দেশকে এমন শাসন দিতে পারে শুধু সার্বভৌম জনগণই, এটা ঠিক। কিন্তু এটাও তেমনি ঠিক। যে সার্বভৌমত্ব বাইরের কারও দেওয়া-নেওয়ার ব্যাপার নয়। ব্যক্তির যেমন আত্মমর্যাদা বোধ, জাতির তেমনি সার্বভৌমত্ব। উভয়টাই নিজের কাছে। ব্যক্তির আত্মমর্যাদার যা ডিগনিটি, জাতির সার্বভৌমত্বের ভাই ম্যাজেস্টি। সুরুজের কিরণের মতই ওরা স্ব-প্রকাশ।
পাকিস্তানের নেতাদের এই ডিগনিটি ও পাকিস্তানী জনগণের এই ম্যাজেষ্টি সুরুজের কিরণের মতই আত্ম-শক্তিতে প্রকট হউক, পাকিস্তানের জীবনে অমাবস্যার পুনশ্চ আর কোনও দিন না ঘটুক, এই মুনাজাত করিয়া এই পুনশ্চ লেখা শেষ বারের মত শেষ করিলাম। আল্লাহ পাকিস্তানের হেফাযত করুন। আমিন, সুম্মা আমিন।
৩২.০১ প্রথম জাতীয় সাধারণ নির্বাচন
স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ
নয়া অধ্যায়
উপাধ্যায় এক
প্রথম জাতীয় সাধারণ নির্বাচন
১. ‘পুনশ্চে’র অবসান
খোদাকে অসংখ্য ধন্যবাদ, আমাকে আর ‘পুনশ্চ’ লিখিতে হইল না। মেহেরবান আল্লা আমার মুনাজাত কবুল করিয়াছেন। আবার ‘পুনশ্চ’ লেখার দায়িত্ব হইতে আমাকে রেহাই দিয়াছেন। সে উদ্দেশ্যে সর্বশক্তিমান আল্লা আমাদের রাষ্ট্রীয় জীবনে নয়া যমানার সূচনা করিয়াছেন। ফলে আমিও এবার পুনশ্চের’ বদলে ‘নয়া অধ্যায় লিখিবার সুযোগ পাইয়াছি। আমার ইচ্ছা আমাদের জাতীয় জীবনের এই নয়া অধ্যায়টি আমার বই–এর এক অধ্যায়েই শেষ হউক। এটা করিতে গিয়া দেখিলাম, যত সংক্ষেপই করি, অধ্যায়টি খুব বেশি বড় হইয়া যায়। পাঠকের সুবিধার খাতিরে, এবং বইটির সৌষ্ঠবের জন্যও, অধ্যায়টি একাধিক ভাগে ভাগ করা দরকার।
এ অবস্থায় আমি অনেক চিন্তা-ভাবনা করিয়া এই অধ্যায়ের ভাগগুলোর নামকরণ করিলাম ‘উপাধ্যায় (উপ+অধ্যায়)। ইদানিং উপ’ শব্দটা আমাদের দেশে খুবই জনপ্রিয় হইয়াছে। ‘জন’ মানে এখানে ‘বিদগ্ধ জন’। ‘উপ’ শব্দটার প্রচুর ব্যবহার আগেও ছিল। যেমন, উপকার’, উপদংশ’, ‘উপদেশ’ ‘উপপতি’, ‘উপপত্নী’, ‘উপবাস’, ‘উপমা’, ‘উপযুক্ত’, ‘উপসর্গ’, ‘উপসংহার’, ‘উপহার’ ও ‘উপহাস’। আরও অনেক আছে। মাত্র এক ডজনের উল্লেখ করিলাম। কিন্তু আমাদের বিদগ্ধ মনীষীরা সম্প্রতি ‘উপ’ শব্দটার প্রতি যে আসক্তি দেখাইতেছেন, তাতে ‘উপপতি’ ও ‘উপপত্নীর দিকেই পক্ষপাতিত্ব দেখান হইতেছে। ফলে ‘উপাচার্য’, ‘উপরাষ্ট্রপতি’, ‘উপকমিটি, উপকর্মাধ্যক্ষ’, ‘উপমহাধ্যক্ষ ইত্যাদির প্রচুর ব্যবহার চলিতেছে। আমি এই সুযোগ গ্রহণ করিলাম। উপাধ্যায়ের’ ভিন্ন অর্থ আছে, এই যুক্তিতে বিদগ্ধ মনীষীরা আমার এই নামকরণে আপত্তি করিতে পারিবেন না। তাঁদের আবিষ্কৃত ‘উপরাষ্ট্রপতির’ ‘উপ’ বিশেষণটি রাষ্ট্র’ ও ‘পতি উভয়টার গুণবাচক হইতে পারে, এমন বিভ্রান্তির ঝুঁকিই যখন তাঁরা লইয়াছেন, তখন ‘উপাধ্যায়ের বিভ্রান্তির ঝুঁকিতে তাঁদের আপত্তি হওয়া উচিৎ নয়।
গত সংস্করণের ‘শেষ কথা’ অনুচ্ছেদে আমি লিখিয়াছিলাম : পাকিস্তানের নেতাদের এই ডিগনিটি ও পাকিস্তানী জনগণের এই ম্যাজেস্টি সুরুজের কিরণের মতই আত্মশক্তিতে প্রকট হউক, পাকিস্তানের জীবনের অমাবস্যার ‘পুন’ আর কোনও দিন ঘটুক, এই মুনাজাত করিয়া এই ‘পুনশ্চ’ লেখা শেষবারের মত শেষ করিলাম।
কথাগুলি লিখিয়াছিলাম ১৯৭০ সালের নির্বাচনের প্রাক্কালে। ঐ সময় পূর্ব পাকিস্তানের জনপ্রিয় নেতাদের অনেকেই এল. এফ. ও-র দরুন নির্বাচনে অংশগ্রহণ করিবেন কি না, ভাবিতেছিলেন। তাঁদের মতে এল, এফ, ও নির্বাচিত পরিষদের সার্বভৌমত্ব হরণ করিয়াছে। কাজেই ঐ ক্ষমতাহীন পরিষদে নির্বাচিত হইয়া জনগণের দাবিমত, এবং তাঁদের পার্টি মেনিফেস্টো মত শাসনতান্ত্রিক সংবিধান রচনা করা যাইবেনা।
২. আওয়ামী নেতৃত্বের দূরদর্শিতা
তাঁদের যুক্তি অসার ছিল না। কিন্তু প্রশ্নটার আরেকটা দিক ছিল। সার্বজনীন ভোটাধিকারের ভিত্তিতে নির্বাচনে এল. এফ. এ.-র কোনও প্রভাব ছিল না। এল, এফ. ও.-র প্রভাব শুরু হইত নির্বাচনের পরে, পরিষদের সার্বভৌম ক্ষমতার উপর। কাজেই আমি দৈনিক সংবাদপত্রে ইংরাজী ও বাংলা উভয় ভাষায় ঘন-ঘন প্রবন্ধ লিখিয়া এই তরফটার দিকে নেতাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করিয়া তাঁদের নির্বাচনে অংশগ্রহণ করিবার উপদেশ দিয়াছিলাম। তার পক্ষে অনেক যুক্তি-তর্কও পেশ করিয়াছিলাম। বলিয়াছিলাম, আমাদের রাজনৈতিক জীবনে অমাবশ্যার ‘পুনশ্চ’ ঠেকাইবার উহাই একমাত্র পথ।
জনপ্রিয় পার্টিসমূহের মধ্যে কার্যতঃ একমাত্র আওয়ামী লীগই ছয় দফার. ভিত্তিতে সে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করিয়াছিলেন। জনগণ তাদের অন্তরের প্রতিনিধি নির্বাচন করিয়াছিল। তাদের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সার্বভৌমত্বের সামনে সামরিক প্রেসিডেন্ট এল.এফ. ও.ঝড়ের মুখে তৃণখণ্ডের মত উড়িয়া গিয়াছিল। আমি এই বৃদ্ধ বয়সে আরেকবার ‘পুনশ্চ’ লেখার দায় হইতে বাঁচিয়া গেলাম। আমাদের রাজনৈতিক জীবনে, সুতরাং আমার-দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছরে’, একটি নূতন অধ্যায় সংযোজিত হইল। আমাদের রাজনৈতিক জীবনের এই নয়া অধ্যায়ে কালে নিশ্চয়ই আরও নূতন-নূতন অধ্যায়, পরিচ্ছেদ, অনুচ্ছেদ, দফা ও উপ-দফা যোগ হইবে। কিন্তু ‘আমার দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছরে সেসব নূতন-নূতন দফা-উপদফা যোগ করিবার জন্য আমি বাঁচিয়া থাকিব না। থাকিয়া কোন লাভও নাই। তার দরকারও নাই। কারণ আমার দেখা রাজনীতির বয়স তখনও পঞ্চাশই থাকিবে। আমার বই এর নামও ‘পঞ্চাশ বছর’ই থাকিবে। এই ধরুন না, ১৯৬৮ সালের জুলাই মাসে এই বই যখন প্রথম বাহির হয়, তখনও এর নাম ছিল ‘রাজনীতির পঞ্চাশ বছর’। দুই বছর পরে ১৯৭০ সালে জুন মাসে যখন দ্বিতীয় সংস্করণ বাহির হয়, তখনও এর নাম ছিল ‘রাজনীতির পঞ্চাশ বছর’। দুই বছরে আমার দেখা রাজনীতির বয়স একদিনও বাড়িল না। তারপর আরও তিন বছর পরে ১৯৭৩ সালে যখন এর তৃতীয় সংস্করণ বাহির হইতেছে, তখনও এর নাম ‘পঞ্চাশ বছর। এর কারণ তিনটা হইতে পারে। (১) ‘পঞ্চাশ’ শব্দটা এই বইয়ে সংখ্যার চেয়ে বেশি প্রতীক-নির্দেশক; (২) লেখকের রাজনৈতিক কর্ম ও চিন্তার ওটাই ভ্যানিশিং লাইন; (৩) এই মুদ্দতের রাজনীতি লেখকের দেখার চেয়ে ‘শুনাই বেশি। কারণ এতে লেখকের ব্যক্তিগত ও দৈহিক যোগাযোগ একেবারে নাই বলিলেই চলে।
