(১) সৈন্যবাহিনী ব্যারাকে ফিরাইয়া নিতে হইবে।
(২) ১লা মার্চ হইতে সৈন্যবাহিনী যে হত্যাকাণ্ড ও যুলুম করিয়াছে, তার তদন্ত করিয়া পূর্ব-পাকিস্তান সরকারের নিকট রিপোর্ট দাখিল করিতে হইবে। (বলা আবশ্যক, সামরিক কর্তৃপক্ষ ইতিপূর্বেই একটি তদন্তের নির্দেশ দিয়াছিলেন। কিন্তু সে তদন্তের রিপোর্ট সামরিক কর্তৃপক্ষের নিকট দাখিলের কথা ছিল। আওয়ামী লীগ দাবি করিয়াছে, সামরিক কর্তৃপক্ষের বদলে সিভিল গবর্নমেন্টের নিকট রিপোর্ট দাখিল করিতে হইবে।)
(৩) মার্শাল ল প্রত্যাহার করিতে হইবে।
(৪) এই মুহূর্তে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের হাতে রাষ্ট্রক্ষমতা ট্রান্সফার করিতে হইবে।
আমি শর্ত চারিটির প্রথম দুইটি সমর্থন করিলাম। পরের দুইটিতে আপত্তি করিলাম। আমি বলিলাম, এ সময়ে মার্শাল ল প্রত্যাহারের দাবি চলিতে পারে না। একটা সংবিধান (ইন্টারিম হইলেও) না করিয়া মার্শাল ল প্রত্যাহারের অর্থ ভ্যাকিউয়াম সৃষ্টি করা। তাতে ইয়াহিয়া প্রেসিডেন্ট থাকিবেন না। তাঁর-দেওয়া এল, এফ, ও, থাকিবে না। এল, এফ, ওর অধীন নির্বাচন থাকিবে না। নির্বাচন বাতিল হইলে গণপ্রতিনিধি থাকিবেন না। আর এই মুহূর্তে ক্ষমতা হস্তান্তর সঙ্গে আমি বলিলাম : ওটা তোমাদের চাহিতে হইবে না। ইয়াহিয়া ক্ষমতা হস্তান্তরের জন্য নিজেই ব্যস্ত। কারণ আমাদের মহাজন রাষ্ট্রেরা আমাদের টাকা ডিভ্যালু করিবার ঘোর চাপ দিতেছে। ডিভ্যালু না করা পর্যন্ত নূতন ঋণ দিবে না, বলিয়া দিয়াছে। ইয়াহিয়ার ইচ্ছা তিনি নিজে টাকা ডিভ্যালু না করিয়া নির্বাচিত রাজনীতিকদের সিভিলিয়ান গবর্নমেন্টের হাত দিয়া ঐ বদকাজটা করাইবেন।
নেতারা ব্যাপারটা উপলব্ধি করিলেন, মনে হইল। এখন কি করা যায়। গায়ে পড়িয়া ত শর্ত প্রত্যাহার করা যায় না। ঠিক হইল, আলোচনার সময় দরকষাকষিতে প্রথম দুইটার উপর জোর দিয়া দ্বিতীয় দুইটা স্যাক্রিফাইসের ভাণ করা হইবে। অপর পক্ষকে জিতিবার সান্ত্বনা দিতে হইবে।
৬. আমার পরামর্শ কাজে লাগিল না
শান্তিতেই রাতটা কাটাইলাম। কিন্তু পর দিন সকালে খবরের কাগ পড়িয়া আবার শান্তি হারাইলাম। ঐ চারটি শর্ত গৃহীত হইলেই আওয়ামী লীগ পরিষদে যোগ দিবে, এ কথাও বিবৃতিতে বলা হয় নাই। বলা হইয়াছে? প্রেসিডেন্ট চার শর্ত পূরণ করিলে আওয়ামী লীগ পরিষদে যোগ দিবে কি না বিবেচনা করিয়া দেখিবে। কথাটায় আরো জোর দিয়া শেখ মুজিব বলিয়াছেন : “আমি আমার দেশবাসীর মৃতদেহ পাড়াইয়া পরিষদে যোগ দিতে পারি না।”
বয়সে তরুণ হইলেও শেখ মুজিব ‘ম্যান-অব-স্ট্রং কমন সেন্স’ আমি তা জানিতাম। সগৌরবে এ কথা বলিয়াও বেড়াইতাম। সেই ‘ম্যান-অব-ইং কমন সেন্স’ এমন যুক্তি দিলেন কেমন করিয়া? আমি তাঁকে টেলিফোনে ধরিবার চেষ্টা সারাদিন ধরিয়া করিলাম। শেখ মুজিব তখন কল্পনাতীত রূপে ব্যস্ত। স্বাভাবিক কারণেইলগত্যা ঠিক করিলাম, যাঁকে পাই তাঁকেই বলিব মুজিবকে আমার সাথে ফোনে কথা বলিতে। অত ব্যস্ততার মধ্যে মুজিবকে আসিতে বলা বা তা আশা করা উচিৎ না। আমার স্বাস্থ্যের যা অবস্থা, তাতে আমার পক্ষে যাওয়াও অসম্ভব। কাজেই প্রথম চেষ্টাতেই যখন কোরবান আলী সাহেবকে পাইলাম, তাঁকেই বলিলাম আমার অভিপ্রাটা। কোরবান আলী চেষ্টা করিয়াও সফল হইলেন না, বুঝা গেল। অগত্যা আমার পুত্র মহবুব আনামকে পাঠাইলাম। আমার ছেলের যাওয়ায়, অথবা কোরবান আলী সাহেবের চেষ্টায়, অথবা দুইজনের সমবেত চেষ্টায়, অবশেষে শেখ মুজিব কথা বলিলেন। আমি সোজাসুজি আমার কথায় গেলাম। বলিলাম : পরিষদ তোমার। ন্যায়ত ও আইনত: তুমি হাউসের নেতা। ওটা আসলে তোমারই বাড়ি। নিজের বাড়ি যাইতে শর্ত কর কার সাথে। ইয়াহিয়া অনধিকার প্রবেশকারী। তাঁর সাথে আবার শর্ত কি?
আমি বোধ হয় রাগিয়া গিয়াছিলাম। মুজিব হাসিলেন। বলিলেন : এত সব হত্যাকাণ্ডের পরও আবার আমাকে পরিষদে যাইতে বলেন? চট করিয়া খবরের কাগষে প্রকাশিত ‘মৃতদেহ’ কথাটা আমার মনে পড়িল। বলিলাম : হাঁ, নিজের লোকের মৃতদেহের উপর দিয়াই তুমি পরিষদে যাইবা। কারণ ও-বাড়ি তোমার। সে বাড়িতে ডাকাত পড়িয়াছে। তোমার বাড়ির কিছু লোকজন ডাকাত্রে হাতে খুন হইয়াছে। ডাকাত তাড়াইবার জন্যই তোমার নিজের লোকজনের মৃতদেহ পাড়াইয়া বাড়িতে ঢুকিতে হইবে। ডিক্টেটর ইয়াহিয়া জনমতের চাপে আওয়ামী লীগের দাবির সামনে মাথা নত করিয়াছেন। কাজেই আগামী কালের সভায় তুমি বিজয়-উৎসব উদযাপনের নির্দেশ দিবা। শেখ মুজিব আসলে রসিক পুরুষ। আমার উপমাটা তিনি খুব উপভোগ করিলেন। বিজয়-উৎসবের কথায় খুশি হইলেন। হাসিলেন। বলিলেন : আমার আজকার বক্তৃতা শুনিবেন। রেডিওতে ব্রডকাস্ট হইবে সোজাসুজি ময়দান হইতে। আপনার উপদেশ মতই কাজ হইবে। কোনও চিন্তা করিবেন না। দোওয়া করিবেন।’ ‘লিভ ইট টু মি’, ’কোনও চিন্তা করিবেন না দোওয়া করিবেন’ কথা কয়টি মুজিব এর আগেও বহুদিন বলিয়াছেন। আত্ম-প্রত্যয়ের দৃঢ়তার সুস্পষ্ট প্রকাশ। কথা। কয়টা ওঁর মুখে শুনিলেই আমি গলিয়া যাইতাম। ও দিনও গলিলাম। মানে, আশ্বস্ত হইলাম।
৭. অশুভ ইংগিত
পূর্বনির্ধারিত সময়-মত ৭ই মার্চ সকাল সাড়ে আটটায় আমার স্ত্রীকে লইয়া আমি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে যাই; অথবা বলা যায় আমার স্ত্রীই আমাকে লইয়া হাসপাতালে যান। দুজনেরই অসুখ, দুজনেই ডাক্তারের পরীক্ষাধীন। দুজনেরই ই.সি.জি.,দুইজনেরই এক্সরে। কাজেই দুইজন প্রায় সমান। দুজনারই ডাক্তার রাবি ও ডাঃ হকের চেম্বারে যাওয়ার কথা। আমার একজন ডাক্তার বেশি। কান ও নাকের জন্য আমার ডাঃ আলী আফল খাঁর চেম্বারেও যাওয়ার কথা।
