কাজেই এটা যে শুধু মৌখিক উপদেশেই সীমাবদ্ধ, তা নয়। অনেক সময় হাতে কলমে শারীরিক-মানসিক পরিশ্রমও করিতে হয়। আমার আপত্তি ত নাই, বরঞ্চ পরম উৎসাহেই এটা করিয়া থাকি। বক্তৃতা-বিবৃতি, মেনিফেস্টো ইত্যাদি রচনা করার দায়িত্ব এই বুড়া মানুষটাকে দেওয়া অনেক তরুণই নিষ্ঠুরতা মনে করিয়াছেন। কিন্তু এই বুড়ার উৎসাহ দেখিয়া হয়ত তাঁরা অবাকও হইয়াছেন। শুধু ওসব লিখিয়া দেওয়াই নয়, ওগুলো যাতে নির্ভুল রূপে ছাপা হয়, তার জন্য আমি নিজে প্রুফ দেখিবার জন্য যিদ করিয়াছি। যে লেখাটা আমার যত বেশি পছন্দ হইয়াছে, সেটা তত বেশি মনোযোগের সহিত প্রুফ দেখিয়াছি। আমার এই অভ্যাসের দরুন, অনেক কিছুর জন্যই নাহক আমাকে নিন্দা-প্রশংসা পাইতে হইয়াছে। একাধিক দৃষ্টান্তের মধ্যে আওয়ামী লীগের ছয় দফার নাম করা যায়। অনেকের, এমনকি খোদ আওয়ামী লীগারদেরও অনেকের, বিশ্বাস, ছয় দফা আমিই রচনা করিয়াছি। যুক্তফ্রন্টের একুশ দফাও আমিই রচনা করিয়াছিলাম। এই সুপরিচিত তথ্য হইতেই সকলে অতি সহজেই ছয় দফাও আমার রচনার কথাটা বিশ্বাস করিতে পারিয়াছেন। আসল সত্য তা নয়। আমি ছয় দফা রচনা করি নাই। ছয় দফার ব্যাখ্যায় বাংলা-ইংরাজী যে দুইটি পুস্তিকা আমাদের ‘বাঁচার দাবি’ ও ‘আওয়ার রাইট টু লিভ’ প্রকাশিত ও বহুল প্রচারিত হইয়াছে, এই দুইটি অবশ্যই আমি লিখিয়াছি এবং বরাবরের মত নির্ভুল ছাপা হওয়ার গ্যারান্টি স্বরূপ আমি নিজেই তাদের প্রুফও দেখিয়া দিয়াছি। মুজিবের ভালর জন্যই একথাটা গোপন রাখা স্থির হইয়াছিল। সে গোপনতার হুশিয়ারি হিসাবে প্রফ নেওয়া আনার দায়িত্ব পড়িয়াছিল তাজউদ্দিনের উপর। মানিক মিয়া, মুজিব, তাজউদ্দিন ও আমি এই চারজন ছাড়া এই গুপ্ত কথাটা আর কেউ জানিতেন না। অথচ অল্প দিনেই কথাটা জানাজানি হইয়া গেল। মুজিব তখন জেলে। আমি ভাবিলাম, মুজিবের কোনও বিরোধী পক্ষ তাঁর দাম কমাইবার অসাধু উদ্দেশ্যে এই প্রচারণা চালাইয়াছে। কাজেই আমি খুব জোরে কথাটার প্রতিবাদ করিতে থাকিলাম। পরে শেখ মুজিবের সহকর্মী মরহুম আবদুস সালাম খাঁ ও যহিরুদ্দিন সাহেবানের মুখে যখন শুনিলাম, স্বয়ং মুজিবই তাঁদের কাছে একথা বলিয়াছেন, তখন আমি নিশ্চিন্ত ও আশ্বস্ত হইলাম।
মোট কথা রাজনীতিক ‘হরিঠাকুর’ হইয়াও আমি কায়িক পরিশ্রম হইতে রেহাই পাই নাই। ধামরাইর হরিঠাকুর আমার মত পরিশ্রম নিশ্চয়ই করিতেন না। কিন্তু আনন্দ-ও গর্ব-বোধ নিশ্চয়ই করিতেন। দুনিয়ার সব দেশের সকল যুগের হরিঠাকুরদের বোধ হয় এটাই পুরস্কার এবং এ পুরস্কারের দামও কম নয়।
৩২.০২ নয়া যমানার পদধ্বনি
নয়া যমানার পদধ্বনি
উপাধ্যায় দুই
১. আওয়ামী লীগের বিপুল জয়
এই বইয়ের গত সংস্করণের শেষ পাতায় লিখিয়াছিলাম গণতন্ত্রের চাবিকাঠি এখন আর প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার হাতে নাই। এটা এখন নেতাদের, তথা নির্বাচিত পরিষদের, হাতে। কথা কয়টা লিখিয়াছিলাম ১৯৭০ সালের নির্বাচনের মুখে। পরে সত্যসত্যই সে নির্বাচন হইয়াছিল ঐ সালের ৭ই ডিসেম্বর। পাকিস্তানের উভয় অঞ্চলেই এক দিনে। সে নির্বাচনে আওয়ামী লীগ পূর্ব-পাকিস্তানের ১৬৯টি আসনের দুটি বাদে সব কয়টি, মানে ১৬৭টি দখল করিয়াছিল। ঘূর্ণিঝড়ের দরুন উপকূলের নয়টি নির্বাচনী এলাকার নির্বাচন এক মাস পরে হইয়াছিল। তার সব কয়টিও আওয়ামী লীগই দখল করিয়াছিল বলিয়া সে কথা আলাদা করিয়া বলিলাম না। বস্তুতঃ নির্বাচনের ফলাফল ও পরিণামের দিক হইতে তা নিতান্তই অবান্তর। পশ্চিমাঞ্চলের নির্বাচনের ফলাফল ঠিক তেমন না হইলেও প্রায় কাছাকাছি। সেখানকার জাতীয় পরিষদ সদস্যের ১৪৪টির মধ্যে ৮৪টি আসন মিঃ ভুট্রোর পিপলস্ পার্টি দখল করিয়াছিল। ফলে পাকিস্তানের দুই অঞ্চলে দুই পার্টি একক মেজরিটি লাভ করিল। কোনটিই অপর অঞ্চলে একটিও আসন লাভ না করায় দুইটিই আঞ্চলিক পার্টি হইয়া গেল। পাকিস্তানের দুইটি অঞ্চল যে বস্তুতঃ দুইটির পৃথক স্বতন্ত্র দেশ, দুইটির রাজনৈতিক চিন্তায়, অর্থনৈতিক স্বার্থে, সুতরাং নেতৃত্বে, যে কোন ঐক্য বা সাদৃশ্য নাই, একথা পশ্চিমা নেতারা বা শাসকগোষ্ঠী কোনওদিন মানেন নাই। ১৯৭০ সালের এই নির্বাচনে পশ্চিমা নেতাদের দাবি মিথ্যা ও পূরবী নেতাদের দাবি সত্য, সুস্পষ্ট ও নিঃসন্দেহরূপে তা প্রমাণিত হইল। পাকিস্তান পার্লামেন্টের জন্য যতদিন মেম্বর সংখ্যার প্যারিটি ছিল, ততদিন ঐ ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক সত্য পাকিস্তানের অস্তিত্বের জন্য বিপদজ্জনক ছিল না। কিন্তু জেনারেল ইয়াহিয়া প্যারিটির স্থলে জনসংখ্যা-ভিত্তিক আসনের বিধান করায় এই বিপদ অবশ্যম্ভাবী ও আসন্ন হইয়া গিয়াছিল।
২. প্যারিটির জাতীয় তাৎপর্য
পাঠকগণের স্মরণ আছে ‘পুন’ শীর্ষক আগের অধ্যায়ে আমি জেনারেল ইয়াহিয়ার এ কাজের বিস্তারিত সমালোচনা করিয়াছিলাম। আমি বলিয়াছিলাম, পূর্ব পাকিস্তানের কোন জনপ্রিয় নেতা বা পার্টিই প্যারিটি বাতিলের দাবি করেন নাই। প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া একরূপ নিজ দায়িত্বেই প্যারিটি ভাংগিয়া ‘ওয়ানম্যান ওয়ানভোট’ নীতির ভিত্তিতে এল, এফ, ও, জারি করিলেন। দৃশ্যতঃ তিনি পূর্ব-পাকিস্তানীদের উপর সুবিচার করিবার মতলবেই এটা করিয়াছিলেন। গোড়াতে যে প্যারিটির উপর পশ্চিমা নেতারা এত জোর দিয়াছিলেন, যে প্যারিটি না হইলে পশ্চিমারা কোনও সংবিধান রচিত হইতেই দিবেন না বলিয়াছিলেন, সেই পশ্চিমা নেতারাই হঠাৎ পূর্ব পাকিস্তানীদের প্রতি সুবিচার করিবার জন্য এতটা ব্যস্ত হইয়া উঠিয়াছিলেন কেন? পশ্চিমা নেতাদের বেশির ভাগ, অন্ততঃ প্রভাবশালী অংশের বেশির ভাগ, রাযী না হইলে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া প্যারিটি ভাংগিয়া জনসংখ্যা ভিত্তিক প্রতিনিধিত্বের ফরমূলা পুনঃ প্রবর্তন করিতেন না, এটা নিশ্চয় করিয়া বলা যায়। দৃশ্যতঃ পূর্ব পাকিস্তানের উপর এই সুবিচারটা তাঁরা স্বেচ্ছায় ও অযাচিতভাবে কেন করিলেন, সকলের মনে এ প্রশ্ন জাগা খুবই স্বাভাবিক। আমার ক্ষুদ্র বিবেচনায় পশ্চিমা নেতারা বেশ কিছুদিন দেখিয়া-শুনিয়া এটা উপলব্ধি করিয়াছিলেন যে, দুই অঞ্চলের মধ্যে প্রতিনিধিত্বের প্যারিটি দাবি করিয়া এবং পূর্ব পাকিস্তানী নেতৃবৃন্দের নিকট হইতে সে দাবি আদায় করিয়া, নিজের ফাঁদে তাঁরা নিজেরাই পড়িয়াছিলেন। প্রতিনিধিত্বের প্যারিটির প্রতিদানে আওয়ামী লীগের সার্বিক প্যারিটি দাবি করায়, যুক্ত-নির্বাচন চালু করায় এবং সুহরাওয়ার্দী সাহেবের শতকরা ৯৮ ভাগ অটনমি পাওয়ার উল্লাসে পশ্চিমা নেতারা ধীরে ধীরে প্যারিটির রাজনৈতিক তাৎপর্য বুঝিতে সমর্থ হইয়াছেন।
