১. ভূট্টা-ইয়াহিয়া ষড়যন্ত্র
২৭শে জানুয়ারি জনাব ভুট্টো সদলবলে ঢাকা আসিলেন। আসিবার আগে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার সাথে ভুট্টো সাহেবের কয়েক দফা বৈঠক হইল। ভুট্টা সাহেব তিন-চার দিন ঢাকা অবস্থান করিলেন। আওয়ামী নেতাদের সাথে অনেক দেন-দরবার করিলেন। আওয়ামী লীগের ছয় দফার বিরুদ্ধে নানারূপ যুক্তি-কুযুক্তি দিলেন। কিন্তু তারা কি চান, কোন্ বিষয়ে ছয় দফার পরিবর্তন চান, এক কথায় তারা কি ধরনের সংবিধান চান, ঘুণাক্ষরেও তা খুলিয়া বলিলেন না। সবশেষে আবার দেখা হইবে’ বলিয়া বিদায় হইলেন। আওয়ামী লীগের সাথে ঘোরর মতভেদ হইয়াছে, আলোচনা ভাংগিয়া গিয়াছে, আকারে-ইংগিতেও তুন্ত্রেী সাহেব বা তাঁর সংগীদের কেউ এমন কোন কথা বলিলেন না। কিন্তু আমি ভুট্টা সাহেবের নীরব বিদায়ের মধ্যে একটা অশুভ ইংগিতের আভাস পাইলাম। এটা ছিল জানুয়ারির শেষ দিন। আমি ঐ রাত্রেই একটি বিবৃতি মুসাবিদা করিলাম। পরদিন খবরের কাগযে পাঠাইয়া সম্পাদকদেরে নিজে অনুরোধ করিলাম। নিউ এজেন্টদেরেও তেমনি বলিলাম। পরদিন ‘অবরভার’ ও মনিং-নিউয়’ ‘ডুয়েল সেন্টার হেডিং দিয়া আমার বিবৃতিটা পুরা ছাপিলেন। বাংলা দৈনিকগুলিও তাই করিলেন। এজেন্সিরা পশ্চিম-পাকিস্তানে কোড় করায় ‘ডন’, ‘পাকিস্তান টাইমস’ ইত্যাদি কাগফও যথেষ্ট স্থান দিলেন। আমি সে বিবৃতিতে শেখ মুজিব ও ভুট্টোকে আপোসের আবেদন জানাইলাম। ভুট্টা সাহেব করাচি ফিরিয়াই পিণ্ডি গেলেন। পিডিতে কয়েকদিন কাটাইয়া পেশওয়ার গেলেন। সেখানকার এক ক্লাবে বক্তৃতা করিতে গিয়া ১৫ই ফেব্রুয়ারি ঘোষণা করিলেন, তিনি ঢাকায় আহত পরিষদ বৈঠক বয়কট করিবেন। বয়কটের হুমকি দিয়াই তিনি ক্ষান্ত হইলেন না। অন্যান্য মেম্বরদেরেও তিনি শাসাইলেন। তাঁর বয়কট উপেক্ষা করিয়া যেসব পশ্চিম পাকিস্তানী মেম্বর ঢাকা যাইবার চেষ্টা করিবেন, তাঁদের ঠ্যাং ভাংগিয়া অথবা কান্না কাটিয়া ফেলিবেন। ঢাকাকে তিনি কসাইখানা বলিলেন। মিঃ ভুট্টোর এইসব বেআইনী ও অপরাধমূলক উক্তির বিরুদ্ধে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া বা সরকারী কেউ একটি কথাও বলিলেন না। মিঃ ভুট্টোর এই হমকি সত্ত্বেও পিপলস পার্টি ও কাইউম লীগের মেয়রগণ ছাড়া আর সবাই ঢাকার টিকিট বুক করিয়া ফেলিলেন। কয়েকজন মেম্বর ঢাকা পৌঁছিয়াও গেলেন। শোনা যায়, খোদ-পিপলস পার্টির কয়েকজন মেম্বরও টিকিট বুক করিয়াছিলেন। মনে হইতেছিল, ভুট্রোর হুমকি সত্ত্বেও ঢাকা সেশন সফল হইবার সম্ভাবনা উজ্জ্বল হইয়া উঠিয়াছে।
২. পরিষদের বৈঠক বাতিল
এমন সময় প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া ২৮শে ফেব্রুয়ারি করাচি আসিলেন। ভুট্টো সাহেবের বাড়িতে খানাপিনা করিলেন। ১লা মার্চ তারিখে করাচি রেডিও হইতে প্রেসিডেন্টের নিজের গলার ভাষণে নয়, পঠিত এক বিবৃতিতে বলা হইল : পরিষদের ৩রা মার্চের বৈঠক স্থগিত। এই ঘোষণায় আওয়ামী লীগ ও তার নেতা শেখ মুজিবকে এই সর্বপ্রথম কঠোর ভাষায় নিন্দা করা হইল।
সন্ধ্যা ছয়টার রেডিওতে প্রেসিডেন্টের এই ঘোষণায় ঢাকাবাসী, সারা পূর্ব পাকিস্তানবাসী, স্তম্ভিত, বিক্ষুব্ধ ও ক্রুদ্ধ হইয়া উঠিল। কিন্তু আওয়ামী লীগ নেতা শেখ মুজিব অসীম ধৈর্যের পরিচয় দিয়া উপযুক্ত যোগ্য নেতার কাজ করিলেন। মেজরিটি পার্টির নেতা এবং ভাবী প্রধানমন্ত্রীকে জিগ্গাসা না করিয়া অনির্দিষ্ট কালের জন্য পরিষদ স্থগিত করিয়া প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া অনিয়মতান্ত্রিক অপরাধ করিয়াছিলেন। শেখ মুজিবের সময়োপযোগী অসীম ধৈর্যে ও স্থৈর্যে আমি মুগ্ধ ও গর্বিত হইয়াছিলাম। আমি অসুস্থ না থাকিলে নিজে তাঁর বাসায় যাইতাম। কিন্তু রাত্রি সাড়ে আটটার দিকে তিনি নিজে আমাকে ফোন করিয়া যা বলিলেন, তাতেই আমি পূর্বোক্ত-মত মুগ্ধ ও গর্বিত হইলাম। তিনি বলিলেন, তিনি সাত দিনব্যাপী সাধারণ হরতাল ও অসহযোগ আন্দোলন করা ঠিক করিয়াছেন। আমি সানন্দে আমার ঐকমত্য জানাইলাম। তবে অসহযোগের সাথে অহিংস কথাটা যোগ করিতে অনুরোধ করিলাম। তিনি হাসিয়া জবাব দিলেন, সেটা করাই হইয়াছে। আমি তাঁকে ‘কংগ্রেচুলেট’ করিলাম। তিনি জবাবে বলিলেন : ‘শুধু দোওয়া করিবেন।‘ আমি সত্য-সত্যই দোওয়া করিলাম। করিতে থাকিলাম বলাই ঠিক। কারণ ওটাই ছিল আমার জন্য সহজ।
৩. অহিংস অসহযোগের অভূতপূর্ব দৃষ্টান্ত
পরদিন বিদেশীরা দেখিয়া ত বিস্মিত হইলেনই, আমরাও কম বিস্মিত হইলাম। অভূতপূর্ব, অপূর্ব, অভাবনীয় সামগ্রিক সাড়া। যেন যাদু-বলে রাস্তা-ঘাট, হাট বাজার, অফিস-আদালত, হাইকোর্ট-সেক্রেটারিয়েট অচল, নিথর, নিস্তব্ধ। শুধু রাজধানী ঢাকা শহরে নয়। পরে জানা গেল, সারা পূর্ব-পাকিস্তানে ঐ একই অবস্থা। খবরের কাগযে সারাদেশের শহর-বন্দরের রিপোর্ট পড়িলাম। আর কল্পনায় পঞ্চাশ বছর আগের ১৯২০-২১ সালের খেলাফত-কংগ্রেসের অসহযোগ-হরতালের চিত্র দেখিতে লাগিলাম। মহাত্মা গান্ধী ও আলী ভাই এর ডাক সেদিন বাতাসের আগে দেশব্যাপী ছড়াইয়া পড়িত। তাঁদের আহ্বানে দেশবাসী একযোগে যে হরতাল অসহযোগ পালন করিত, তা দেখিয়া বিস্মিত হইতাম। মনে করিতাম, এমনটা আর হয় নাই, হইবে না। কিন্তু ১৯৭১ সালের ২রা মার্চের ঘটনা আমার বিশ্বয় সকল সীমা ছাড়াইয়া গেল। কোথাও কোনও অনুরোধ-উপরোধ ক্যানভাস্-পিকেটিং এর দরকার হইল না। স্বতঃপ্রণোদিত হইয়া সবাই যেন এ কাজ করি। এটা যেন সকলেরই কাজ। ১লা মার্চ প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া পরিষদ মূলতবি করিবেন, এটা পূর্ব-পাকিস্তানের সামরিক কর্তৃপক্ষ আগে হইতেই জানিতেন। ১লা মার্চ সকাল না হইতেই ঢাকা শহরে সৈন্য মোতায়েন হইল। কাজেই প্রেসিডেন্টের ঘোষণাটা জনসাধারণের বিস্ময় উদ্রেক করিলেও শাসকদের নিশ্চয়ই বিস্ময় উদ্রেক করে নাই। বরঞ্চ আওয়ামী-নেতারা যে হরতাল ঘোষণা করেন, সেটা ব্যর্থ করিবার জন্য তাঁরা বিশেষ তৎপরতা অবলম্বন করেন। রাস্তায়-রাস্তায় টহল দিয়া জনগণের মনে ভীতি সৃষ্টির সকল প্রকার পন্থা গ্রহণ করেন। ঢাকা শহরে ও মফস্বলের অনেক জায়গায় গুলি-গোলা চলে। বেশ কয়েকজন হতাহত হয়। সরকারী কর্মচারীদেরে অফিস-আদালতে হাযির করার জন্য, দোকানপাট খোলা রাখিবার জন্য, সকল প্রকার চেষ্টা-তদ্ধির করা হয়। কিন্তু কিছুতেই কিছু হয় না।
