অহংকারের দায়ে অপরাধী না হইয়াও আমি বলিতে পারি, আমি বন্ধু-বান্ধবের অনুরোধের স্তর পার হইয়াছি। ওতে আমি আর আকৃষ্ট হই না। ফুটবলের যাদুকর সামাদ সাহেবের মতই এ বুড়া বয়সেও যে মাঠে নামিতে সাধ যায় না, তা নয়। কিন্তু সামাদ সাহেবের মতই নিজের অক্ষমতা সম্বন্ধেও আমি তীক্ষ্ণভাবে সজাগ। তাই আমি প্রথমদিকে বেশ আয়াসে এবং পরে বিনা-আয়াসে নিজেকে বিরত করিতে পারিয়াছি। এই কারণে আমি সক্রিয় রাজনীতি হইতে ধীরে ধীরে সরিয়াছি। মানে বায়োস্কোপের ছবির মত ‘ফেড-আউট’ করিয়াছি।
কিন্তু রাজনীতিকরা আমাকে বাধ্য করিয়াছেন নেপথ্যে অভিনয় করিতে। অবশ্য একেবারে মৃত সৈনিকের পাঠ নয়। আমাকে তাঁরা রাজনৈতিক চিন্তা হইতে মুক্তি দেন নাই। তাই আমি প্রায় এক যুগ হইতে ‘এলডার স্টেটসম্যান’ হইয়াছি। আমাদের দেশী ভাষায় বলা যায় রাজনৈতিক ‘হরিঠাকুর’। বন্ধুবর আতাউর রহমানের ভাষায় ‘হৈরাতাঁতী’’। হরিঠাকুরের কাহিনী বাংলার সব অঞ্চলেই চালু আছে। কারণ সব গাঁয়েই একজন বুড়া মুরুব্বির দরকার যাঁর জ্ঞান ও নিরপেক্ষতায় সকলের আস্থা আছে। কিন্তু আতাউর রহমান সাহেবের জন্মভূমি ঢাকা জিলার ধামরাই থানাটাই এ ব্যাপারে সবচেয়ে প্রসিদ্ধ। এই ধামরাই থানায় ‘হরিঠাকুর’ নামে একজন এলডার-স্টেটসম্যান ছিলেন। তিনি ‘হরিঠাকুর’ নামেই বিখ্যাত ছিলেন। তাঁতী কূলে তাঁর জন্মের কথা কারও মনেই ছিল না। অসাধারণ জ্ঞানের জন্য দেশ-বিদেশে, মানে দশ গাঁয়ে, তাঁর প্রসিদ্ধি ছিল। জটিল সমস্যার সম্মুখীন হইয়া দূরদূরান্ত হইতে লোকজন দল বাঁধিয়া তাঁর কাছে আসিত। তাঁর-দেওয়া সমাধান যেসব সময়ে নির্ভুল বা গ্রহণযোগ্য হইত, তা নয়। কিন্তু তাতে হরিঠাকুরের বুযুর্গিও কমিত না। তাঁর দরবারের, মানে আংগিনার, ভিড়ও কমিত না। একটা নযির দিয়াই আতাউর রহমান সাহেব ‘হরিঠাকুরের’, তাঁর দেওয়া আদরের নাম ‘হৈরার’,বুদ্ধিমত্তার গভীরতা প্রমাণ করিয়া থাকেন। ঘটনাটা ছিল এই : একবার এই অঞ্চলের কয়েকজন পথিক একটা তালের আঁটি পথে পড়িয়া পাইল। ধামরাই অঞ্চলে খেজুর নারিকেল প্রচুর হইলেও সেখানে তালগাছ খুব কমই হয়। কাজেই তারা তালের আঁটি কখনও দেখে নাই। এ অবস্থায় ঐ অদ্ভুত জিনিসটা কি, তা লইয়া নিজেদের মধ্যে অনেক সলা-পরামর্শ ও বাদ-বিতণ্ডা করিল। একমত হইতে না পারিয়া শেষে তারা হরিঠাকুরের কাছে গেল। হরিঠাকুর প্রকৃত প্রবীণ জ্ঞানীর মতই বস্তুটি অনেকক্ষণ উল্টাইয়া-পাল্টাইয়া দেখিলেন। চোখ বুজিয়া ধ্যান করিলেন। চোখ বড় করিয়া নিরীক্ষণ করিলেন। অবশেষে তিনি হাসিয়া ফেলিলেন। খানিকক্ষণ হাসিবার পর তিনি কাঁদিয়া ফেলিলেন। কিছুক্ষণ কাঁদিবার পর ঠাকুর আবার হাসিতে লাগিলেন। সমবেত ভক্তগণ ঠাকুরের এই অভূতপূর্ব আচরণ দেখিয়া বিস্মিত হইল। ঠাকুরকে এর কারণ জিগ্গাসা করিল। অনেক অনুনয়-বিনয়ের পর ঠাকুর বলিলেন : এই একটা তুচ্ছ বস্তু তোরা চিনিতে পারিলি না, তাই আমি তোদের নির্বুদ্ধিতায় প্রথমে হাসিয়াছি। হাসিবার পরে তিনি কাঁদিলেন কেন, ভক্তদের এই প্রশ্নের জবাবে ঠাকুর বলিলেন : আমার অবর্তমানে তোদর কি দশা হইবে, সে কথা ভাবিয়া আমি কাঁদিয়াছিলাম। কাঁদিবার পর তিনি আবার হাসিলেন কেন, এই প্রশ্নের জবাবে ঠাকুর বলিলেন : “বস্তুটি কি আমি নিজেই তা বুঝি নাই, তোদর কি বুঝাইব? এই ভাবিয়া আমি হাসি ঠেকাইতে পারি নাই।”
ধামরাইর এই ঐতিহাসিক হরিঠাকুরের দশা হইয়াছে আমার। গত এক দশক ধরিয়া এই অবস্থা চলিতেছে। বন্ধুবর আতাউর রহমানই আমার এই পদবি চালু করিয়াছে। নিজের দলীয় সহকর্মীদের সহিত রাজনৈতিক জটিল প্রশ্নসমূহের আলোচনায় মতভেদ তীব্র হইয়া উঠিলেই তিনি বলেন : চল হৈরার কাছে যাই। এটা এখন সকল দলের মধ্যে চালু হইয়াছে। আওয়ামী লীগ, জাতীয় লীগ, সমাজতান্ত্রিক পার্টি, মুসলিম লীগ (কনভেনশন ও কাউন্সিল), জমাতে ইসলামী, নিষামে ইসলাম, ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির উভয় শাখা ছাত্রলীগ ও ছাত্র ইউনিয়ন ইত্যাদি পরস্পর-বিরোধী মতবাদ ও কর্মপন্থার সকল দলের নেতা-কর্মীরা আমার উপদেশ ও পরামর্শ নিতে আসিয়া থাকেন। সাধারণ জাতীয় প্রশ্নের বেলা ত বটেই, তাঁদের যাঁর-তাঁর নিজস্ব প্রতিষ্ঠান ও কর্মপন্থার জটিল সমস্যাসমূহের মীমাংসা সম্বন্ধেও। ফলে আমার বাড়িতে সকাল-বিকাল ভিড় লাগিয়াই আছে। মনে হইবে আমি কতই না রাজনীতি করিতেছি। ডাক্তার বা উকিলের ব্যবসার দিক হইতে বিচার করিলে মনে হইবে আমার চেম্বার-প্র্যাকটিস একেবারে জমজমাট, যাকে বলে ‘রোরিং প্রাকটিস’। আমার অসুখ-বিসুখ, অবসর বিশ্রাম কোন অজুহাতই চলিবে না। বিনা খবরে, উইদআউট এপয়েন্টমেন্টে, যখন খুশি আমার কাছে আসার অধিকার সকলেরই আছে। আমার ‘না’ বলিবার অধিকার নাই। দু’দশ মিনিট দেরি করিবার উপায় নাই। খবর পাওয়ামাত্র বৈঠকখানায় হাযির হইতে হইবে। অন্যত্র কাজ আছে, বিলম্ব করিবার মত সময় নাই এই ধরনের যুক্তিতে তাঁরা ঘন-ঘন তাকিদও পাঠাইয়া থাকেন। এব্যস্ত হইয়া আমি বৈঠকখানায় আসিলে তাঁরা আলোচনাকে দীঘে-পাশে ও গভীরতায় যেভাবে প্রসারিত ও দীর্ঘায়িত করেন, তাতে মনে হয় না যে তাঁদের হাতে সময় নাই বা অন্যত্র কাজ আছে।
