গত এক যুগ ধরিয়া আমি এই ‘হরিঠাকুরের’ কঠোর ও শ্রমসাধ্য দায়িত্ব পালন করিয়া আসিতেছি। রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক মতবাদ আমার সকলেরই জানা। রাজনীতিতে আমি সেকিউলার ডেমোক্র্যাট, অর্থনীতিতে আমি সমাজবাদী। এসব বিষয়ে আমি বইপুস্তক ও বহু প্রবন্ধাদি লিখিয়াছি। সকল দলের রাজনৈতিক নেতা কর্মীরাই তা জানেন। সক্রিয় রাজনীতি না করিলেও আমি আদর্শবাদ ও কর্মপন্থার দিক হইতে আওয়ামী লীগের সমর্থক, এটা জানিয়াও নন-আওয়ামী লীগাররা আমার পরামর্শ নিতে আসেন। আমি ধর্মভিত্তিক রাজনীতির ঘোর বিরোধী জানিয়াও মুসলিম লীগ, জমাতে ইসলামী ও নিযামে ইসলামের নেতারাও আমার উপদেশ পরামর্শ চাহেন। উপদেশ দিবার আগে আমার সেকিউলার মতবাদের কথা, তাঁদের মতবাদে আমার কঠোর বিরোধিতার কথা, স্মরণ করাইয়া দিলেও তাঁরা আমার উপদেশের জন্য যিদ করেন। তারা বলেন এবং দৃশ্যতঃই বিশ্বাসও করেন যে, তাঁদের মতবাদের দিক হইতে আমি ঠিক পরামর্শই দিব। দেইও আমি। এ ব্যাপারে আমি উকিলের মতই আচরণ করি। উকিল যেমন আসামী-ফরিয়াদী উভয় পক্ষকেই তাদের স্বার্থ মোতাবেক নিরপেক্ষ উপদেশ দিতে পারেন, উপদেশ-প্রার্থীদের বিশ্বাস, রাজনীতিতে আমিও তা পারি এবং দেই। তবে আওয়ামী লীগের বেলায় আমার উপদেশ নিছক উকিলের মত নয়। আন্তরিকই। কারণ সংগঠনের দিক হইতে আমি আওয়ামী লীগার না হইলেও মনে-প্রাণে ও আদর্শে আমি আজও আওয়ামী লীগার। কিন্তু ধর্মভিত্তিক রাজনীতিক দলসমূহকেও আমি আন্তরিকতার সাথেই উপদেশ দিতাম। ধরুন, মুসলিম লীগ ও জামাতে ইসলামীকেও আমি বলিয়াছি আপনারা যে মতাদর্শের রাজনীতিই করুন না কেন, দুইটা কথা মনে রাখিতে হইবে। এক, ধর্ম-সংস্কৃতির সাথে সাথে জনগণের অর্থনৈতিক স্বার্থের কথাও বলিতে হইবে। দুই, পার্টির নেতৃত্ব ও হেড অফিস পূর্ব-পাকিস্তানে থাকিতে হইবে। ওসব পার্টি-নেতারা যে আমার উপদেশ রাখিতেন, তা নয়। তবু তাঁরা উপদেশ চাইতে বিরত হন নাই। আমিও দিতে কৃপণতা করি নাই।
আমার অনেক হিতৈষী বন্ধু আমার এই আচরণের প্রতিবাদ করিতেন। অন্ততঃ আমার স্বাস্থ্যের নাযুক অবস্থার দরুন এ সব অকাজ হইতে বিরত থাকিতে বলিতেন। তাঁদের কথা যারা আমার উপদেশ মত কাজ করে না, তাদের নাহক উপদেশ দেই কেন? আমার জবাব; আমি ত কাউকে যাচিয়া উপদেশ দেই না। ওঁরাই উপদেশ নিবার জন্য তকলিফ করিয়া আমার কাছে আসেন। তাঁদের অনুরোধ না রাখা বেআদবি। আমার একটা যুক্তি, আমার বৈঠকখানাটা খয়রাতী দাওয়াখানা। যাঁরা দাওয়াই চান, তাঁদেরই দেই। দাওয়াই ব্যবহার করা-না-করা রোগীদের ইচ্ছা।
একটা নযির। জমাতে ইসলামীরা যখন দৈনিক বাংলা খবরের কাগ্য বাহির করা মনস্থ করিয়াছিলেন, তখন সম্পাদক পরিচালকসহ নেতৃবৃন্দ আমার কাছে আসিয়া কাগযের নাম সম্বন্ধে পরামর্শ চান। তাঁদের অভিপ্রায় জানিতে চাহিলে তাঁরা সংগ্রাম নামের কথা বলিলেন। আমি বাংগালী মুসলমানদের সাংবাদিকতার দীর্ঘদিনের ইতিহাস বর্ণনা করিয়া দেখাইয়া দিলাম যে আমাদের সাংবাদিকতার ঐতিহ্য খবরের কাগযের নাম সহজ-সরল চালু আরবী-ফারসী শব্দেই রাখা। ‘সংগ্রামের’ মত সংস্কৃত শব্দ নামে ব্যবহার করা এ দেশের রেওয়াজ নয়। উত্তরে তাঁরা যা বলিলেন এবং করিতেন তা বাংলাদেশে অবাংগালী মুসলিম নেতৃত্বের অসরল কমপ্লেক্স। সোজাসুজি বলিলেন : আপনারা বাংগালীরা নির্ভয়ে আরবী-ফারসী নামের কাগয চালাইতে পারেন, কিন্তু জমাতে ইসলামী তা করিলে লোকে বলিবে, বাংগালীদের সংস্কৃতি ধ্বংসের ষড়যন্ত্র চলিতেছে।
কমপ্লেক্সটা গভীর ও সুদূরপ্রসারী। এই কারণেই রাজনৈতিক ইসলামপন্থীরা বাংলা ভাষা ব্যবহারের সময় সংস্কৃত-ঘেষা ও কলিকাতার কথ্য বাংলাকেই প্রাধান্য দিয়া থাকেন।
এই সব পার্টির নেতারা আমার উপদেশ মানিতেন এটাও যেমন ঠিক নয়, কেউই যে আমার উপদেশ মানেন নাই, তাও সত্য নয়। বরং আমি যখন পাকিস্তানের রাজধানীর অবস্থিতিকেই পশ্চিম-পাকিস্তানের অর্থনৈতিক উন্নতি ও পূর্ব-পাকিস্তানের অবনতির কারণ বলিয়া যুক্তি দিতেছিলাম, এবং এ বিষয়ে একাধিক ইংরাজী-বাংলা প্রবন্ধ লিখিয়াছিলাম তখন পূর্ব-পাকিস্তান মুসলিম লীগের কাউন্সিল) নেতৃত্বের উদ্যোগে পাকিস্তানের রাজধানী কুড়ি বৎসরের জন্য ঢাকায় স্থানান্তর করিতে এবং অতঃপর পর্যায়ক্রমে দেশের রাজধানী উভয় অঞ্চলে প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব মুসলিম লীগে গৃহীত হইয়াছিল।
পক্ষান্তরে আমার ধানমণ্ডির বাড়িতে কেউ কেউ ‘হরিঠাকুরের আস্তানা’ না বলিয়া কাশিম বাজারের কুঠি (ষড়যন্ত্রের আজ্ঞা অর্থে) বলিয়াছিলেন : তাতেও তাঁদের প্রতি আমার বা আমার প্রতি তাঁদের মনোভাবের কোন অবনতি ঘটে নাই। প্রমাণ, তাঁরাও আমার ‘উপদেশ’ নিতে আসিতেন। আর সবার মতই তাঁরাও মনে করিতেন। স্বপক্ষেরটা উপদেশ, আর বিপক্ষেরটা ষড়যন্ত্র।
আমার দিককার আসল কথা, এই ধরনের উপদেশ দেওয়ার মধ্যে একটা আনন্দ ছিল। বোধ হয় মনের কোণে একটা গোপন অহংকারও ছিল। সবাই আমার উপদেশ নিতে আসেন, এটা আমার কম গৌরবের কথা নয়। এমন একটা অহমিকার ভাব হয়ত আমাকে পাইয়া বসিয়াছে। বাহিরে গিয়া নেতৃত্ব, বক্তৃতা ও মন্ত্রিত্ব করিয়া যশ খ্যাতি অর্জন করিতে পারি না; ঘরে বসিয়া একটু-একটু মুরুব্রিয়ানা করাটা মন্দ কি?
