শেষ কথা
আমার কথা প্রায় শেষ। যা-কিছু বলিয়াছি, তাতে পাকিস্তানের জাতীয় সমস্যাগুলির দিকে যদি নেতৃবৃন্দের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি ও সচেতন মন আকর্ষণ করিতে পারিয়া থাকি, তবে আমার কাজও প্রায় শেষ।
গত তেইশ বছরে নেতারা এ সমস্যাগুলির সুষ্ঠু সমাধান করিতে পারেন নাই। কাজেই প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়াও পারেন নাই। এতে বিয়ের কিছু নাই। সমাধানের বদলে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া কতকগুলি মিটানো ব্যাপারে আবার তাজা করিয়াছেন। এতেও আশ্চর্যের কিছু নাই। নেতারা নিজেরাই এসব লইয়া গিরো দেওয়া ও গিরো খুলার কাজ বহুবার করিয়াছেন। প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়াই বলুন, আর সাবেক প্রেসিডেন্ট আইউবই বলুন, পলিটিশিয়ানদের মতই তাঁরাও দেশের ইন্টেলিজেনশিয়ারই অংশ। অতএব তাঁরাও আমাদের জাতীয় রাজনৈতিক চিন্তা-ধারার আকারেরই প্রতিবিম্ব।
এ সবের মধ্যে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার বিশেষত্ব এই যে তিনি আইউবের কাড়িয়া-নেওয়া গণতন্ত্র দেশবাসীকে আবার ফিরাইয়া দিতেছেন। এটাই আজ পাকিস্তানী রাজনীতির সবচেয়ে বড় কথা। এই কথারও সুন্দরতম দিক এই যে তিনি জনগণের স্তরে দেশের শাসনতন্ত্র রচনার সুযোগ করিয়া দিয়াছেন। এটাই নেতাদের মহা পরীক্ষা। এ পরীক্ষায় পাস করিতেই হইবে। কোনও অজুহাতেই এ পরীক্ষায় ফেল করা চলিবে না। গণ-পরিষদের সার্বভৌমত্বের অভাবে শাসনতন্ত্র রচনা করিতে পারিলাম না বলাও যা, উঠানের দোষে ভাল নাচিতে পারিলাম না বলাও তাই। ও কথা বলা না গেলে, এ কথাও বলা চলিবে না।
গণতন্ত্রই জনগণের সার্বভৌমত্ব দিয়া থাকে। গণতন্ত্রহীন পরিবেশে জনগণের সার্বভৌমত্ব থাকে না। জনগণের সার্বভৌমত্ব না থাকিলে তাদের নির্বাচিত প্রতিনিধিদেরও সার্বভৌমত্ব থাকিতে পারে না। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায়ই জনগণের সার্বভৌমত্ব আসিবে। জনগণের সার্বভৌমত্বই তাদের নির্বাচিত পার্লামেন্টকে সার্বভৌমত্ব দিবে। অতএব আগে গণতন্ত্র। তারপরে সার্বভৌমত্ব।
প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার-দেওয়া লিগ্যাল ফ্রেমওয়ার্কের অনেক ত্রুটি আছে। কিন্তু সেটা বড় কথা নয়। এই ত্রুটিপূর্ণ ফ্রেমওয়ার্কের মধ্য দিয়াই জনগণের নির্বাচিত সরকারের হাতে রাষ্ট্রক্ষমতা হস্তান্তরিত হইতে পারে। এটাই বড় কথা। নির্বাচিত পার্লামেন্ট ও প্রতিনিধিত্বমূলক সরকারের হাতে ক্ষমতা আসিলে তাঁদের সার্বভৌমত্ব চ্যালেঞ্জ করিবার কেউ থাকিবেন না। তখন সেই সার্বভৌম পার্লামেন্টে ফ্রেমওয়ার্ক ও তজ্জনিত শাসনতান্ত্রিক দোষত্রুটি সবই সংশোধন করা যাইবে। এইভাবে নির্বাচিত পার্লামেন্ট ও প্রতিনিধিত্বমূলক সরকারের রাজনৈতিক মুক্তি ঘটিলে তাঁদের ‘মনিব’ যে জনগণ, তাদের অর্থনৈতিক ও সামাজিক মুক্তি আপনিই সাধিত হইবে। যে নির্বাচিত পার্লামেন্ট ও প্রতিনিধিত্বমূলক সরকার মেহনতী জনতার অর্থনৈতিক মুক্তি আনিবেন না, জনগণ ব্যালট-বাক্সের বিপ্লবের মাধ্যমে তাঁদের অপসারণ ঘটাইবে। অন্য কোনও প্রকারের বিপ্লব দরকারই হইবে না।
কিন্তু একাজে নেতাদের খুব সাবধান হইতে হইবে। দুইশ’ বছরের গোলামী শুধু আমাদের ভাতের দৈন্যই ঘটায় নাই, ভাবের দৈন্যও ঘটাইয়াছে। অভাব আমাদের চতুর্দিকে। কোনটা ফেলিয়া কোনটা আগে মিটাইব? গরিবের সংসার আমাদের এমন দিকভ্রান্তি স্বাভাবিক। কিন্তু নেতৃত্বের পরীক্ষাও এইখানেই। দিকভ্রান্তিতে পথভ্রষ্ট হইলে চলিবে না। আগে-পরের বিচার-বুদ্ধি হারাইলে সব ভণ্ডুল হইয়া যাইবে। অনেক নেতা ইতিমধ্যে এই ভুলই করিতে শুরু করিয়াছেন। এক দল বলিতেছেন : আগে পরিষদের সার্বভৌমত্ব চাই। এদের জবাব আগেই দিয়াছি। অপর দুইটি দলের একদল এক প্রান্ত হইতে বলিতেছেন : ‘ভাতের আগে ধর্ম চাই; দুনিয়ার আগে দিন চাই। অপর প্রান্ত হইতে আরেক দল বলিতেছেন : ভোটের আগে ভাত চাই।’ দুই দলের উদ্দেশ্যই সাধু। ধর্মই যদি না থাকিল, আত্মাই যদি মরিয়া গেল, দুনিয়াবী সুখ-সম্পদ দিয়া তবে কি করিব? অপর পক্ষে খোরাকির অভাবে যদি রাষ্ট্রের মনিব জনগণই মারা গেল, তবে এই ফাঁকা গণতন্ত্র কার কাজে লাগিবে?
কিন্তু প্রশ্ন এই ধর্মই হউক, আর ভাতই হউক, আমরা চাহিতেছি কার কাছে? গোলামের ধর্ম, আর ভিক্ষার চাউলই কি আমাদের কাম্য? কখনই না। ভোটের অভাব হইলেই যদি ভাত আসিত, তবে ভোটাধিকারহীন আইউব শাহির দশ বৎসরে আমাদের পাকঘর তাতে ভাসিয়া যাইত। আর আযাদিহীন ধর্ম-সাধনাই যদি আমাদের কাম্য হইত, তবে ইংরাজ-শাসিত ভারত দারুল-হার্ব হইত না, দারুল ইসলাম হইত। আগে গণতন্ত্র কায়েম হউক। আমরা নিজ হাতে গরিবের খানা পাকাইব। পেট ভরিয়া খাইয়া সুস্থ দেহে শান্ত মনে ধর্ম-কাজ করিব। অতএব আগে চাই গণতন্ত্র।
নেতারা বুঝুন, মার্শাল ল অথরিটি হিসাবে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার যা কর্তব্য ছিল, তা তিনি করিয়াছেন। এখন নির্বাচিত পরিষদের, সুতরাং নেতাদের কর্তব্য শাসন রচনা করা। অনুমোদনের প্রশ্ন লইয়া তাঁদের মাথা ঘামাইবার দরকার নাই। তাঁরা জনগণের গ্রহণযোগ্য একটি শাসনতন্ত্র রচনা করুন। প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার উহা গ্রহণযোগ্য হইবেই। জনগণের অনুমোদিত শাসনতন্ত্র প্রেসিডেন্ট অনুমোদন করিতে বাধ্য হইবেন।
অতএব দেখা যাইতেছে গণতন্ত্রের চাবিকাঠি এখন আর প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার হাতেনাই। এটা এখন নেতাদের, তথা নির্বাচিত পরিষদের হাতে। জনগণের গ্রহণযোগ্য শাসনত্ম রচনার মধ্যেই সে গোপন চাবিকাঠি নিহিত। এ দায়িত্ব মামুলি গণতান্ত্রিক দায়িত্ব নয়। কারণ পাকিস্তান মামুলি ফেডারেল রাষ্ট্র নয়। ভৌগোলিক বিছিনতাই এটাকে করিয়াছে অসাধারণ। পাকিস্তান একটা, কিন্তু তাঁর পাকস্থলী দুইটা। দুই রিজিওনের ফ্রন্টিয়ার এক না হওয়ায় তাদের ইন্টিরিয়ারও কাজেই এক না। ইন্টিরিয়ার দুইটা হওয়ায় দুই পাকস্থলীর মুখও দুইটা। এই দুই মুখেই দুই পাকস্থলী ভরিতে হইবে। ইসলামী ভ্রাতৃত্ব জাতীয় ঐক্য ও স্ট্রং সেন্টার কোনও যুক্তিতেই এক পেট ভুখা রাখা চলিবে না। পাকিস্তানের শাসনতন্ত্রে এই সমস্যার সমাধান থাকিতে হইবে।
