তৃতীয়তঃ, ধর্মের ভিত্তিতে পাকিস্তানে যদি বহু নেশন থাকিতে পারে, তবে রেশিয়াল ও ভাষা-ভিত্তিক বহু নেশনও থাকিতে পারে। বস্তুতঃ মুসলিম জাতীয়তার দাবিদার পাকিস্তানের রাষ্ট্র-নেতারা রেশিয়াল ও লিংগুইস্টিক ন্যাশনালিযমের দাবিকে উষ্কানী দিতেছেন ও জোরদার করিতেছেন। বাংগালী-সিন্ধী-পাঠান-পাঞ্জাবী-বেলুচী জাতীয়তার দাবি উঠিতেছে। মুসলিম-হিন্দু-খৃষ্টান-বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদের প্রতিক্রিয়ায়। ফলে মুসলিম জাতীয়তাবাদের মতই বাংগালী-সিন্ধী-পাঠান-পাঞ্জাবী, জাতীয়তাবাদ ও পাকিস্তানী জাতীয়তাবাদের প্রতিবন্ধকতা করিতেছে। অথচ উভয় পক্ষের কথাতেই আংশিক সত্য নিহিত রহিয়াছে।
একদিকে পাকিস্তানের বিপুল মেজরিটি মুসলমান। তাদের ধর্ম ইসলাম। ইসলামী মূল্য-বোধ তাদের জীবনাদর্শের মাপকাঠি। সকলে সব সময়ে দৈনন্দিন জীবনে নিত্যনৈমিত্তিক কাজে সে মূল্য-বোধ প্রয়োগ করিতে পারি আর না পারি, ওটা আমাদের ধার্মিক ও কৃষ্টিক জীবনাদর্শ ও মূলনীতি। সে আদর্শ রূপায়ণের ও নীতি পালনের কোনরূপ শাসনতান্ত্রিক ও শাসনযান্ত্রিক প্রতিবন্ধকতাই আমরা বরদাশত করিব না। এই সবই ঠিক। বস্তুতঃ ভারতীয় মুসলমানদের ধর্মীয় স্বাধীনতার ও কৃষ্টিক স্বকীয়তার পূর্ণ বিকাশ লাভে কোন রাীয় ও সামাজিক বিঘ্ন সৃষ্টি করিতে কেউ না পারে, পাকিস্তান সৃষ্টির অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য তাই।
অন্যদিকে পাকিস্তানের অধিবাসীরা রেশিয়ালি বিভিন্ন জাতে বিভক্ত। ভাষা সাহিত্যে ও কৃষ্টি-শিয়ে তারা স্ব। এই রেশিয়াল জাত হিসাবে তারা বাংগালী, সিন্ধী, পাঠান, পাঞ্জাবী, বেলুচ নামে বিভক্ত। এই রেশিয়াল ঐতিহ্যে ও স্বাতন্ত্র্য তারা লজ্জিত নয়। বরঞ্চ আরব, তুর্কী, ইরানীর মতই গর্বিত। কিন্তু পাকিস্তানে এরা ন্যাশনালিটি মাত্র। কেউই নেশন নয়। তারা সবাই পাকিস্তান নেশনের অন্তর্ভুক্ত। এই হিসাবে রেশিয়াল স্বাতন্ত্র্যর বিচারে পাকিস্তান মালটি-নেশন স্টেট নয়, মালটি ন্যাশনালিটি স্টেট। দুনিয়ার অধিকাংশ নেশন-স্টেটই গোড়াতে মান্টি-ন্যাশনালিটি স্টেট ছিল। দীর্ঘদিন একই গণতান্ত্রিক শাসনাধীনে থাকিয়া তারা আজ এমনভাবে এক নেশনে পরিণত হইয়াছে যে গোড়ার সে স্বাতন্ত্র ও পার্থক্য আজ খুজিয়া বাহির করিতে হয়। শুধু মার্কিনী জাতিই নয়, ইংরেজ, জার্মান, ফরাসী জাতিও গোড়াতে বিভিন্ন রেশিয়াল জাতের সমন্বয়ে গঠিত হইয়াছিল। শুধু মার্কিন মুল্লুকেই ইংলিশ, আইরিশ, ফরাসী, জার্মান জাতিসমূহের সময় হয় নাই, খোদ ইংরেজ জাতি ও এংলো স্যাকসন ও নর্মানদের মিশ্রণে গঠিত হইয়াছে। ফ্যাংকিং, টিউটনস, প্রশিয়ানস, অরিয়ানস লইয়া জার্মান জাতি গঠিত হইয়াছে। গণতান্ত্রিক সাম্যের দেশ পাকিস্তানেও আমরা একদিন পাকিস্তানী নেশনে সংগঠিত ও পরিণত হইতে পারি। এটা তবেই সম্ভব যদি আমরা রাস্ত্রীয় সামাজিক আর্থিক ও কৃষ্টিক সমস্যা না বাড়াই। যদি বর্তমান সমস্যাগুলোর সুই সমাধান করি। যদি আমাদের ভৌগোলিক আঞ্চলিকতাকে রাজনৈতিক কৌশলে ডিংগাইতে পারি। যদি সমস্ত প্রদেশ অঞ্চলে, সকল ভাষা-কৃষ্টি এবং সমুদয় শিল্প সাহিত্যকে ইউনি-কালার করিবার জন্য রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার না করি। যদি আমরা পাকিস্তানকে হাজার ফুলের গুলবাগিচা বানাই।
এখানেই আমাদের রাজনৈতিক নেতাদের ভুলে আমাদের লেখক-সাহিত্যিক চিন্তানায়করা জাতিকে দুই বিপরীত দিক হইতে টানিতেছেন। একদল পাকিস্তানীদেরে মক্কা-মদিনা-দামেশক-বাগদাদের দিকে টানিতেছেন। আরেক দল মঙ্কো-পিকিং কলিকাতা-শান্তিনিকেতনের দিকে টানিতেছেন। পাকিস্তানের দিকে কেউ টানিতেছেন। পাকিস্তানের রূহ তাঁরা সবাই পাকিস্তানের বাইরে তালাশ করিতেছেন। পাকিস্তানের ভিতরে সে রূহের সন্ধান কেউ করিতেছেন না। ‘উর্দু-ফারসীতে’, ‘মাদেরেওতন’ বলা গেলেও বাংলায় দেশ-জননী বলা যাইবে না : এক দল বলিতেছেন ধর্মের দোহাই দিয়া। দেশকে যদি ‘মা’ বলা নাই যায়, তবে চন্ডীকেই ‘মা’ বলিব : বলিতেছেন আরেক দল রেশিয়াল ঐতিহ্যের দোহাই দিয়া। একটা আরেকটার প্রতিবাদ, প্রতিধ্বনি। দুইটাই ব্যক্তির মত। জাতির মত নয় একটাও। এসব ব্যক্তিগত বাদানুবাদ ও রুচিঅভিরুচির গলার জোর খতম হইবে না যতদিন অবাধ গণ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে জন-মতের বাদশাহি প্রতিষ্ঠিত না হইবে।
মুসলিম মেজরিটির দেশে গণতন্ত্রই ইসলাম বাঁচাইয়া রাখিবে। নেতাদের চেষ্টায় শাসনতন্ত্র বিধান করিয়া ইসলাম রক্ষা করা যাইবে না। পাকিস্তানে গণতন্ত্রের বিপদই আসলে ইসলামের বিপদ।
নিরংকুশ গণতন্ত্রই পাকিস্তান বাঁচাইয়া রাখিবে। পাকিস্তানের ইষ্ট-অনিষ্টই আমাদের বিচার্য। কারণ মানুষ এটা করিতে পারে। ইসলাম আল্লার-দেওয়া ধর্ম। মানুষ তার অনিষ্ট বা ধ্বংস সাধন করিতে পারে না। কিন্তু পাকিস্তান মানুষের তৈয়ারী রাষ্ট্র। মানুষ এটার অনিষ্ট করিতে, এমন কি, এর ধ্বংস সাধনও করিতে পারে। পাকিস্তান সৃষ্টির আগেও ইসলাম ছিল। খোদা-না-খাস্তা, পাকিস্তানের যদি কোনও অশুভ পরিণতি ঘটে, তবে তার পরেও ইসলাম থাকিবে। সে অবস্থায় ইসলামের কিছু হইবে না : কিন্তু পাকিস্তানী মুসলমানের বরাতে দুঃখ আছে। তবু যে আমরা পাকিস্তান বাঁচাইয়া রাখিবার চেষ্টার বদলে ইসলাম বাঁচাইয়া রাখিবার চেষ্টা করিতেছি, এ সবই আমাদের রাজনৈতিক চিন্তার অপরিচ্ছন্নতার লক্ষণ। পাকিস্তানে বসিয়া পাকিস্তানী জাতীয়তাবাদ না বোঝা তারই প্রমাণ। যতদিন এই অপরিচ্ছন্নতা না ঘুচিবে, ততদিন গণতন্ত্রের নামে ‘কনট্রোলড’, ’ব্যাসিক’ ও ‘গাইডেড’ ডেমোক্র্যাসির কথা এবং জাতীয় পরিচিতির নামে ‘মুসলিম জাতি’ ‘বাংগালী জাতি’ ‘সিন্ধী’ জাতির কথা শুনিতে হইবেই। চিন্তার এই অপরিচ্ছন্নতা দূর হইবে নিরংকুশ গণতন্ত্রের প্রতিষ্ঠায়। তেমন গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হইতে পারে সার্বজনীন প্রত্যক্ষ নির্বাচনে সার্বভৌম পার্লামেন্ট গঠনে। সে গণতন্ত্রকে কোনও বিশেষ বিধানেই সংকুচিত করা চলিবে না। নিরংকুশ অসংকুচিত সার্বজনীন গণতান্ত্রিক নির্বাচন হইতে পারে শুধুমাত্র ধর্ম-বর্ণ-নির্বিশেষে পাকিস্তানী জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে। পাকিস্তানের নিরাপত্তাও নিহিত হইয়াছে সেইখানেই।
