকার বানানো হইত। হত্যাকাস্ত্রে বাদেও যেসব নেতা বাঁচিয়া থাকিতেন, তাঁদেরে গ্রেফতার করা হইত। বিচারও একটা হইত। তার ফলও জানা কথা। ফলে স্বাধীনতার বা অটোনমির আন্দোলন বহুদিনের জন্য চাপা পড়িত। পূর্ব-পাকিস্তান বা বাংলাদেশের পক্ষে সেটাই হইত অনেক বেশি গুরুতর লোকসান।
অতএব, ৭ই মার্চ স্বাধীনতা ঘোষণা না করিয়া শেখ মুজিব যোগ্য জননেতার কাজই করিয়াছেন, এ কথা নিঃসন্দেহে বলা যাইতে পারে। রাজনীতির দিক হইতেও শেখ মুজিবের এই আচরণ যে নির্ভুল হইয়াছিল এবং জনগণের সমর্থন পাইয়াছিল, তার বড় প্রমাণ এই যে অসহযোগ আন্দোলন তাতে স্তিমিত না হইয়া বরঞ্চ আরও জোরদার হইয়াছিল। স্বাধীনতা ঘোষণা না করিয়াও শেখ মুজিব কার্যতঃ পরবর্তী আঠার দিন স্বাধীন পূর্ব-পাকিস্তানের শাসন-তার হাতে পাইয়াছিলেন। স্টেট ব্যাংকসহ সবগুলি ব্যাংক, টেলি, পোস্ট অফিস সবই শেখ মুজিবের ডাইরেকটিভ-মত চলিয়াছিল। কেন্দ্রীয় সরকারের কোন দখল বা আধিপত্যই তখন ছিল না। রাজনীতির অবস্থাও তাই ছিল। ১ই মার্চ মওলানা ভাসানী ও আতাউর রহমান খাঁ পল্টন ময়দানে এক জনসভায় আওয়ামী লীগ দাবির সমর্থন করেন। ইয়াহিয়া ও পশ্চিম-পাকিস্তানী নেতাদের শেখ মুজিবের সাথে আপোস করিতে উপদেশ দেন। মুজিবের দাবি লাহোর-প্রস্তাব-ভিত্তিক, এ কথাও তাঁরা স্মরণ করাইয়া দেন। উভয় নেতাই পশ্চিমা-নেতৃবৃন্দ ও কেন্দ্রীয় সরকারকে বলেন : শেখ মুজিবকে আপনারা অবিশ্বাস বা উপেক্ষা করিবেন না। পূর্ব-পাকিস্তানের গোটা জনতাই মুজিবের পিছনে।
প্রশাসনিক পর্যায়ে চিফ সেক্রেটারি মিঃ শফিউল আযমের সভাপতিত্বে ১২ই মার্চ সি. এস. পি, এসোসিয়েশন ও ই. পি. সি. এস. পি. এসোসিয়েশনের যুক্ত বৈঠকে আওয়ামী লীগের দাবি ও আন্দোলনের সমর্থনে প্রস্তাব গৃহীত হয়।
বিচার বিভাগেরও সেই কথা। ঢাকা হাইকোর্টের চিফ জাস্টিস মিঃ বদরুদ্দিন সিদ্দিকী নব-নিযুক্ত গবর্নর লেঃ জেনারেল টিক্কা খানকে হলফু পড়াইতে অস্বীকৃতি জানাইয়া ইতিহাস সৃষ্টি করেন। এইভাবে মুজিবের জয় সর্বাত্মক ও পরিপূর্ণ হয়।
৩২.০৪ ইয়াহিয়া-মুজিব বৈঠক
ইয়াহিয়া-মুজিব বৈঠক
উপাধ্যায় চার
১. ইয়াহিয়ার ঢাকা আগমন
এমনি অবস্থায় ১৫ই মার্চ তারিখে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া ঢাকায় আসেন। সে আসাটাও ছিল শেখ মুজিবের অনুমতিসাপেক্ষ। তিনি ১২ই মার্চ পিণ্ডি হইতে করাচি আসিয়া যেন শেখ মুজিবের অনুমতির অপেক্ষাই করিতেছিলেন। ১৩ই মার্চ ন্যাপ নেতা খান আবদুল ওয়ালী খ শেখ মুজিবের সাথে তাঁর ধানমণ্ডির বাসভবনে অনেকক্ষণ আলোচনা করেন। এরপর শেখ মুজিব রিপোর্টারদেরে বলেন যে, প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া ঢাকা আসিলে তিনির সাথে আলোচনায় বসিতে রাযী আছেন। ধরিয়া নেওয়া যাইতে পারে মুজিব-ওয়ালী আলোচনার এটাও একটা বিষয় ছিল। শেখ মুজিব এমন একটা কিছু বলুন, প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার ইচ্ছাও বোধ হয় তাই ছিল। শেখ মুজিবের এই ঘোষণায় তাঁর দিক হইতে ব্যাপারটা নিশ্চয়ই পরিষ্কার হইয়াছিল। তবু কিন্তু প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার অভিপ্রায় কিছুই বোঝা যাইতেছিল না। ১৫ই মার্চ বেলা অপরাহ্ন আড়াইটায় প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া ঢাকা বিমানবন্দরে অবতরণের আগে পর্যন্ত রেডিও পাকিস্তানে বা সংবাদ-এজেন্সির তরফ হইতে এ বিষয়ে কিছুই বলা হয় নাই। কাজেই বোঝা যায়, প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার ঢাকা আগমনটা গোপন রাখাই সরকারের ইচ্ছা ছিল। ফলে জনসাধারণ এ বিষয়ে কিছুই জানিতে পারে নাই। এয়ার পোর্ট হইতে প্রেসিডেন্ট ভবন পর্যন্ত সারা রাস্তায় সেনাবাহিনী, পুলিশ ও ই.পি.আর, মোতায়েন দেখিয়া যা কিছু অনুমান করা গিয়াছিল মাত্র।
