১৯৫৫ সালের ঘটনা যাঁদের মনে আছে, তাঁরা সবাই জানেন যে, সুহরাওয়ার্দী যখন প্যারিটির কথা লইয়া পূর্ব-বাংলায় আসেন, তখন হক সাহেব ও মওলানা ভাসানী উভয়েই তার তীব্র প্রতিবাদ করেন। হক সাহেব খবরের কাগযে বিবৃতি দেন এবং পল্টন ময়দানে জনসভা করেন। মওলানা ভাসানী আওয়ামী লীগের ওয়ার্কিং কমিটির বর্ধিত মিটিংয়ে তাঁর তীব্র বিরোধিতার ব্যাখ্যা করেন। তারপর শহীদ সাহেবের সংগে দীর্ঘ আলাপ-আলোচনার পর হক সাহেব ও তাসানী সাহেব প্যারিটি মানিয়া নেন। হক সাহেব শুধু একা মানিয়া নেন নাই, তাঁর কে, এস, পি, পার্টিকে দিয়া মানাইয়াছিলেন। ঐ সময়কার কে, এস, পি, পার্টিতে অনেক বিদ্বান, অভিজ্ঞ ও দূরদশী রাজনৈতিক নেতা ছিলেন, তাও সকলের জানা আছে। তাঁরাও প্যারিটি মানিয়া নেন। বস্তুতঃ প্যারিটিভিত্তিক ’৫৬ সালের শাসনতন্ত্র তাঁরাই রচনা করেন।
এতে এটাই প্রমাণিত হয় যে, পূর্ব-বাংলার তৎকালীন নেতারা চোখ বুজিয়া বিনা বিচারে প্যারিটি মানিয়া নেন নাই। বরঞ্চ আগে তুমুল প্রতিবাদ করিয়া নিজেদের মধ্যে দীর্ঘ আলোচনার পরে মানিয়া লওয়ায় এটাই বুঝা যায় যে, সুহরাওয়ার্দী সাহেব প্যারিটির পক্ষে জোরদার যুক্তি দিয়াছিলেন এবং হক সাহেব ও ভাসানী সাহেব এবং তাঁদের পার্টিদ্বয় বিশেষ বিচার-বিবেচনা করিয়াই তা গ্রহণ করিয়াছিলেন। হক সাহেব ও তাঁর দলের বিশেষ দায়িত্ব এই যে, তাঁরা পরে চৌধুরী মোহাম্মদ আলী মন্ত্রিসভার মেম্বর হিসাবে প্যারিটিকে শাসনতন্ত্রের ভিত্তি করিয়াছিলেন। এ দায়িত্ব নিশ্চয়ই তাঁরা দূরদর্শী রাজনৈতিক প্রজ্ঞা লইয়াই পালন করিয়াছিলেন।
পক্ষান্তরে আমরা আওয়ামী লীগাররা শাসনতন্ত্রের বিরোধিতা করিয়াছিলাম এবং শেষ পর্যন্ত ওয়াকআউটও করিয়াছিলাম। কিন্তু সে ওয়াক-আউট প্রতিনিধিত্বে। প্যারিটির প্রতিবাদে ছিল না। অন্যান্য ব্যাপারেও প্যারিটি না করায়, যুক্ত-নির্বাচন প্রথা সংবিধানের অন্তর্ভুক্ত না করায়, এবং পূর্ব-পাকিস্তানকে পূর্ণ আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন না। দেওয়ায়, এক কথায়, পাঁচ-দফা মারি চুক্তির খেলাফে সংবিধান রচিত হওয়ার প্রতিবাদেই আমরা ওয়াক-আউট করিয়াছিলাম এবং শাসনতন্ত্রিক বিলে দস্তখত দিতে অস্বীকার করিয়াছিলাম।
এইভাবে শান রচিত হওয়ার পর বছর না ঘুরিতেই আমাদের নেতা সেই সংবিধানের অধীনেই মন্ত্রিত্ব গ্রহণ করিলেন এবং সকলকে বিস্মিত করিয়া বলিলেন : পূর্ব-পাকিস্তানের শতকরা ৯৮ ভাগ অটনমি হাসিল হইয়া গিয়াছে। সকল দলের পূর্ব-পাকিস্তানীদের মত আমরা তাঁর অনুচরেরাও তাঁকে ‘গাযী গাযী করিয়া ধরিয়াছিলাম। তিনি দৃঢ় প্রত্যয়ের সাথে স্বীয় উক্তির যে ব্যাখ্যা দিয়াছিলেন, তাতে আমাদের অনেকেরই চোখ খুলিয়াছিল। তাঁর রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও দূরদর্শিতা আমাদেরে বিশিত-পুলকিত করিয়াছিল। সে ব্যাখ্যাটির সারমর্ম ও উপসংহার তাঁর ভাষায় ছিল এই : ৪৬ সালে দিল্লী প্রস্তাব পেশ করিয়া আমি লাহোর প্রস্তাব ‘বিট্রে করিয়াছি, এটাই ছিল তোমাদের ক্ষোভ। প্যারিটি ও ওয়ানইউনিটে আজ পাকিস্তান লাহোর প্রস্তাবের কাঠামোতে পুনঃ প্রতিষ্ঠিত হইল। এখন তোমাদের ক্ষোভ দূর হওয়া উচিৎ। আমাদের হইয়াছিলও তাই। তিনি বুঝাইয়াছিলেন, লাহোর প্রস্তাবে ভারতের দুই কোণে দুইটি স্বাধীন স্বতন্ত্র পাকিস্তান হওয়ার কথা। দিল্লী প্রস্তাবে ঐ দুইকে এক করা হইয়াছিল। এই প্রস্তাবটি পেশ করেন সুহরাওয়ার্দী সাহেব নিজে। এই প্রস্তাবে দুইয়ের জায়গায় এক পাকিস্তান হইয়াছিল বটে, লাহোর প্রস্তাবের আর সবটুকুই অপরিবর্তিত ছিল। সে প্রস্তাবে পূর্ব ও পশ্চিমের দুইটি ভূখণ্ডকে দুইটি অঞ্চল বা রিজিওন করা হইয়াছিল। দুই রিজিওনে দুইটি স্বাধীন ফেডারেশন না হইয়া দুই রিজিওন মিলিয়া একটি মাত্র ফেডারেশন হওয়ায় রিজিওন দুইটি স্বতঃই অটমাস ও সভারেন ইউনিট হইয়া গিয়াছিল। এটাই পরবর্তীকালে অগ্রাহ্য করিয়া পাকিস্তানকে মামুলিকভাবে নামমাত্র ফেডারেশন ত করা হইলই, তার উপর পূর্ব-বাংলাকে পাকিস্তানের পাঁচটি প্রদেশ ও অর্ধডজন দেশীয় রাজ্যের ভিড়ের মধ্যে মাত্র একটি প্রদেশ গণ্য করা হইল। এই অবস্থার পরিবর্তন ঘটে প্যারিটি ও ওয়ান ইউনিটে। এই দিক হইতে প্যারিটি ও ওয়ান ইউনিটে লাহোর প্রস্তাবের পুনঃ প্রতিষ্ঠা হয়।
কিন্তু তাই বলিয়া এটাকে আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসনের শতকরা ১৮ বলা যায় কেমন করিয়া? সেটাও শহীদ সাহেব বুঝাইয়াছিলেন। পরবর্তীকালে তার প্রমাণও দিয়াছিলেন। মারি চুক্তির প্যারিটির মধ্যে প্রতিনিধিত্বের প্যারিটি ছাড়া আরও দুইটি কথা ছিল? এক, সর্ববিষয়ে সামগ্রিক প্যারিটি, দুই, যুক্ত-নির্বাচন। ‘৫৬ সালের শাসনতন্ত্রে শুধু প্রতিনিধিত্বের প্যারিটিটাই ছিল। বাকী দুইটি ছিল না। হক সাহেব ও তাঁর পার্টির সবাই যুক্ত নির্বাচনের সমর্থক হইয়াও ‘৫৬ সালের শাসনতন্ত্র উহা ঢুকাইতে পারেন নাই। কারণ কোয়ালিশনের অপর শরিক মুসলিম লীগাররা পৃথক নির্বাচনকে ঈমানের অংগ ও পাকিস্তানের ভিত্তি মনে করিতেন। কিন্তু পরবর্তীকালে সুহরাওয়ার্দী প্রধানমন্ত্রী হইয়া পশ্চিম-পাকিস্তানের সেই পৃথক নির্বাচন ওয়ালাদেরই যুক্ত-নির্বাচন গ্রহণ করাইয়াছিলেন। এই কাজের ভিতর দিয়া সুরাওয়ার্দীর প্রজ্ঞা ও নেতৃত্ব প্রখর ঔজ্জ্বল্যে ঝলমল করিয়া উঠিয়াছিল। আর কিছুদিন গণতান্ত্রিক পরিবেশ থাকিলে পশ্চিমা ভাইদেরে দিয়া তিনি প্যারিটির বাকী শর্ত সামগ্রিক প্যারিটিও গ্রহণ কাইতে পারিবেন, এ বিশ্বাস তাঁর তখনও ছিল, পরেও সে বিশ্বাস ভাংগে নাই। আমি আজও বিশ্বাস করি, এ বিশ্বাস তাঁর ভিত্তিহীন ছিল না।
