কালক্রমে এটা তাঁদের সাধারণ মনোভাবে রূপান্তরিত হইয়া গিয়াছিল। পাকিস্তানের সৃষ্টির গোড়াতে পশ্চিমা ভাইদের মনে যাই থাকুক, অবস্থা ও পরিবেশে দীর্ঘদিনের অভ্যাসে যেটা তাঁদের কাছে অত্যন্ত সহজ ও স্বাভাবিক দাবির রূপ পাইয়াছিল তা এই যে, পশ্চিম-পাকিস্তানটাই পাকিস্তান। পূর্ব-পাকিস্তানটা সেই পাকিস্তানের অংশ মাত্র। একটা অপরটার অংশ হইলে অপরটাও একটার অংশ, এটা তেমন ব্যাপার নয়। তাই এর উল্টাটাও সত্য নয়। অর্থাৎ পূর্ব-পাকিস্তানই পাকিস্তান, আর পশ্চিম-পাকিস্তানটা সেই পাকিস্তানের অংশ মাত্র, কোনও পশ্চিমা তাই-ই এ ধরনের চিন্তায় অভ্যস্ত ছিলেন না। আলাস্কাকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অংশ মনে
করিয়া মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকেই আলাস্কার অংশ মনে করিলে যেমনটি হয়, এখানেও তেমনটাই হইত। শুধু আয়তন নয়, রাষ্ট্রক্ষমতার অধিষ্ঠানও এই মনোভাব সৃষ্টির ও বৃদ্ধির গোড়ায় কার্যকরী ছিল। পশ্চিম-পাকিস্তানে বসিয়া সার্ভে-অব-পাকিস্তান পাকিস্তানের যে সরকারী ম্যাপ প্রকাশ করিতেন, সেটা আসলে পশ্চিম-পাকিস্তানেরই ম্যাপ। সেই ম্যাপের এক কোণে ইনসেট হিসাবে পূর্ব-পাকিস্তান, জুনাগড় ও মানবাদারের একটি করিয়া ক্ষুদ্রাকৃতি ম্যাপ থাকিত। এটাই পশ্চিমা ভাইদের মনের ম্যাপ। এ মনোতাবের বিচারে, পশ্চিম-পাকিস্তানের আয়তন ছোট হইলেও বাধিত না। আকারে ছোট হইয়াও ইংল্যাণ্ড বৃহদাকারের আমেরিকাকে নিজের উপনিবেশ মনে করিত।
৮. পরিষদের বৈঠক আহ্বান
এমন পরিবেশে পূর্ব-পাকিস্তানী মেজরিটি সারা পাকিস্তান শাসন করিবে, এ সম্ভাবনা পশ্চিমা ভাইদের মনে দুঃসহ হইয়া উঠিল। নির্বাচনের পর দুই মাস অতিবাহিত হইয়া গেল। তবু প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া পরিষদের বৈঠক ডাকিতে বিলম্ব করিতে লাগিলেন। অবশেষে মেজরিটি পার্টির লিডার শেখ মুজিব ১৫ই ফেব্রুয়ারি পরিষদের বৈঠক ডাকিতে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়াকে জোর তাকিদ দিলেন। ইয়াহিয়া পরিষদের মেজরিটি লিডারের কথা অগ্রাহ্য করিয়া মাইনরিটি লিডার মিঃ ভুট্টোর পরামর্শ-মত ১৯৭১ সালের ৩রা মার্চ পরিষদের বৈঠকদিলেন। বৈঠকটার স্থান দেওয়া হইল ঢাকায়। আমরা অনেকেই প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার উদার গণতান্ত্রিক মনোভাবের তারিফ করিয়া বিবৃতি দিলাম, প্রবন্ধ লিখিলাম।
কিন্তু পরবর্তী ঘটনাসমূহ হইতে নিঃসন্দেহে প্রমাণিত হইল যে, এটাও ছিল প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার সুদূরপ্রসারী ষড়যন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অংগ। ষড়যন্ত্রটার ধারাবাহিকতা এইরূপ ও প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া ১৩ই জানুয়ারি হইতে ১৫ই জানুয়ারি ঢাকায় অবস্থান করিয়া শেখ মুজিবের সাথে আলোচনা করিলেন। হাসিমুখে ঢাকা ত্যাগ করিলেন। শেখ মুজিবকে পাকিস্তানের ভাবী প্রধানমন্ত্রী বলিলেন। ছয় দফায় তাঁর খুব বেশি আপত্তি নাই বলিয়া গেলেন। কিন্তু ছয় দফা বা ভাবী শাসনতন্ত্র সম্বন্ধে সোজাসুজি কোনও স্পষ্ট কথা বলিলেন না। কিন্তু ঘুরাইয়া-পেচাইয়া সর্বপ্রথম ছয় দফাঁকে পাকিস্তানের ঐক্য-বিরোধী এমনকি তাঁর নিজের রচিত এল.এফ.ও. বিব্রাধী এই ধরনের নূতন কথা বলিলেন। তিনি ঢাকা ত্যাগের প্রাক্কালে খুব নরম সুরে বলিলেন : শাসনতান্ত্রিক সংবিধান সম্বন্ধে পাকিস্তানের দুই অঞ্চলের ঐক্যমত হওয়া দরকার।
৯. মুজিবের ভুল
এই সময় পশ্চিম-পাকিস্তানের কতিপয় নেতা শেখ মুজিবকে একবার পশ্চিম পাকিস্তান সফরের দাওয়াত দিলেন। তাঁদের যুক্তি ছিল, বিরোধী প্রচারে ছয় দফা সম্পর্কে পশ্চিম-পাকিস্তানের জনগণের মধ্যে ভুল বুঝাবুঝি হইয়াছে, শেখ মুজিবের এই সফরে তার অবসান হইবে। সহকর্মীদের পরামর্শে মুজিবর রহমান এই সফরে অসম্মতি বা অক্ষমতা জানাইলেন। তাঁর যুক্তি ছিল, তিনি আওয়ামী পার্লামেন্টারি পার্টির কাজে এই সময়ে এতই ব্যস্ত থাকিবেন যে, তাঁর পক্ষে পশ্চিম-পাকিস্তান সফর সম্ভব হইবে না। প্রকাশ্যে এই যুক্তি দেওয়া হইল বটে, কিন্তু আমি জানিতে পারিলাম, সহকর্মীরা মুজিবকে এইরূপ বুঝাইয়াছেন যে, এই সফরের দাওয়াত আসলে শেখ মুজিবের জীবননাশের পশ্চিম-পাকিস্তানী ষড়যন্ত্র মাত্র। আমি একথা বিশ্বাস করিলাম না। কারণ আমি শেখকে বেপরোয়া সাহসী যুবক বলিয়াই জানিতাম। কিন্তু কারণ যাই হোক, মুজিবের এই সিদ্ধান্তে আমি দুঃখিত হইলাম। আমার তখনও বিশ্বাস ছিল, আজও আছে, মুজিব ঐ সফরে গেলে তার সুফল ফলিত, মুজিবের অসাধারণ বাগ্নিতায় পশ্চিম-পাকিস্তানের জনগণ তাঁর সমর্থক হইয়া উঠিত। পশ্চিম পাকিস্তানের পুঁজিপতি ও কায়েমী স্বার্থীরা বিদ্বেষপ্রসূত মিথ্যা প্রচারের দ্বারা ছয় দফা ও মুজিবের বিরুদ্ধে জনগণের মনে যে ভ্রান্ত ও ভয়ংকর চিত্র আঁকিয়াছে, মুজিব অতি সহজেই তা দূর করিতে পারিতেন। আমি অতীতে অনেক বার নিজ চোখে দেখিয়াছি, শেখ মুজিব তাঁর ভাংগা-ভাংগা অশুদ্ধ উর্দুতে বক্তৃতা করিয়া পশ্চিম পাকিস্তানী বড়-বড় জনসভা জয় করিয়াছিলেন এবারও তার অন্যথা হইত না।
কাজেই এই দাওয়াত প্রত্যাখ্যান করা মুজিবের উচিৎ হয় নাই, এটা আমি তখনও মনে করিতাম, আজও মনে করি। মুজিব ঐ সময়ে পশ্চিম-পাকিস্তান সফরে গেলে পরবর্তী মর্মান্তিক, হৃদয়বিদারক ঘটনাসমূহ ঘটিত না। কারণ, তাতে শেখ মুজিবের ইমেজ পশ্চিম-পাকিস্তানের জনগণের নযরে ইয়াহিয়া-ভূট্টোর ইমেজ ছাড়াইয়া যাইত।
৩২.০৩ পৃথক পথে যাত্রা শুরু
পৃথক পথে যাত্রা শুরু
উপাধ্যায় তিন
