নির্বাচনের পরে শেখ মুজিব যা করিলেন সেটা আরও প্রশংসার যোগ্য। নির্বাচনের ইতিহাসে একটা অনুকণযোগ্য ঐতিহাসিক ঘটনা। নির্বাচনের পরে ৩রা জানুয়ারি, ১৯৭১, তিনি সুহরাওয়ার্দী ময়দানে বিশ লাখ লোকের বিরাট জনসমাবেশে মেম্বারদেরে দিয়া হলফ করাইলেন-নিজে হলফ করিলেনঃ ‘ছয় দফা ওয়াদা খেলাফ করিব না।‘
এই হলফনামা ছিল একটি মূল্যবান দলিল। হলফ গ্রহণ ছিল একটি সুদূরপ্রসারী তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা। সেজন্য এ সম্বন্ধে একটু বিস্তারিত আলোচনা করিতেছি। ঘটনাটি নানা কারণে স্মরণীয়।
১৯৭১ সালের ৩রা জানুয়ারি বেলা ২টার সময় ঢাকা রেসকোর্স ময়দানে পরে সুহরাওয়ার্দী উদ্যান) জনসমক্ষে আওয়ামী মেম্বররা হলফ উঠাইবেন, এটা আগেই ঘোষণা করা হইয়াছিল। ফলে সে সভায় বিপুল জনসমাগম হইয়াছিল। আওয়ামী লীগ টিকিটে নির্বাচিত কেন্দ্রীয় মেম্বর-সংখ্যা তখন ১৫১ এবং প্রাদেশিক মেম্বর সংখ্যা ২৬৭। কারণ ঘূর্ণীঝড়-বিধ্বস্ত উপকূল অঞ্চলের নির্বাচন তখনও হইতে পারে নাই। ফলে মোট ৪১৮ জন আওয়ামী সদস্যের সকলেই এই শপথ অনুষ্ঠানে যোগ দিয়াছিলেন।
হলফনামা একটি ছাপা দলিল। আল্লার নামে এই হলফনামার শুরু হইয়াছিল। আরবী ‘বিসমিল্লাহিররাহমানির রাহিম’-এর হুবহু বাংলা তর্জমা করিয়া লেখা হইয়াছিল ও পরম করুণাময় আল্লাহর নামে হলফ করিয়া আমি অংগীকার করিতেছি যে আমাদের নির্বাচনী ওয়াদা ছয় দফা অনুসারে শাসনতান্ত্রিক সংবিধান রচনা করিব।
এ কাজে পশ্চিম পাকিস্তানী নেতাদের সহযোগিতা কামনা করিতেছি ইত্যাদি। হলফনামায় ব্যাংক, ইনশিওরেন্স ও পাট ব্যবসায় জাতীয়করণের অংগীকারসহ আরও কিছু প্রতিজ্ঞা করিয়া দুইটি জয়ধ্বনিতে হলামার উপসংহার করা হইয়াছিল। এই দুইটি মুদ্রিত জয়ধ্বনি ছিল : ‘জয় বাংলা’, ‘জয় পাকিস্তান’।
মুদ্রিত হলফনামার এক এক কপি সমবেত ও কাভারবন্দী মেম্বরদের প্রত্যেকের হাতে ছিল। পার্টি নেতা শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর বুলন্দ আওয়াযে হলকে এক একটি বাক্যাংশ পড়িয়া গিয়াছেন, আর সমবেত কাতারবন্দী মেম্বররা সমস্বরে নেতার কথা আবৃত্তি করিয়াছেন। এতে গোটা অনুষ্ঠানের পরিবেশটা একটা ধর্মীয় গাম্ভীর্যে পরিপূর্ণ হইয়া উঠিয়াছিল। সমবেত প্রায় বিশ লাখের বিশাল জনতা পরম শ্রদ্ধায় অবনত মস্তকে তাদের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের এই হলফের প্রত্যেকটি কথা নীরবে শুনিয়াছে। একটি ‘টু’ শব্দও হয় নাই। অনুষ্ঠান শেষে জনতা বিপুল হর্ষধ্বনি করিয়া তাদের সমর্থন ও উল্লাস জানাইয়াছে।
ধর্মীয় গাম্ভীর্য্যের হলকে আরও রাজনৈতিক গুরুত্ব দিবার জন্য সমবেত জনতার কাছে শেখ মুজিব আরও বলিলেন : ছয় দফা নির্বাচনী ওয়াদা আপনাদের নিকট আমাদের দেওয়া আমাদের পবিত্র ওয়াদা। এ ওয়াদা যদি আমরা খেলাফ করি, তবে আপনারা আমাদের ক্ষমা করিবেন না। আরও বেশি জোর দিবার জন্য শেখ মুজিব বলিলেন। আমি নিজেও যদি এই ওয়াদা খেলাফ করি, তবে আপনারা নিজ হাতে আমাকে জীবন্ত মাটিতে পুঁতিয়া ফেলিবেন। নিজেদের নির্বাচনী ওয়াদার নির্ভুলতা
ও কার্যকারিতা সম্বন্ধে দৃঢ় প্রত্যয় না থাকিলে এমন নিরংকুশ সুস্পষ্ট চরম অনঢ় ওয়াদা কেউ করিতে পারেন না। ফলতঃ এই ঘটনার পরে শেখ মুজিবের পক্ষে কোন কারণে, কোন যুক্তিতেই ছয়-দফা-বিরোধী কাজ করা সম্ভব ছিল না।
বস্তুতঃ আমার জ্ঞান-বিশ্বাস মতে শেখ মুজিব ইচ্ছা করিয়াই এটা করিয়াছিলেন। তিনি ভাবিয়া-চিন্তিয়াই এভাবে নির্বাচনী ওয়াদা খেলাফের সব রাস্তা ও ছিদ্র বন্ধ করিয়াছিলেন। পাঠকগণ,তখনকার অবস্থাটা একবার বিবেচনা করুন। একেই ত ৪১৮ জন মেম্বরের এত বড় পার্টি। তাতে আবার সুস্পষ্ট কারণেই এদের মধ্যে সবাই পরীক্ষিত, অনুগত, পুরাতন ও নিযোগ্য নন। বোধগম্য কারণেই অনেক অজানা অচেনা প্রার্থীকে নমিনেশন দিতে হইয়াছে। এঁদের মধ্যে কেউ সুযোগ-সুবিধা পাইলে দলত্যাগ করিবেন না, এমনটা আশা করা বুদ্ধিমানের কাজ হইত না। আরও একটা কারণ ছিল। আওয়ামী লীগের প্রতিপক্ষ পশ্চিমারা শুধু রাষ্ট্রক্ষমতার অধিকারীই ছিলেন না, বিপুল ধন-বিত্ত-প্রতিপত্তির অধিকারী ছিলেন। পার্লামেন্টারি রাজনীতিতে তাঁদের করণীয় কাজও খুব বেশি ছিল না। রাষ্ট্রক্ষমতা, অর্থ-বিত্ত ও প্রতিপত্তির সাহায্যে আওয়ামী লীগের অন্ততঃ গণপরিষদে নির্বাচিত নবাগতদের মধ্যে এক দলকে হাত করিয়া আওয়ামী লীগের, মানে পূর্ব পাকিস্তানের, মেজরিটিকে নিষ্ক্রিয় করা মোটই কল্পনাতীত ছিল না। তাই শেখ মুজিব বিশ লাখ লোকের জনসমাবেশে মেম্বরদেরে দিয়া ঐ হল রাইয়াছিলেন। নিজেও হল নিয়াছিলেন। এতে এক সংগে দুইটা লাভ হইয়াছিল। এক আওয়ামী মেম্বারদেরে হুশিয়ার করা হইয়াছিল। দুই, পশ্চিমা নেতা ও ধনকুবেরদেরেও হুশিয়ার করা হইয়াছিল। আওয়ামী মেম্বরদের মধ্যে যদি কারো কোনও উচ্চাভিলাষ থাকিয়াও থাকিত, তবে ঐ বিশাল জনতার দরবারে হল নেওয়ার ফলে সে উচ্চাকাংখা সেই মুহূর্তে পলাইয়াছিল।
আর পশ্চিমা ধনকুবের নেতাদের কারও মনে যদি আওয়ামী দল ভাংগিবার পরিকল্পনাবিয়া থাকিত, তবে ঐ ঘটনার পরে তাঁরাও এই দিককার আশা ত্যাগ করিতে বাধ্য হইয়াছিলেন।
৭. পশ্চিমা নেতাদের সংকীর্ণতা
কাজেই শেখ মুজিবের এই দূরদর্শিতায় আমি মুগ্ধ হইয়াছিলাম। কিন্তু দুই মাস না যাইতেই আমার সে মোহ কাটিয়া গিয়াছিল। তখন আমার মনে হইয়াছিল শেখ মুজিব যদি আওয়ামী মেম্বরদের আনুগত্যকে অমন দুর্ভেদ্য না করিতেন, তবেই বোধ হয় মন্দের ভাল হইত। আওয়ামী লীগের মেম্বরদের আনুগত্যে অর্থাঘাত অসম্ভব হইয়া পড়িয়াছিল বলিয়াই প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়াসহ পশ্চিমা নেতারা ভোটারদের অস্ত্রাঘাত করিতে বাধ্য হইয়াছিলেন। কেন করিয়াছিলেন? কারণ পশ্চিমা নেতারা পাকিস্তানের ঐক্য, পাকিস্তান-সৃষ্টির ইতিহাস, লাহোর প্রস্তাব, পাকিস্তানের স্বপ্নদ্রষ্টা কবি ইকবালের কথা, সবই ভুলিয়া গিয়াছিলেন। অথচ এই তিনটি বস্তুর কথা পশ্চিমা শাসক ও নেতারা চব্বিশ ঘন্টা উচ্চারণ করিতেন। পাকিস্তানের ঐক্যে যদি তাঁরা বিন্দুমাত্র বিশ্বাস করিতেন, তবে শেখ মুজিবের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের মেজরিটিশাসন তাঁরা মানিয়া লইতেন। তাঁরা ভাবিতেন গণতন্ত্রে মেজরিটিরই শাসন। আওয়ামী নেতৃত্বকে তাঁরা যদি গোটা পাকিস্তানের নেতা নাও মানিতেন, তবু তাঁরা ভাবিতে পারিতেন। তেইশ বছর পশ্চিমারা পাকিস্তান শাসন করিলেন, করুক না পূরবীরা পাঁচবছর। তা তাঁরা পারেন নাই। পারেন নাই এইজন্য যে, পূর্ব-পাকিস্তানকে তাঁরা পাকিস্তানের সমান অংশীদার মনে করিতেন না। এ অঞ্চলটাকে তাঁরা তাঁদের উপনিবেশ মনে করিতেন।
