এ সবই অতি সাম্প্রতিক ঘটনা। পাঠকদের প্রায় সকলেই নিজের চোখে দেখিয়াছেন। অনেকেই খবরের কাগযে পড়িয়াছেন। সকলেরই মনে থাকার কথা। তবু এ সবের উল্লেখ করিলাম এই জন্য যে মাত্র ন’মাস পরে ক্ষমতায় বসিয়া শাসকদল সরকারী-বেসরকারী সকল প্রকার কর্মচারীসহ গোটা দেশবাসীর এই ঐক্যের কথা বেমালুম ভুলিয়া গিয়াছিলেন। সে কথার আলোচনা করিব পরে।
৩রা মার্চ প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া আরেকটা বাজে কাজ করিলেন। তিনি বার নেতা’র এক বৈঠক ডাকিলেন। এই বার নেতার মধ্যে দুই জন পূর্ব-পাকিস্তানী, আর দশজন পশ্চিম পাকিস্তানী। পরিষদ বাইপাস করার ছিল এটা একটা ফন্দি। বার নেতার মধ্যে এক দিকে প্রেসিডেন্ট ও অপর দিকে আওয়ামী লীগের গ্রহণযোগ্য কোনও ফরমূলা নির্ধারিত হওয়া অসম্ভব ছিল, এটা সবাই জানিতেন। তবু এমন বৈঠক ডাকা হইয়াছিল দুরভিসন্ধি-বলে। কাজেই আওয়ামী-নেতা শেখ মুজিব সংগত কারণেই এটা অগ্রাহ্য করিলেন। তিনি এক প্রেস-কনফারেন্সে অহিংস অসহযোগ চালাইয়া যাওয়ার নির্দেশ দিলেন।
পূর্ব-পাকিস্তানের একচ্ছত্র প্রতিনিধি শেখ মুজিব ঐ বৈঠক গ্রাহ্য করায় পূর্ব-পাকিস্তানের অপর একমাত্র নিমন্ত্রিত নেতা নূরুল আমিন সাহেবও বৈঠকে যোগ দিতে অসম্মতি জানাইলেন।
এক-লাগা পাঁচ দিন পূর্ব-পাকিস্তানে, মানে পাকিস্তানের মেজরিটি অঞ্চলে, কেন্দ্রীয় বা প্রাদেশিক সরকারের কোন অস্তিত্ব ছিল না। সরকারী-বেসরকারী সকল প্রতিষ্ঠান নিয়ন্ত্রিত হইতেছিল আওয়ামী লীগ নেতৃত্বের নির্দেশে। কেন্দ্রীয়-প্রাদেশিক সরকারের সমস্ত অফিসাররাও আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব মানিয়া চলিতেছিলেন। সামরিক বাহিনী ক্যান্টনমেন্টের বাহিরে আসা হইতে বিরত ছিল।
একটা নীরব অহিংস বিপ্লবের মধ্য দিয়া পূর্ব-পাকিস্তানে বিপুল ভোটাধিক্যে নির্বাচিত আওয়ামী লীগের ডিফ্যাক্টো শাসন কায়েম হইয়া গেল। বিদেশীরাও স্বীকার করিলেন, পূর্ব-পাকিস্তানীরা একাত্মভাবে, টু-এ-ম্যান, আওয়ামী লীগের সমর্থক।
৪. ডিক্টেটরের নতি স্বীকার
৬ই মার্চ সন্ধ্যা ছয়টার রেডিওতে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া নিজ গলায় ঘোষণা করিলেন, তিনি ২৫শে মার্চ ঢাকায় পরিষদের বৈঠক আহ্বান করিলেন। প্রেসিডেন্টের সে ঘোষণায়ও রাষ্ট্রপতির মর্যাদা-উপযোগী শরাফত ছিল না। আওয়ামী লীগের জনপ্রিয়তায় তাঁর মনের ক্ষোভ ভাষায় ফাটিয়া পড়িতেছিল। কিন্তু ওসবকে আমি কোন গুরুত্ব দিলাম না। পরিষদের বৈঠক ডাকা হইয়াছে, এটাই আমার কাছে ছিল গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার। আওয়ামী লীগের জয়। জনমতের সামনে ডিক্টেটরের নতি স্বীকার।
প্রেসিডেন্টের এই ঘোষণায় সবাই নিন্তি ও খুশি হইয়াছিলেন। দুই-একজন করিয়া অনেকেই আমার বৈঠকখানায় সমবেত হইলেন। সকলের মুখেই স্বস্তির ভাব। যা একটা সংকট কাটিয়া গেল। রাত সাড়ে আটটার দিকে আমি মুজিবের নিকট হইতে টেলিফোন পাইলাম। প্রথমে তাজুদ্দিন সাহেব ও পরে শেখ মুজিবের সাথে কথা হইল। আওয়ামী লীগের কর্তব্য সম্বন্ধে আমার মত জানাইলাম। তাঁদের মত ছিল, বিনাশর্তে তাঁরা ২৫শে মার্চের পরিষদে যোগ দিবেন না। আমার মত ছিল, শর্ত তাঁরা যাই দেন, ২৫শে মার্চের বৈঠকে তাঁরা অবশ্যই যোগ দিবেন। আমার যুক্তিটা ছিল এইরূপ : ২৫শে মার্চের বৈঠকে আওয়ামী লীগ হাযির হইয়া নিজস্ব মেজরিটির জোরে আওয়ামী লীগ পার্টির একজন স্পিকার, পশ্চিম পাকিস্তান হইতে দওলতানা ও ওয়ালি খাঁর সাথে পরামর্শ করিয়া সিনিয়র ডিপুটি স্পিকার ও পূর্ব-পাকিস্তান হইতে (তার মানে আওয়ামী লীগ) জুনিয়র ডিপুটি স্পিকার নির্বাচন করিবেন। এইভাবে স্পিকার, দুইজন ডিপুটি স্পিকার ও প্যানেল-অব-চেয়ারমেন নির্বাচন শেষ করিয়া মেজরিটি পার্টির নেতা ও লিডার-অব-হাউস হিসাবে শেখ সাহেব স্পিকারকে অনুরোধ করিবেন–এক সপ্তাহের জন্য হাউস মুলতবি করিতে। উদ্দেশ্য ও উভয় অঞ্চলের নেতাদের মধ্যে শাসনতান্ত্রিক সংবিধান সম্বন্ধে একটা সমঝোতার আলোচনা। ইতিপূর্বে ৩রা মার্চ প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া যে বার নেতার বৈঠক ডাকিয়াছিলেন, সম্ভব হইলে সেই নেতৃ-বৈঠকই লিডার-অব-দি হাউস হিসাবে শেখ মুজিবই ডাকিবেন। উচিৎ বিবেচিত হইলে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়াকেও সেই বৈঠকে দাওয়াত করা হইবে। বিশ্ববাসী জানিবে, নিরংকুশ মেজরিটি হইয়াও শেখ মুজিব পশ্চিম-পাকিস্তানের নেতাদের সাথে সমঝোতায় আসিবার কতই না আন্তরিক চেষ্টা চালাইতেছেন। আওয়ামী লীগ ছয় দফা-ভিত্তিক সংবিধান রচনায় ধমতঃ হলফ-বদ্ধ। ওটা ছাড়া কিছুতেই রাযী হইতে পারেন না। স্পষ্টতঃই ঐ এক সপ্তাহের মুলতবিতে কাজ হইবে na। এক সপ্তাহ পরে পরিষদের বৈঠক হইবে। সেখানেও লিডার-অব-দিহাউস শেখ মুজিব আরও এক সপ্তাহের জন্য হাউস মুলতবি করিতে স্পিকারকে অনুরোধ করিবেন। এইভাবে যতদিন ইচ্ছা পর-পর হাউস মুলতবি করিয়া যাইবার ক্ষমতা ও অধিকার শেখ মুজিবের হাতে চলিয়া আসিবে। প্রেসিডেন্টের মর্যর উপর হাউস আর নির্ভরশীল থাকিবে না।
৫. আমার পরামর্শ
আমার পরামর্শটা শেখ মুজিব ও তাজুদ্দিন সাহেবের পসন্দ হইল বলিয়া জানাইলেন। কিন্তু একটা অসুবিধা হইয়া গিয়াছে। তাঁরা পরিষদে যোগ দিবার পূর্বশর্ত রূপে চারিটি দাবি করিয়া ইতিমধ্যেই সংবাদপত্রে বিবৃতি দিয়া ফেলিয়াছেন, বলিলেন। সে বিবৃতি সাকুলেট হইয়া বিদেশে ও পশ্চিম পাকিস্তানে চলিয়া গিয়া থাকিবে। অগত্যা আর কি করা যায়? তখন আমি জানিতে চাহিলাম, শর্ত চারিটি কি কি? তাঁরা জানাইলেন, শর্ত চারিটি এই :
