এসব সারিতে এগারটা বাজিয়া গেল। ডাক্তারদের সবাই আমার প্রেঙ্কে বন্ধু। সবারই মুখে উদ্বেগ ও বুকে চাঞ্চল্য। তাঁদের সকলের জিগ্গাসা : আজ শেখ সাহেব ময়দানের বক্তৃতায় কি বলিবেন? আমাদের ভাগ্যে কি হইবে? ভাবখানা এই যে আমি যেন সবই জানি। যত বলিলাম আমি তাঁদেরই মত অন্ধকারে ততই তাঁরা সকলে চাপিয়া ধরিলেন। রেডিওলজিস্ট ডাঃ শামসুল হকের বিশাল চেম্বারে বসিলাম। ডাক্তার-ছাত্রদের ভিড়। চা-বিস্কুটের ফরমায়েশ হইয়া গেল। শুধু একা আমি কথা। বলিলাম না। যাঁর-যা অভিজ্ঞতা-অভিমত সবাই বলিলাম। তার মধ্যে ডাঃ ফযলে রাবি সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর সংবাদ দিলেন। তিনি মাত্র ঘন্টা দুই আগে ধানমন্ডি ব্রোগী দেখিতে গিয়াছিলেন। শেখ সাহেবের বাড়ির কাছেই তাঁর রোগী। তিনি দেখিয়া আসিয়াছেন, এক বিশাল জনতা শেখ সাহেবের বাড়ির সামনে ভিড় করিয়াছে। তিনি জানিতে পারিয়াছেন, জনতার পক্ষ হইতে শেখ সাহেবকে বলা হইতেছে, আজকার সভায় স্বাধীনতা ঘোষণার ওয়াদা না করিলে শেখ সাহেবকে বাড়ি হইতে বাহির হইতে দেওয়া হইবে না। ভিড়ের মধ্যে তরুণের সংখ্যাই বেশি, বোধ হয় সব ছাই হইবে। ডাঃ রাবি আরও আশংকা প্রকাশ করিলেন, আজকার সভায় স্বাধীনতার কথা বলা হইলে সামরিক বাহিনী জনতার উপর গুলিবর্ষণ করিবে, এমন গুজব শহরময় ছড়াইয়া পড়িয়াছে। এ অবস্থায় একটা চরম বিপদ ঘটিতে পারে বলিয়া সকলেই আশংকা প্রকাশ করিলেন। এ বিষয়ে আমার মত কি সবাই জানিতে চাহিলেন।
আমি সবাইকে সান্ত্বনা দিবার চেষ্টা করিলাম। আগের রাতে ও সকালে মুজিবের সাথে আমার টেলিফোনে আলাপের কথাটা প্রকাশ না করিয়া যতটুকু বলা যায়, ততটা জোর দিয়া বলিলাম : ‘এমন কিছুই ঘটিবে না। আজকার সভায় শেখ মুজিব ঠিকই উপস্থিত থাকিবেন। দূরদশী দায়িত্বশীল নেতার মতই বক্তৃতা করিবেন। গুলি-গোলার আশংকা তাঁদের অমূলক।’ বলিলাম বটে, কিন্তু আমার নিজের বুক আশংকায় দুরু দুরু করিতে থাকিল। আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ওয়াদার প্রতি সামরিক বাহিনী ও পশ্চিমা নেতাদের অনমনীয় অগণতান্ত্রিক মনোভাব আমাকে সত্যই ভাবাইয়া তুলিয়াছিল। ‘বেলুচিস্তানের খুনী’ বলিয়া মশহুর জেনারেল টিক্কা খান নয়া গবর্নর নিযুক্ত হইয়াছেন। তিনি ঢাকায় পৌঁছাইয়াছেন বা পৌঁছাইতেছেন, খবরটা জানাজানি হইয়া গিয়াছিল। প্রায় বারটার দিকে মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল হইতে বাসায় ফিরিলাম। ফিরিবার পথে দেখিলাম, তখন হইতেই ময়দানে জনতার ভিড় হইতেছে।
ভালয়-ভালয় শেখ সাহেবের সভা হইয়া গেল। আগেই জানাজানি হইয়া গিয়াছিল যে শেখ মুজিবের বক্তৃতা সোজাসুজি সভাস্থল হইতে ব্রডকাস্ট করা হইবে। এ খবর বা ধারণা ভিত্তিহীন ছিল না। আগের দিন ৬ই মার্চ রেডিও-টেলিভিশনের আটিস্টরা বাংলা একাডেমী প্রাঙ্গণে এক সভা করিয়া জনগণের এই সংগ্রামে তাঁদের একাত্মতা ঘোষণা করিয়াছিলেন। বেগম শায়লা আর্জুমন্দবান এই সভায় সভানেত্রিত্ব করিয়াছিলেন। কামরুল হাসান, গোলাম মোস্তফা, খান আতাউর রহমান, মোস্তফা যামান আরাসী, আনওয়ার হোসেন, রাযযাক, হাসান ইমাম, ওয়াহিদুল হক, আযিযুল ইসলাম প্রভৃতি অনেক খ্যাতনামা রেডিও টেলিভিশন আটিস্ট মর্মস্পর্শী বক্তৃতা করিয়াছিলেন।
কিন্তু মার্শাল ল কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপে সভাস্থল হইতে সে বক্তৃতা ব্রডকাস্ট হইতে পারিল না। তবে সভা-ফেরতা লোকের মুখে শুনিলাম, বিপুল জনতার সমাবেশ হইয়াছিল। শেখ সাহেবও প্রাণখোলা বক্তৃতা করিয়াছেন। একাই। যা আশংকা করা হইয়াছিল তাহয় নাই। শেখ সাহেব স্বাধীনতা ঘোষণা করেন নাই। কাজেই জেনারেল টিক্কা খানও হাতসাফাই দেখাইতে পারেন নাই।
পরদিনই চক্ষু-কর্ণের বিবাদ ভঞ্জন হইল। বেতার কর্মীদর দৃঢ়তায় সরকার নরম হইলেন। পরদিন সকাল আটটায় রেডিওতে ও সন্ধ্যায় টেলিভিশনে শেখ সাহেবের বক্তৃতা শুনিতে ও সভার অপূর্ব দৃশ্য দেখিতে পাইলাম। স্বভাবতঃই ইতিমধ্যে গত পাঁচদিনে উভয় পক্ষের অবিবেচক ও উচ্ছংখল লোকজনের দোষে অনেক খুন-খারাবি হইয়া গিয়াছিল। ফলে সভায় ভীষণ উত্তেজনা। অত উত্তেজনার মধ্যেও শেখ মুজিব জন-নেতার উপযোগী ধৈর্য ও সহিষ্ণুতা দেখাইয়া বক্তৃতা শেষ করিয়াছেন। অহিংস অসহযোগ চালাইয়া যাইবার বিস্তারিত নির্দেশ দিয়াছেন। রাষ্ট-পরিচালকের আস্থা লইয়াই নির্দেশগুলো উচ্চারণ করিয়াছেন। তাঁর ঐসব আদেশ-নির্দেশ পালিত হইবেই, সামরিক সরকার শত চেষ্টায়ও তাঁর নির্দেশ পালনে জনগণকে বা সরকারী কর্মচারীগণকে বিরত করিতে পারিবেন না, তেমন কর্তৃত্বের আত্মবিশ্বাস শেখ মুজিবের কণ্ঠস্বরে ফুটিয়া উঠিল। আমি শুধু পুলকিত হইলাম না, আশস্তও হইলাম। এমন অবস্থায় নেতার যে মনোবল ও আত্মবিশ্বাস একান্ত দরকার শেখ মুজিবের তা আছে। কাজেই এদিককার কোনও ভাবনা আমার হইল না।
আমার ভাবনা, শুধু ভাবনা নয়, দুশ্চিন্তা হইল অন্যদিকে। শেখ মুজিব প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার আহত পরিষদের সভা আহ্বানকে আওয়ামী লীগের ও জনগণের বিজয়ের কথা বলিলেন না। বিজয়-দিবস উদযাপনের কথাও ঘোষণা করিলেন না। বরঞ্চ পূর্ব প্রকাশিত চার শর্তেরই পুনরাবৃত্তি করিলেন। ঐসব শর্ত পূরণ হওয়ার পরে পরিষদে যোগ দেওয়ার কথা বিবেচনা করিবেন, সে কথারও পুনরুক্তি করিলেন। সেই একই কথা : শহীদদের মৃতদেহের উপর দিয়া ২৫শে মার্চের পরিষদে যোগ দিতে না পারার কথা। আমার সমস্ত স্বপ্ন ও কল্পনা এক দমকা হাওয়ায় মিলাইয়া গেল। শেখ মুজিবের মত অসাধারণ কাণ্ডজ্ঞানী ও বাস্তববাদী জননেতা পরিষদে যাওয়া-না-যাওয়ার আকাশ-পাতাল প্রভেদটা, দুই এর রাজনৈতিক তাৎপর্যটা এবং সগ্রামের ট্যাকটিক্সের পার্থক্যটা বুঝেন নাই, এটা আমার কিছুতেই বিশ্বাস হইল না। সংগ্রামের এই সুস্পষ্ট ট্যাকটিক্যাল এডভানটেজটা শেখ মুজিবের মত অভিজ্ঞ সংগ্রামী নেতা না বুঝিয়া শত্রুপক্ষের হাতে তুলিয়া দিতেছেন, এটা আমার মত কিছুতেই মানিয়া লইল না। কাজেই মনে হইল, ডাঃ ফযলে রাবির কথাই ঠিক। তিনি বলিয়াছিলেন : শেখ মুজিবের বাড়ি-ঘেরাও করা চার-পাঁচ হাজার তরুণকে যেভাবে স্বাধীনতা স্বাধীনতা চিৎকার করিতে তিনি দেখিয়া আসিয়াছেন, তাতে শেখ সাহেব নিজের জ্ঞান-বুদ্ধিমত কাজ করিতে পারিবেন বলিয়া তাঁর বিশ্বাস হইতেছিল না। আমি তাঁর কথাটা উড়াইয়া দিয়াছিলাম। এখন বুঝিলাম, ডাঃ রাবির ধারণাই ছিল ঠিক। অসাধারণ ব্যক্তিতশালী মুজিব তাঁর ইচ্ছার বিরুদ্ধে সেদিন স্বাধীনতা ঘোষণা করেন নাই সত্য, তবে তরুণদের চাপে অন্ততঃ তাদের মন রাখিলেন। শুধুতাদের দেখাইবারউদ্দেশ্যেই পরিষদে যোগনা দিবার ব্যাপারটায় ঐরূপ বীরত্বব্যঞ্জক ব্র্যাভাডা প্রদর্শন করিলেন। স্বাধীনতা ঘোষণার দাবিদার তরুণদের খুশি করিবার জন্য শেখ মুজিব আরো দুইটা কাজ করিলেন। প্রথমতঃ উপসংহারে তিনি বলিলেন : আজিকার সংগ্রাম, স্বাধীনতার সংগ্রাম। দ্বিতীয়তঃ কিছুদিন ধরিয়া তিনি সব বক্তৃতার শেষ করিতেন এক সংগে ‘জয় বাংলা’ ‘জয় পাকিস্তান’ বলিয়া। এই দিনকার সভায় প্রথম ব্যতিক্রম করিলেন। শুধু ‘জয় বাংলা’ বলিয়া বক্তৃতা শেষ করিলেন। যাঁরা নিজেরা উক্ত সভায় উপস্থিত ছিলেন বলিয়া দাবি করেন, তাঁদের কেউ কেউ আমার এই কথার প্রতিবাদ করেন। তাঁরা বলেন, শেখ মুজিব ৭ই মার্চের সভাতেও ‘জয় বাংলা’ ‘জয় পাকিস্তান’ বলিয়া বক্তৃতা শেষ করিয়াছিলেন। আমি যখন বলি যে পরদিন আমি রেডিও-টেলিভিশনে নিজ কানে তাঁর বক্তৃতা শুনিয়াছি এবং তাতে ‘জয় পাকিস্তান’ ছিল না, তার জবাবে তাঁরা বলেন, পরদিন রেকর্ড ব্রডকাস্ট করিবার সময় ঐ কথাটা বাদ দেওয়া হইয়াছিল। যাক আমি নিজ কানে যা শুনিয়াছিলাম, তাই লিখিতেছি। বক্তৃতা শেষ করিয়াই মুজিব সভামঞ্চ ত্যাগ করিলেন। তাজুদ্দিন সাহেব মুহূর্তমাত্ৰ সময় নষ্ট না করিয়া খপ করিয়া মাইকের স্ট্যাণ্ড চাপিয়া ধরিলেন এবং বলিলেন : এইবার মওলানা তর্কবাগীশ মোনাজাত করিবেন। সভার কাজ শেষ। মওলানা সাহেব তখনি মাইকের সামনে দুই হাত তুলিয়া মোনাজাত শুরু করিলেন। সমবেত বিশ-পঁচিশ লক্ষ লোকের চল্লিশ-পঞ্চাশ লাখ হাত উঠিয়া পড়িল। মোনাজাতের সময় এবং তকবিরের সময় কথা বলিতে নাই। তাই কেউ কথা বলিলেন না। নড়িলেন না। যখন মোনাজাত শেষ হইল, তখন শেখ মুজিব চলিয়া গিয়াছেন। পট করিয়া মইকের লাইন কাটিয়া গিয়াছে। স্পষ্টতঃই বুঝা গেল, আর কেউ কিছু বলিতে না পারুক, এই জন্যই এ ব্যবস্থা করা হইয়াছিল। এতে এটা নিঃসন্দেহে বোঝা গেল যে তথাকথিত ছাত্রনেতা ও তরুণদের যবরদস্তি ও হুমকি ধমকেও সেদিন শেখ মুজিবের স্বাধীনতা ঘোষণার ইচ্ছা ছিল না। আমার বিবেচনায় এটা শেখ মুজিবের রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও দূরদর্শিতারই প্রমাণ।
