৮. পরিষদে যোগ দিলে কি হইত?
কিন্তু এই ঘটনার আর একটা দিক আছে। সে কথা আগেই বলিয়াছি। আরও আলোচনা একটু পরে করিতেছি। এখানে পরিষদে যোগ দেওয়ার ট্যাকটিকাল দিকটারই কথা বলিতেছি। ৬ই মার্চের রাতে ও পরের সকালে টেলিফোনের আলাপে এই দিকটার দিকেই আমি শেখ মুজিবের মনোযোগ আকৰ্ষণ করিয়াছিলাম। আমি বলিয়াছিলাম : তুমি পরিষদে যোগ দাও। প্রথম দিনে স্পিকার, ডিপুটি স্পিকার নির্বাচন কর। এ বিষয়ে এত বিস্তারিত আলোচনা হইয়াছিল যে কাকে স্পিকার করা হইবে, সে সম্বন্ধেও আমি আমার মত জানাইয়াছিলাম। আইউবের অনুকরণে দুইজন ডিপুটি স্পিকার করিতেও বলিয়াছিলাম। এক নম্বর ডিপুটি স্পিকার পশ্চিম পাকিস্তান হইতে ও দুই নম্বর ডিপুটি স্পিকার পূর্ব-পাকিস্তান হইতে (তার অর্থ আওয়ামী লীগার হইতে) নিবার পরামর্শ দিয়াছিলাম। পশ্চিম-পাকিস্তানের কাকে এক নম্বর ডেপুটি স্পিকার করা হইবে, সে সম্বন্ধে ওয়ালী খাঁ ও দণ্ডলতানার মতামত লইতেও বলিয়াছিলাম। এসব খুটিনাটির সবগুলিই ছিল ট্যাকটিকাল পন্থা। কিন্তু আসল কথা ছিল স্ট্রাটেজির সুস্পষ্ট সুবিধার কথা। সে সম্পর্কে আমি বলিয়াছিলাম। স্পিকার-ডেপুটি স্পিকার নির্বাচনের পরেই তুমি লিডার অব-দি-হাউসের ভূমিকায় অবতীর্ণ হইবা। তুমি স্পিকারকে সযোধন করিয়া বলিবা, উভয় পাকিস্তানের নেতাদের মধ্যে একটা সমঝোতা আনার জন্য প্রেসিডেন্ট যে অনুরোধ করিয়াছেন, সে উদ্দেশ্যে স্পিকার মহোদয় যেন সাত দিনের জন্য হাউস মুলতবি করিয়া দেন। তোমার ইশারা-মত স্পিকার তাই করিবেন। তোমরা আলোচনায় বসিবা। প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার উপস্থিতিতেই এটা হইতে পারে। আলোচনা সভায় তোমাদের পক্ষের বক্তব্য হইবে।
সংবিধান সম্বন্ধে একমাত্র আওয়ামী লীগেরই ভোটারদের কাছে নির্বাচনী-ওয়াদা আছে। পশ্চিমা কোনও পার্টিরই তেমন কোন ওয়াদা নাই। তাছাড়া নির্বাচনের পরে আওয়ামী-মেম্বররা আল্লাকে হাযির-নাযির জানিয়া জনতার সামনে হলফ লইয়াছেন। এ অবস্থায় আওয়ামী লীগের ছয় দফাঁকে ভিত্তি করিয়াই সংবিধান রচনা করা হউক।
তোমাদের পক্ষের বক্তব্য শুনিয়া পশ্চিমা-নেতারা রাযী হইলে ত ভালই। রাযী হইলেও তোমার কোনও অসুবিধা নাই। সাত দিন পরে আবার পরিষদের বৈঠক বসিবে। প্রথমেই তুমি দাঁড়াইয়া স্পিকারকে বলিবা ও আমাদের আলোচনা সাফল্যের পথে অনেক দূর অগ্রসর হইয়াছে। আরও একটু সময় দরকার। আরও সাত দিনের জন্য সভা মুলতবি হউক।
যতদিন ইচ্ছা তুমি এমনি করিয়া হাউস মুলতবি করাইবা।
এই পন্থার এভানটেজ এই যে হাউসের উপর প্রেসিডেন্টের কোনও ক্ষমতা থাকিবে না। একক ক্ষমতা থাকিবে স্পিকারের। স্পিকার যতদিন ইচ্ছা এমনিভাবে হাউস চালাইতে থাকিবেন। প্রেসিডেন্ট কিছুই করিতে পারিবেন না, এল, এফ, ও, নির্ধারিত এক’শ বিশ দিনের আগে।
আমার দৃঢ় বিশ্বাস, অতদিন যাইবে না। তার আগেই প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়াসহ পশ্চিমা নেতারা বলিয়া ফেলিবেন যে, স্ট্র্যাটেজি ও ট্যাকটি উভয়টাতেই পশ্চিমারা তোমার কাছে হারিয়া গিয়াছেন। তোমার কথামত শাসনতান্ত্রিক সংবিধান রচনা করিতে তাঁদের অধিকাংশই রাযী হইবেন। তা নাও যদি হয়, তবু যে ডেডল সৃষ্টি হইবে, তাতেও তোমার জয় হইবে।
আমার ধারণা ছিল, মুজিব আমার যুক্তির সারবত্তা মানিয়া লইয়াছেন। তিনি সেমতেই কাজ করিবেন। কিন্তু ৭ই মার্চের বক্তৃতায় আমি নিরাশ হইয়াছিলাম। তবু আশা ছাড়ি নাই। পরবর্তী এক ঘোষণায় শেখ মুজিব বলিয়াছিলেন, তিনি মওলানা ভাসানী, জনাব আতাউর রহমান খাঁ ও অধ্যাপক মুযাফফর আহমদের সংগে আলোচনা করিবেন। কথা শুনামাত্র ন্যাপ নেতাদেক্সে জানাইলাম, আতাউর রহমান খা সাহেবকে নিজে বলিলাম, শেখ মুজিবের সংগে আলাপ করিতে। আতাউর রহমান সাহেব বলিলেন : যদিও এ ঘোষণা খবরের কাগয়ে পড়া ছাড়া আর কিছুই তিনি জানেন না, মানে শেখ মুজিব তাঁকে টেলিফোনেও অনুরোধ করেন নাই, তবু তিনি যাইবেন এবং যাতে মওলানা সাহেব ও মুযাফফর সাহেবও যান, তার চেষ্টাও তিনি করিতেছেন। আমি আতাউর রহমান সাহেবকে মুজিবের বরাবরে আমার উপদেশের কথা বলিলাম এবং তিনিও যাতে শেখ সাহেবকে অমন পরামর্শ দেন, সেজন্য তাঁকে অনুরোধ করিলাম। প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া ঢাকায় আসিবার আগেই যাতে এটা হয়, তারও আবশ্যকতা আতাউর রহমান সাহেবকে বুঝাইলাম।
তিনি রাযী হইলেন। একরূপ নিজেই উদ্যোগী হইয়া শেখ মুজিবের সাথে দেখা করিলেন। সেখান হইতে তিনি সোজা আমার বাসায় আসিলেন। তাঁদের মধ্যে দীর্ঘ আলোচনা হইয়াছে। সে আলোচনায় আমার মত পরামর্শ তিনিও দিয়াছেন। বরঞ্চ আরো বেশি দৃঢ়তার সংগে আরো অগ্রসর পরামর্শ তিনি দিয়াছেন। তাঁর পরামর্শ ও যুক্তি মোটামুটি আমারই মত হইয়াছে। তবে তিনি আরও একটু আগাইয়া বলিয়াছেন যে, নিজের মেজরিটির জোরেই ছয়-দফা ভিত্তিক একটি সংবিধান রচনা করিয়া ফেলাই শেখ মুজিবের উচিৎ। মোট কথা পরিষদ বয়কট করার তিনি বিরোধী, দৃঢ়তার সংগে সে কথা তিনি শেখ মুজিবকে বলিয়া দিয়া আসিয়াছেন।
সুতরাং দেখা গেল, আমরা যাঁরা শেখ মুজিবকে পরামর্শ দিবার দাবি রাখি, দায়িত্বও আছে এবং যাঁদের পরামর্শের দাম আছে বলিয়া আওয়ামী লীগের ও জনগণের অনেকে মনে করেন, তাঁদের অনেকেনা হউক, কেউ-কেউ আমরা মুজিবকে পরিষদে যোগ দিবার পরামর্শ দিয়াছিলাম এবং সেটা দিয়াছিলাম প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার সংগে তাঁর সাক্ষাৎ হইবার আগেই। প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া ঢাকা আসেন ১৫ই মার্চ এবং ঐ দিন হইতে অন্ততঃ ২৪শে মার্চ পর্যন্ত পুরা দশ দিন শেখ মুজিব ও প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার মধ্যে কথাবার্তা হয়। এ কথাবার্তার বিষয়ে পরে আলোচনা করিব। এখানে ও-কথাটার উল্লেখ করিলাম এই জন্য যে আমাদের পরামর্শ রাখিবার হইলে সে সুযোগ শেখ মুজিবের প্রচুর ছিল। তবু যে শেখ মুজিব আমাদের পরামর্শমত কাজ করেন নাই, তার অনেক কারণ থাকিতে পারে। কিন্তু আমার দৃঢ় বিশ্বাস, যা তখনও ছিল, আজও আছে, তা এই যে, শেখ মুজিব চাপে পড়িয়াই আমাদের পরামর্শমত কাজ করিতে পারেন নাই। যা হোক, পরিষদে যোগ না দেওয়াটা, আমার ক্ষুদ্র বিবেচনায়, শেখ মুজিবের একটা মস্তবড় ভুল। এ ভুলের দমই ২৫শে মার্চের নিষ্ঠুর ঘটনা ঘটিয়াছিল। অন্যথায় তা ঘটিত না। ব্যাপার অন্যরূপ হইত। তাতেও শেখ মুজিবেরই জয়হইত।
