৩. এবারের ‘দেখা’ গ্যালারির দর্শকের
এ মুদ্দতের রাজনীতিটা লেখকের দেখা মানে ইংরেজী ‘সি’ নয়, ‘অবযার্ভ’। গ্যালারির দর্শকরা যেমন মাঠের খেলা দেখেন, নিজেরা খেলেন না। কিন্তু গ্যালারির এই দর্শকদের মধ্যেও দুই কেসেমের লোক থাকেন। এক কেসেমের লোক জীবন-ভর দর্শক। খেলা দেখিয়াই তাঁদের আনন্দ। নিজেরা কোনও দিন প্রতিযোগিতায় ত খেলেন নাই, জীবনে কোনও দিন পায়ে বল বা হাতে ব্যাট নিয়াও দেখেন নাই। আর এক কেসেমের দর্শক আছেন, যাঁরা আগে খেলিতেন। এখন খেলা থনে অবসর নিয়াছেন। এখন শুধু খেলা দেখেন। সাবেক খেলোয়াড় বলিয়া খেলার ভাল-মন্দ, খেলোয়াড়দের দোষ-ত্রুটি, নিখুঁতভাবে বিচার করিবার ক্ষমতা এবং অধিকারও এদের আছে। বর্তমানের রাজনীতির খেলার মাঠের আমি এমনি একজন দর্শক মাত্র। এই উভয় খেলার মাঠের একটা অদ্ভুত সাদৃশ্য এই যে প্রবীণ সাবেক খেলোয়াড় দর্শকরা নবীনদের খেলার দোষগুণের নিখুঁত ও নির্ভুল বিচার করিতে পারেন ঠিকই এবং দোষ-ত্রুটি দেখাইতেও পারেন বটে, কিন্তু নিজেরা খেলিতে পারেন না।
৪. ফুটবল যাদুকর সামাদের কথা
খেলার কথাটা উঠিয়া পড়ায় এ সম্পর্কে একটা গল্প মনে পড়িয়া গেল। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের গোড়ার দিকে অধ্যাপক হুমায়ুন কবির ও আমি প্রায় প্রতিদিন কলিকাতার গড়ের মাঠে ফুটবল খেলা দেখিতে যাইতাম। অধ্যাপক হুমায়ুন কবির তখন দৈনিক ‘কৃষকের’ ম্যানেজিং ডিরেক্টর, আর আমি এডিটর। ইউনিভার্সিটি হইতে খেলার মাঠে যাইবার পথে তিনি আমাকে তাঁর গাড়িতেই তুলিয়া নিতেন। ফুটবলের যাদুকর সামাদ সাহেব তখন খেলা হইতে সম্প্রতি রিটায়ার করিয়াছেন। নিয়মিত দর্শক। অনেক দিনই আমরা পাশাপাশি বসিয়া খেলা দেখিতাম। এমনি একদিন আমরা কৌতূহলে জিগ্গাস করিলাম : তরুণ খেলোয়াড়দের খেলা আপনার কাছে কেমন লাগে? তিনি বিনা দ্বিধায় জবাব দিলেন : খুব ভাল লাগে। একটু থামিয়া যোগ করিলেন। অবশ্য যদি ভাল খেলে।
‘আর যদি খারাপ খেলে তবে আপনার কেমন লাগে?
‘এক-একবার মনে হয় লাফায়ে মাঠে নেমে পড়ি।’ (‘লাফিয়ে’টা তখনও ভাষার মাঠে নামে নাই।) আমরা উভয়ে সমস্বরে প্রশ্ন করিলাম : ‘তবে নেমে পড়েন না কেন?’
সামাদ সাহেব হাসিয়া জবাব দিলেন : তৎক্ষণাৎ মনে পড়ে, সত্যসত্যই খেলার মাঠে নামলে ওদের মতও খেলতে পারব না। একটা দীর্ঘনিশ্বাস ফেলিয়া এককালের লক্ষ দর্শকের হর্ষধ্বনির দ্বারা নন্দিত এই ফুটবলের যাদুকর বলিলেন : সব কাজেরই একটা বয়স আছে। কি বলেন আপনারা? আমরা কেউ জবাব দিবার আগেই তিনি হাসিয়া বলিলেন : বোধ হয় একমাত্র সাহিত্য-সেবা ছাড়া। আমরা সানন্দে হাসিতে যোগ দিলাম।
৫. গ্যালারিতে কেন?
ফুটবল খেলার বিশেষজ্ঞ সামাদ সাহেবের ফুটবল সম্পর্কে এই কথাটা আমার মতে রাজনীতিতেও প্রযোজ্য। কিন্তু এ বিষয়ে আমার সমর্থক বেশি নাই। তবে আমার যুক্তিতে জোর আছে বলিয়াই আমার বিশ্বাস। আমার মতে সরকারী চাকুরিয়াদের মতই পঞ্চাশ-ষাট বছর বয়সে রাজনীতিক নেতাদের সক্রিয় রাজনীতি থনে অবসর নেওয়া উচিৎ। কারণ এই বয়সের পরে রাজনীতিক নেতারা পার্লামেন্টারি রাজনীতির অযোগ্য হইয়া পড়েন। গণতান্ত্রিক রাজনীতিতেও, ডিক্টেটরি রাজনীতিতেও। গণতান্ত্রিক দলীয় রাজনীতিতে অযোগ্য হন এই কারণে যে তাঁরা তখন আর গণতান্ত্রিক থাকেন না। বয়স ও অভিজ্ঞতার দাবিতে তাঁরা বিরুদ্ধতা ও সমালোচনা সইতে পারেন না। আর ডিক্টেটরি রাজনীতি করিবার মত বেপরোয়া অযৌক্তিক মনোভাবের অধিকারীও তাঁরা এই বয়সে থাকেন না। এক কথায়, এই বয়সের লোকেরা গণতন্ত্রের জন্য একটু বেশি মাত্রায় শক্ত। আর ডিটেরির জন্য বেশি মাত্রায় নরম। আমার এই যুক্তি কেউ মানেন না। প্রায় সবাই বলেন, বয়স বৃদ্ধির সংগে-সংগে মানুষের রাজনীতিক দক্ষতা বাড়ে। বাংলার ফজলুল হক ও সুহরাওয়ার্দী, ইংলণ্ডের চার্চিল, পশ্চিম জার্মানীর কনরাড অডনেয়ার, ভারতের জওয়াহের লাল, যুগোস্লাভিয়ার টিটো প্রভৃতি সফল রাজনীতিকদের তাঁরা তাঁদের সমর্থনের নযির খাড়া করেন। আমার মতে ওঁরা দৃষ্টান্ত নন, ব্যতিক্রম মাত্র।
যা হোক, কেউ না মানিলেও আমি আমার যুক্তি মানিয়া লইয়াছি। পঞ্চাশ-ষাটে না করিলেও ষাট-পয়ষট্টিতে সক্রিয় রাজনীতি থনে অবসর গ্রহণ করিয়াছি। এটা স্বেচ্ছায় ঘটিয়াছে কি স্বাস্থ্যগত কারণে বাধ্যতামূলকভাবে ঘটিয়াছে, তা নিশ্চয় করিয়া বলা যায় না। কারণ সক্রিয় রাজনীতি না করিলেও ‘নিক্রিয় রাজনীতি’ আজও করিয়া চলিয়াছি। কারণ সেই প্রবাদ বাক্যের কম্বল। আপনি কম্বল ছাড়িলেও কল আপনাকে ছাড়িবেনা। আমার দেখা রাজনীতির এই অধ্যায়ে, যাকে কার্যতঃ এই বই-এর শেষ অধ্যায় বলা যাইবে, যা লিখিতে বসিয়াছি, তাতে সেই কলের কাহিনীই সত্য প্রমাণিত হইবে।
৬. রাজনৈতিক ‘হরিঠাকুর’
কিন্তু একটু ভিন্ন ধরনে। কম্বলের সাথে রাজনীতির তুলনা না করিয়া রাজনীতিকের তুলনাই বোধ হয় ঠিক। কারণ আমি রাজনীতি ছাড়িবার পরও রাজনীতি আমাকে ছাড়ে নাই, এ কথা বলিলে রাজনীতির প্রতি অবিচার হইবে। রাজনীতি কখনও অনিচ্ছুক ব্যক্তির উপর ভর করে না। যাঁরা বলেন, অনিচ্ছা সত্ত্বেও তারা রাজনীতির শিকার হইয়াছেন, তাঁদের মিথ্যাবাদী না বলিয়াও একথা বলা চলে যে, তাঁদের মনে রাজনীতি করিবার একটু কুৎকুতানি ছিল। হইতে পারে সেটা ছিল অবচেতন মনে। কিন্তু ছিল তা অবশ্যই। সেটা প্রকাশ পাইয়াছে দৃশ্যত বাহিরের একটু চাপে। চাপটাও হয়ত তিনিই সৃষ্টি করিয়াছেন। এটাকে আমি অন্যত্র বন্ধু-বান্ধবের অনুরোধে রাজনীতিতে,মানেইলেকশনে,যোগদান বলিয়াছি।
