পাকিস্তান একটি নেশন-স্টেট, জাতি-রাষ্ট্র। জাতি-রাষ্ট্রের অধিবাসীরা জাতি ধর্ম-বর্ণ-নির্বিশেষে যার-তার রাষ্ট্রের রাষ্ট্রীয় জাতি, নেশন। এই হিসাবে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে পাকিস্তানের সব বাঁশিন্দা লইয়াই পাকিস্তানী নেশন। এটা রাষ্ট্রবিজ্ঞানের পয়লা সবক। কিন্তু আমাদের দেশের অনেক রাজনীতিবিদ এটা মানেন না। তাঁরা বলেন, শুধু মুসলমানদের লইয়াই পাকিস্তানী জাতি গঠিত। পাকিস্তান মুসলিম জাতীয়তাবাদের উপর প্রতিষ্ঠিত। এটা তাঁদের ভুল। মুসলিম জাতি নামে কোনও রাষ্ট্রীয় জাতি বা নেশন হইতে পারে না। পাকিস্তানের সব বাঁশিন্দারাই যদি মুসলমান হইত, তবু তাদের মুসলিম জাতি বলা যাইত না। কারণ নেশন হইতে গেলেই একটি রাষ্ট্র লাগে। রাষ্ট্র হইতে গেলেই একটি ভূখণ্ড বা টেরিটরি লাগে। সেই টেরিটরির নাম অনুসারেই রাস্ট্রীয় জাতির নামকরণ করা হয়। ধর্মের ভিত্তিতে কোনও নেশন হয় না। ধর্মের নামানুসরে রাষ্ট্রেরও নাম হয় না। কাজেই নেশনেরও নামে হয় না। এটা কার্যতঃ অসম্ভব। কারণ দুনিয়ায় ষাট কোটি মুসলমান আছে। তারা প্রায় ত্রিশটি মুসলিম প্রধান দেশের শাসক। তাদের একটাও মুসলিম রাষ্ট্র বা ইসলামী রাষ্ট্র নামে পরিচিত নয়। অধিবাসীরাও মুসলিম নেশন নামে নিজ দেশের বাজাতিসংঘে স্বীকৃত নয়। ধর্মের দিক দিয়া এই ষাট কোটি মুসলমানই এক জাতি। কিন্তু সে জাতির নাম নেশন বা কম নয়। সে জাতির নাম মিল্লত। দুনিয়ার সব মুসলমান এক মিল্লতের অন্তর্ভুক্ত হইয়াও রাষ্ট্রীয় জাতি বা নেশন হিসাবে পৃথক, স্বতন্ত্র এবং সম্পূর্ণ ভিন্ন-ভিন্ন স্বার্থের অধিকারী। কারণ তাদের টেরিটরি ও নাগরিক অধিকার সীমাবদ্ধ। সে অধিকার লইয়া তাদের মধ্যে বিরোধ ও গোলাগুলিও হইয়া থাকে। টেরিটরিয়াল নামেই তাদের নেশন গঠিত। তাদের ন্যাশনালিযম ও টেরিটরির চতুঃসীমা এক ও অভিন্ন।
তারপর অবিভক্ত ভারতে মুসলিম-অমুসলিম মিলিয়া এক নেশন হইতে পারি নাই বলিয়া পাকিস্তানেও পারিব না, একথাও ঠিক নয়। অখন্ড ভারতে যা পারি নাই, পাকিস্তানে তা পারিব বলিয়াই দেশ ভাগ করিয়া পাকিস্তান বানাইয়াছি। এটাই পাকিস্তান ও অখন্ড ভারতের মৌলিক ও বুনিয়াদী পার্থক্য। অখণ্ড ভারতে হিন্দু মেজরিটি। পাকিস্তানে মুসলিম মেজরিটি। গণতন্ত্রে মেজরিটি শাসন। মুসলমানরাও হিন্দুদের মতই গনতন্ত্রে বিশ্বাসী। কিন্তু গণতান্ত্রিক অখণ্ড ভারতে হিন্দু মেজরিটির শাসনে আমরা মুসলমানরা আস্থা স্থাপন করিতে পারি নাই। আমাদের বিচারে হিন্দুরা ধর্মীয় ব্যাপারে সংকীর্ণ ও সামাজিক ব্যাপারে অনুদার। আমাদের বিবেচনায় এই সংকীর্ণতা ও অনুদারতার দরুন হাজার বছর এক দেশে বাস করিয়াও আমরা এক সমাজ, সুতরাং এক জাতি হইতে পারি নাই। এই কারণে এদের মেজরিটি শাসনে মুসলমানদের সাংস্কৃতিক, সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থ ক্ষুণ্ণ হইবে, এই আশংকা মুসলমানদের ভিত্তিহীন ছিল না। তাই মুসলিম ভারতের নেতা কায়েদে আযম হিন্দু নেতাদেরে বলিলেন : চল, ভারতভূমিতে একটির বদলে দুইটি রাষ্ট্র করি। একটিতে তোমরা শাসন কর, আরেকটিতে আমরা করি। চল, আমরা প্রতিযোগিতা করি, কে কত উদার, কে কেমন গণন্ত্রী, কে কি রকম জাতীয়তাবাদী। এরই নাম পাকিস্তান দাবি। কায়েদে-আযম সারাজীবন এই একই গণতান্ত্রিক জাতীয়তাঁর কথা বলিয়াছেন। পাকিস্তান গণ-পরিষদের উদ্বোধনী বক্তৃতায়ও তিনি সেই কথাই বলিয়াছেন। এই কথাটাই তাঁর রাজনৈতিক আদর্শের শেষ বাণী লাস্ট টেস্টামেন্ট, ওসিয়ত। ওটাই পাকিস্তানী জাতীয়তার মূলসূত্র। নেশন-স্টেট হিসাবে উহাই পাকিস্তানের বুনিয়াদ। এই মূলসূত্র অনুসারে ধর্ম-বর্ণ-জাতি গোষ্ঠী-নির্বিশেষে পাকিস্তানের সকল অধিবাসী হইবে পাকিস্তানী জাতির মেম্বর। পাকিস্তানে ধর্মে-বর্ণে, উচ্চে-নীচে, শরিফে-রযিলে, কালায়-ধলায় কোনও ভেদাভেদ, কোনও অসাম্য থাকিবে না। পাকিস্তান হইবে সাম্যের রাষ্ট্র। জনগণ হইবে এর মালিক। জনগণের সকলে ও প্রত্যেকে হইবে পাকিস্তানের সভারেনটির সমান অংশীদার। এই সাম্যের দিক হইতে পাকিস্তান হইবে ভারতের চেয়ে ত নিশ্চয়ই দুনিয়ার সব রাষ্ট্র হইতেই শ্রেষ্ঠ। এমন রাষ্ট্রকে সকল পাকিস্তানী অন্তর দিয়া ভালবাসিবে। এর নাগরিকতায় গৌরববোধ করিবে। এমন নাগরিকতা কেউ হারাইতে চাহিবেনা। প্রাণের বিনিময়ে তা রক্ষা করিবে। এখানে ধর্মে-ধর্মে কোন বিরোধ থাকিবে না। সম্প্রদায়ে-সম্প্রদায়ে কোন সংঘাত হইবে না। সকল ধর্মবিশ্বাসই হইবে এখানে নিরাপদ। এমনি করিয়া পাকিস্তান হইবে আদর্শ রাষ্ট্র। পাকিস্তানী নেশন হইবে আদর্শ জাতি। পাকিস্তানে এটা করিবার ক্ষমতা আমাদের মুসলমানদের হাতে। কারণ আমরা এখানে মেজরিটি। অখন্ড ভারতে এটা আমরা করিতে পারিতাম না। কারণ সেখানে ছিলাম আমরা মাইনরিটি।
দ্বিতীয়তঃ, পাকিস্তানে আমরা মুসলমানরা পৃথক নেশন থাকিলে এখানকার অমুসলামন মাইনরিটিরাও থাকিবে পৃথক-পৃথক নেশন। তাতে পাকিস্তান সুসংবদ্ধ এক-নেশন-স্টেট থাকিবে না। হইবে অসংবদ্ধ মালটি-নেশনে-টে। জাতিসংঘের মানবাধিকার নীতি বলে তারা আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকার, এমন কি পাকিস্তানের মধ্যে তাদের ন্যাশনাল হোমল্যান্ড দাবি করিতে পারিবে। এতে কি পাকিস্তানের আন্তর্জাতিক বিরোধীদের লীলাভূমি হইয়া উঠিবে না? পাকিস্তানী নেশনের অংশীদার হইতে না পারিলে মাইনরিটিরা কি স্বাভাবিকভাবেই অন্য দেশীয় ধর্মভ্রাতাদের সহিত রাজনৈতিক মিতালি পাতিবার আশকারা পাইবে না? পাকিস্তান রাষ্ট্রের অহিতকামীরা, বিশেষতঃ ভারতের সাম্প্রদায়িকতাবাদী রাষ্ট্রনেতারা, সে পরিস্থিতির সুযোগ গ্রহণ করিবেন না?
