৩. পশ্চিমা নেতাদের বোধোদয়
এটাই বুঝিয়াছিলেন পশ্চিমা নেতারা হক সাহেব ও সুহরাওয়ার্দী সাহেবের মৃত্যুর পাঁচ-সাত বছর পরে। তাই প্যারিটির বদলে ‘ওয়ানম্যান ওয়ান ভোট পুনঃ প্রবর্তন করিয়া দুই পাকিস্তানকে এক পাকিস্তান, এক দেশ, এক রা করিবার এবং পূর্ব-পাকিস্তানকে দুই শরিকের এক শরিকের বদলে ছয় শরিকের এক শরিক করার জন্য ইয়াহিয়া এই ব্যবস্থা অবলম্বন করিয়াছিলেন। প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া পশ্চিমের ওয়ান ইউনিট ভাংগিয়া আগের মত শুধু চারটা প্রদেশ করিয়াই ক্ষান্ত হয় নাই। ট্রাইবাল এরিয়া নামে প্রকারান্তরে একটি পঞ্চম প্রদেশ স্থাপন করিয়াছিলেন। এতে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়াব দুইটা মতলব ছিল। এক, পূর্ব-পাকিস্তান দুই শরিকের একজন হইতে ছয় শরিকের একজন হইল। এটা শাসনতান্ত্রিক সংবিধানে নিশ্চিত হইয়া গেল। দুই, পূর্ব-পাকিস্তানের জনসংখ্যা বেশি হইলেও এখানে কোন অবস্থাতেই এক পার্টি মেজরিটি হইতে পারিবে না। ইয়াহিয়া যখন এ, এফ, ও, করেন, তখন পূর্ব পাকিস্তানে পার্টির সংখ্যা ছিল স্পষ্টতঃই তেরটা। ‘৭০ সালের নির্বাচনের সিম্বল বিতরণের সময় দেখা গেল পার্টি-সংখ্যা আঠার।
তেরই হোক আর আঠারই তোক প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়াসহ পশ্চিমা নেতারা আশা করিয়াছিলেন যে : (১) সব দল না হইলেও বেশিরভাগ দলই কিছু কিছু আসন পাইবে, (২) যতই জনপ্রিয় হোক আওয়ামী লীগ ন্যাশনাল এসেমব্লির পূর্ব-পাকিস্তানের ভাগের ১৬৯টি আসনের মধ্যে একশ’র বেশি আসন পাইবে না, (৩) বাকি আসনগুলোর অধিকারী জমাতে ইসলামী, নিযামে ইসলাম ও দুই-তিনটা মুসলিম লীগের সকলেই ঈং সেন্টারের শাসন রচনার ব্যাপারে পশ্চিমা পার্টিগুলির সাথে থাকিবেন। এমনকি সরকার গঠনের ব্যাপারে তাঁরা আওয়ামী লীগের চেয়ে পশ্চিমা দলগুলোর সাথেই কোয়েলিশন করিবেন। তাঁদের হিসাবটা স্পষ্টতঃই ছিল এইরূপ : কাউন্সিল মুসলিম লীগ, কনভেনশন মুসলিম লীগের তিন শাখা, নিযামে ইসলাম, জমাতে ইসলামী ও জমিয়াতুল ওলামায়ে ইসলামের দুই শাখা মূলতঃ, এবং শাসনতান্ত্রিক সংবিধানের ব্যাপারে একই ইসলাম-পছন্দ’ পার্টি। এঁদের যে পার্টিই যত আসন দখল করুন, সবই শেষ পর্যন্ত পশ্চিমা নেতৃত্বের স্ট্রং সেন্টারের সমর্থক দলের পুষ্টিসাধন করিবেন। ফলে তিন শ’ আসনের মধ্যে পূর্ব-পাকিস্তান হইতে একশ’ আসনও যদি আওয়ামী লীগ পায়, তবে বাকী দুইশ’ আসনের অধিকারী’ ইসলাম পছন্দ দলসমূহই কেন্দ্রীয় আইন পরিষদে মেজরিটি হইবে এতে আর কোনও সন্দেহ থাকিতেছে না। আওয়ামী লীগের পূর্ব-পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদে মেজরিটি পাইবার সম্ভাবনা ছিল খুবই বেশি। কিন্তু প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার নেতৃত্বে পশ্চিমা নেতারা এটার থনেও আওয়ামী লীগকে বঞ্চিত করার ষড়যন্ত্র করিয়াছিলেন।
সংবাদপত্র পাঠকদের সকলের স্মরণ আছে, কেন্দ্রীয় পরিষদ কর্তৃক শাসনতান্ত্রিক সংবিধান রচনার পরে প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচন হইবে, এটাই ছিল প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার প্রথম ঘোষণা। তারপর কি মনে করিয়া তিনি সে ঘোষণা পাল্টাইয়া কেন্দ্রীয় পরিষদের অব্যবহিত পরেই প্রাদেশিক নির্বাচনের ব্যবস্থা করেন। একই নির্বাচনী খরচায় দুইটা নির্বাচন হইয়া যাইবে, এটাই ছিল দৃশ্যতঃ এই পরিবর্তনের উদ্দেশ্য। বাহ্য উদ্দেশ্যটা এতই গ্রহণযোগ্য ছিল যে, কোনও কোনও আওয়ামী নেতাও এই ফাঁদে পা দিয়াছিলেন। তাঁরাও এই পরিবর্তিত ব্যবস্থাকে অভিনন্দিত করিয়াছিলেন।
৪. ইয়াহিয়ার মতলব
কিন্তু ইয়াহিয়ার আসল উদ্দেশ্য অত শুভ ছিল না। সংবিধানটা তাঁদের ইচ্ছামত ইং সেন্টারের দলিল হইবে, এ বিষয়ে তাঁরা নিশ্চিত ছিলেন। এই সংবিধানের পরে প্রাদেশিক নির্বাচন হইলে পূর্ব-পাকিস্তানে আওয়ামী লীগের জোর দূর্বার হইয়া উঠিবে। কারণ স্ট্রং সেন্টারের শাসনতান্ত্রিক সংবিধানের প্রতিক্রিয়া পূর্ব-পাকিস্তানে বিরূপ ও, আওয়ামী লীগের নিরংকুশ বিজয়েঅনুকূল হইয়া পড়িবে। সংবিধানের আগে প্রাদেশিক নির্বাচন হইয়া গেলে আওয়ামী লীগ এই সুবিধা পাইবে না। ইহাই ছিল প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার পেটের কথা।
এইভাবে আওয়ামী লীগের মিজরিটি পাইবার বিরুদ্ধে সকল প্রকারের ফুল-প্রুফ ব্যবস্থা করিয়াই নির্বাচন দেওয়া হইয়াছিল।
কিন্তু নির্বাচনের ফল হইল উল্টা। কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক পরিষদের প্রায় সব পূর্ব পাকিস্তানী আসন আওয়ামী লীগ জয় করিল। ১৯৭০ সালের ৭ই ডিসেম্বর কেন্দ্রীয় পরিষদের ও ১৭ই ডিসেম্বর প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচন হইল। ইতিমধ্যে মাত্র এক মাস আগে ১২ই নবেম্বর পূর্ব-পাকিস্তানের সমুদ্র উপকূলবর্তী কয়েকটি জেলায় ইতিহাসের নিষ্ঠুরতম ঝড়-তুফান ও সাইক্লোন-টর্ণেডো হইয়াছিল। তার ফলে অসংখ্য জীবন নাশ ও বর্ণনাতীত ক্ষয়ক্ষতি হইয়াছিল। সেজন্য কেন্দ্রীয় পরিষদের ১টি ও প্রাদেশিক পরিষদের ১৭টি আসনের নির্বাচন হইতে পারিল না। ঐসব এলাকার নির্বাচন পরবর্তী ১৭ই জানুয়ারি হইয়াছিল। ফলে কেন্দ্রীয় পরিষদের ১৬২টি আসনের মধ্যে দুইটি বাদে আর ১৬০টি এবং প্রাদেশিক পরিষদের ৩০০টির মধ্যে ২৮০টি আসনই আওয়ামী লীগ দখল করিল। পরবর্তী ফেব্রুয়ারি মাসে নির্বাচিত মেম্বরদের ভোটে কেন্দ্রীয় পরিষদের ৭টি ও প্রাদেশিক পরিষদের ১০টি মহিলা আসনের সব কয়টি আওয়ামী লীগ পাইল। একমাত্র পিডিপি.নেতা নূরুল আমীন সাহেব ছাড়া দুইটি কভেনশন মুসলিম লীগ, কাউন্সিল মুসলিম লীগ, জামাতে ইসলামী, নেমে ইসলাম ইত্যাদি কেন্দ্র-ঘেষা সবগুলো দল নির্বাচনে নিশ্চিহ্ন হইয়া গেল। এইভাবে কেন্দ্রীয় পরিষদের মোট ৩১৩টি আসনের মধ্যে আওয়ামী লীগ ১৬৭ আসন পাইয়া একক মেজরিটি পার্টি হইল। ইয়াহিয়াসহ সব পশ্চিমা নেতাদের মাথায় আসমান ভাংগিয়া পড়িল। সুফলের আশা যত উচ্চ হয়, বিফলের পতনটা হয় তেমনি গভীর খাদে। এটা শুধু পশ্চিমাদের নির্বাচনে হারার ব্যাপার ছিল না। তাঁদের জন্য ছিল এটা ভেস্টেড ইন্টারেস্টের বিপদ-সংকেত। তাই তাঁরা স্ততি, ক্রুদ্ধ ও দিশাহারা হইয়া পড়িলেন। অথচ মার্শাল ল’র ছাতার তলে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হইয়াছিল বলিয়া এই নির্বাচনে নকল ভোট ইত্যাদি দুর্নীতির আশ্রয় নেওয়া হইয়াছিল, এ কথাও বলা গেল না।
