ফলে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়াসহ পশ্চিমা নেতারা অমন দিঘিদিক জ্ঞানশূন্য হইয়া পড়িয়াছিলেন। তাঁদের পরবর্তী সব কাজই এই জ্ঞানশূন্যতার প্রমাণ। মুখে গণতন্ত্রের কথা বলি। অথচ নির্বাচনে যাঁরা জিতিলেন, তাঁদের হাতে ক্ষমতা দিব না, দিলে পাকিস্তান বিপন্ন হইবে, এমন মনোভাব শুধু অগণতান্ত্রিক নয় বুদ্ধি বিভ্রান্তিরও লক্ষণ। এমন বিভ্রান্ত লোকের নিকট হইতে সুস্থ বুদ্ধি আশা করা যাইতে পারে না।
কিন্তু আমার ক্ষুদ্র বিবেচনায়, ভুল শুধু প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া ও পশ্চিমা নেতারাই করেন নাই। তুল আমাদের নেতা শেখ মুজিবও করিয়াছিলেন। সেসব কথাই পরে, যথাস্থানে আলোচনা করিব।
কিন্তু ব্যক্তিগতভাবে আমি এটা বুঝিতে পারি নাই। মানে বুঝিতে সময় লাগিয়াছিল। বরঞ্চ আমি প্রথমে ঠিক উল্টাটাই বুঝিয়াছিলাম। পশ্চিমা নেতারা তিন সাবজেক্টের সেন্টার আগেই মানিয়া লইয়াছিলেন। সেজন্য আমার বিভিন্ন লেখায়ও আনন্দ প্রকাশ করিয়াছিলাম। পশ্চিমা নেতাদের দেখাদেখি প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়াও গণতন্ত্রের কাছে আত্মসমর্পণ করিয়াছেন, এটাও যেন আমার কাছে সুস্পষ্ট হইয়া গিয়াছিল। পাকিস্তানের ইতিহায়ে শুধু পাকিস্তান কেন, পাক-ভারত উপমহাদেশে, এমন কি গোটা আফ্রো-এশিয়ায়, এই সর্বপ্রথম নির্বাচন প্রতিযোগিতায় শরিক সব পার্টির নেতাদের রেডিও-টেলিভিশনে নিজ নিজ পার্টি-প্রোগ্রাম সম্বন্ধে দেশবাসীর উদ্দেশ্যে ভাষণ দিবার সুযোগ দেওয়া হইল। এটা করিলেন স্বয়ং প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া। আফ্রো-এশিয়ান গণতন্ত্রের জীবনে একটা নুতন ইতিহাস সৃষ্টি করিলেন প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া। দেশবাসী খুশী না হইয়া পারে? আমি ত উৎসাহে ফাটিয়া পড়িবার মত হইলাম। এবার গণতন্ত্র না আসিয়া যায় না। শুধু গণতন্ত্রই পাকিস্তান টিকাইয়া রাখিতে পারে। আর কিছুতে নয়। সেই গণতন্ত্র নিশ্চিত হইল। অতএব পাকিস্তানের জীবনের মস্তবড় ফাঁড়া কাটিয়া গেল।
৫. আমার হিসাবে ভুল
কত বড় মূর্খ আমি। জমাট-বাঁধা এই মূঢ়তার প্রথম পরত কাটিল নির্বাচনের পরে। পশ্চিমা ভাইয়েরা নির্বাচনের আগে ছয় দফার আপত্তি করিলেন না। নির্বাচনের পরেই তাঁদের যত আপত্তি। তারা শুধু বেজার হইলেন না। ছয় দফা না বদলাইলে, মানে, নির্বাচনী ওয়াদা লোফ না করিলে আওয়ামী লীগের সাথে পশ্চিমারা সহযোগিতা করিতেই রাযী নহেন। সব দলের নির্বাচন প্রার্থীরাই এতকাল বলিয়া আসিয়াছেন, এই নির্বাচনের আগেও বলিয়াছেন, নির্বাচনী ওয়াদা খেলাফ করা সব পার্টির স্বভাব। আওয়ামী লীগও নির্বাচনের পরে তাই করিবে। নির্বাচনে হারিয়া পূরবী অ-আওয়ামী নেতারা চুপ মারিয়া গেলেন। কিন্তু পশ্চিমা নেতারা এবং প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া বলিতে লাগিলেন, ছয়-দফা-ভিত্তিক সংবিধান তাঁরা মানিবেন না। কারণ তাতে পাকিস্তানের ঐক্য-সংহতি নষ্ট হইবে। এ সবই নির্বাচনের পরের কথা। নূতন কথা।
এ কথার রাজনৈতিক অর্থ ও ন্যায়নৈতিক তাৎপর্য কি, তার বিচার করা যাক। প্রথমতঃ আওয়ামী লীগ তার নির্বাচনী ওয়াদা ছয় দফা রদ-বদল করিলে কি দাঁড়ায়? সকলেরই স্মরণ আছে, বহুদিন ধরিয়া রাজনৈতিক নেতাদের বিরুদ্ধে ভোটারদের সাধারণ ও কম অভিযোগ ছিল এই যে, নির্বাচনের আগে নির্বাচন-প্রার্থী নেতারা যা বলেন, নির্বাচনের পরে তাঁরা তা ভুলিয়া যান। এক কথায় তাঁরা নির্বাচনী ওয়াদা খেলাফ করেন। ভোটারদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা ও তঞ্চকতা করেন।
অভিযোগটা পুরাতন ও সত্য। মোটামুটি সব পার্টির সব নেতাদের সম্বন্ধেই একথা বলা চলে। প্রমাণ অনেক। দু’চারটার কথা বলা যাক। ১৯৩৭ সালের নির্বাচনে কংগ্রেস পার্টি ৩৫ সালের ভারত শাসন ‘ভিতর হইতে ভাংগিবার (টু-রেক ফ্রম উইদ ইন) ওয়াদায় ভোট নিয়া মন্ত্রিত্ব গ্রহণ করিয়াছিলেন। কৃষক-প্রজা-পার্টি জমিদারি উচ্ছেদের ওয়াদায় ভোট নিয়া ফ্লাউড কমিশন বসাইয়াছিলেন। মুসলিম লীগ ‘৪৬ সালের নির্বাচনে ৪০ সালের লাহোর প্রস্তাবের উপর ভোট দিয়া নির্বাচনে জিতিবার পরে গুরুতর ওয়াদা খেলাফ করিলেন লাহোর প্রস্তাবে বর্ণিত পূর্ব-পশ্চিমে দুই মুসলিম রাষ্ট্র গঠনের বদলে পশ্চিম-ভিত্তিক এক পাকিস্তান বানাইলেন। ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্ট একুশ দফার ওয়াদায় নির্বাচিত হইয়া সব ‘দফার’ রফা করিলেন। মোট কথা, কি অবিভক্ত ভারতে, কি পাকিস্তানে, নির্বাচনের ইতিহাস এক ঢালা নির্বাচনী ওয়াদা খেলাফের ইতিহাস। শেখ মুজিবসহ আমরা সংশ্লিষ্ট নেতাদের অনুসারীরা সব সময় না হোক, অধিকাংশ সময় নেতাদের এই সব ওয়াদা ভংগের প্রতিবাদ করিয়াছি। নেতারা ‘পরিবর্তিত পরিস্থিতি’, ‘দেশের বৃহত্তর কল্যাণ’, ইত্যাদি ভাল-ভাল কথার যুক্তিতে নিজেদের কাজ সমর্থন করিয়াছেন। আমরা নেতাদের যুক্তি না মানিলেও কাজে-কর্মে তাঁদের নেতৃত্ব মানিয়া চলিয়াছি। কিন্তু মনের দিক হইতে আমরা কখনও সন্তুষ্ট ছিলাম না।
৬. মুজিবের দূরদর্শিতা
নেতাদের এই ওয়াদা খেলাফের ঐতিহ্যের প্রেক্ষিতে যখন ১৯৭০ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নূতন নেতা শেখ মুজিব নির্বাচনী ওয়াদায় দৃঢ়তা দেখাইলেন, তখন ব্যক্তিগতভাবে আমি তাঁর কাজে প্রীত ও গর্বিত হইলাম। শেখ মুজিব দুই দিক হইতে এই দৃঢ়তা দেখাইলেন। প্রথমতঃ নির্বাচনের আগে তিনি ছয় দফাঁকে সাধারণ ওয়াদা না বলিয়া রেফারেন্ডাম বলিলেন। তাঁর কথার তাৎপর্য ছিল এই যে, হয় তাঁর পক্ষে স্থ বলিবেন, নয় ‘না’ বলিবেন। তার মানে, ভোটাররা হয় তাঁর পক্ষে সব ভোট দিবেন, নয়ত এক ভোটও দিবেন না। পূর্ব-পাকিস্তানের ভোটাররা সবই বলিলেন। শেখ মুজিব প্রায় সব আসন পাইলেন। শুধু নির্বাচনে নয়, তিনি রেফারেণ্ডামেও জিতিলেন। শাসনতন্ত্র রচনার ব্যাপারে তিনি পূর্ব-পাকিস্তানের একক মুখপাত্র হইলেন।
