তারপর ধরুন ক্ষমতার কথা। উচ্চ পরিষদের ক্ষমতা নিম্ন পরিষদের সমান থাকিতে পারে; কমও থাকিতে পারে। এমন ব্যবস্থাও করা যাইতে পারে যে উচ্চ পরিষদ নিজেরা কোনও ট্যাক্স বসাইতে বা আইন করিতে পারিবে না। শুধু নিন পরিষদের রচিত আইন বা বসানো ট্যাক্স ঠেকাইয়া পুনর্বিবেচনার জন্য নিম্ন পরিষদে ফেরত পাঠাইতে পারিবে।
ইংলণ্ডের লর্ড-সভার অনুকরণে মনোনীত উচ্চ পরিষদ আর কোনও দেশে নাই। ভবিষ্যতেও হইবে না এটা ধরিয়া নিলাম। বাকী থাকিল পরোক্ষ বা প্রত্যক্ষ নির্বাচনের উচ্চ পরিষদ। যদি আইন পরিষদের মেম্বরদের দ্বারা পরোক্ষ নির্বাচনে উচ্চ পরিষদ হয়, তবে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে মন্ত্রীদের দলের লোকই নির্বাচিত হইবেন। কারণ স্পষ্টতঃই তাঁরাই মেজরিটি। তাতে উচ্চ পরিষদ নিম্ন পরিষদের ছায়া হইবে মাত্র। দৃশ্যতঃই এমন উচ্চ পরিষদের দরকার নাই। আর যদি তা সংকীর্ণ নির্বাচকমন্ডলীর দ্বারা নির্বাচিত হয়, তবে সেটা হইবে আমের চেয়ে আটি বড় করা। গোটা দেশবাসীর নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কাজে বাধা দিবার ক্ষমতা দেশের এক অংশের বা এক শ্রেণীর হাতে তুলিয়া দেওয়া। ক্ষমতায় যদি তাঁরা নিম পরিষদের সমান হন, তবে কথায়-কথায় ডেডলক হইবে। দেশের শাসনকার্য সাবলীল গণতান্ত্রিক উপায়ে পরিচালিত হইবে না। আবশ্যকতার দিক দিয়াও এমন উচ্চ পরিষদের দরকার নাই। প্রথমতঃ, একই ব্যক্তি সব বিষয়ের বিশেষজ্ঞ হইতে পারেন না। বরঞ্চ এক ব্যাপারের বিশেষজ্ঞ লোক অন্য ব্যাপারে একেবারে উখি হওয়ারই সম্ভাবনা বেশি। দ্বিতীয়তঃ বিশেষজ্ঞদের উপদেশ ও সহযোগিতা সরকার সব সময়ই নিতে পারেন। তার জন্য বিশেষজ্ঞদের আইন পরিষদের মেম্বর হওয়ার দরকার নাই।
তারপর অর্ডিন্যান্স ছাড়া অন্য কোনও উপায়ে ত্রস্ত-ব্যস্ততার সাথে আইন পাশ করা আজকাল সম্ভব নয়। খোদ আইন পরিষদের ভিতরেই জনমত যাচাই এর জন্য সার্কুলেশন মোশন আছে; সিলেক্ট কমিটি আছে; জেনারেল ডিসকাশন, ক্লয-বাই ক্লয ডিসকাশন ও থার্ড রিডিং-এর ব্যবস্থা আছে। বাইরে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ সংবাদপত্রের আলোচনা-সমালোচনা আছে। সভা-সমিতির বক্তৃতা-মঞ্চ আছে। এতসব আট-ঘাট পার হইয়া একটা বিল আইনে পরিণত হইতে এক সেশন পার হইয়া আরেক সেশনে চলিয়া যায়। এতে প্রায়শঃ বছর কাল কাটিয়া যায়। ফলে এ-ব্যও আইন পাশ হওয়ার আশংকা আজকাল একরূপ নাই বলিলেই চলে। এর পরেও যদি কখনো এমন কোনও আইন হইয়াই যায়, তবে তাতে বাধা দেওয়ার জন্য হাইকোট-সুপ্রিম কোর্টে রীটের ব্যবস্থা আছে। ভারতে ব্যাংক জাতীয়করণের আইনটিই এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ। এ ব্যাপারে উচ্চ পরিষদ কাজে লাগে নাই। কিন্তু সুপ্রিম কোর্ট কাজে লাগিয়াছে।ফলে, উচ্চ পরিষদ অনাবশ্যক প্রমাণিত হইয়াছে।
তারপর থাকিল ফেডারেল রাষ্ট্রে হোট অংগ-রাজ্যের রক্ষাকবচের কথা। এখানেও উচ্চ পরিষদ অনাবশ্যক হইয়া পড়িয়াছে। সব গণতান্ত্রিক দেশেই আজ দলীয় রাজনীতি কায়েম হইয়াছে। মেম্বাররা দলীয় শৃঙ্খলা মানিয়া চলেন। পার্টি ওয়ারি ভোট দেন। প্রদেশ-ওয়ারি ভোট দেন না। পাকিস্তানেও তাইহইতে বাধ্য। এখানেও নিখিল পাকিস্তান-ভিত্তিক অনেক পার্টি আছে। তাদের মেম্বাররাও পার্টি আনুগত্য অনুসারেই ভোট দিবেন। পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তান-ভিত্তিতে ভোট দিবেন না। কাজেই এখন আর এক অঞ্চলের মেজরিটির দ্বারা অপর অঞ্চলের উপর যুলুম হওয়ার আশংকা নাই। তা ঠেকাইবার জন্য কাজেই উচ্চ পরিষদেরও আবশ্যকতা নাই।
তবু-যে দুনিয়ার সব দেশের পার্লামেন্টে উচ্চ পরিষদ দেখা যায়, সেটাকে ফ্যাশন বা অভ্যাস বলা যাইতে পারে। বিলাতের পার্লামেন্টকে মাদার-অব-পার্লামেন্টস-অব দি ওয়ার্ল্ড বলা হয়। গোড়াতেই ইংলন্ডের হাউস অব-লর্ডসের অনুণেই বিভিন্ন দেশে উচ্চ পরিষদের প্রবর্তন হইয়াছিল। সেটাই আজ অভ্যাসে পরিণত হইয়াছে। কিন্তু ইংলণ্ডে কোনও লিখিত কনস্টিটিউশন না থাকায় কমন্স সভা আইন করিয়া লর্ড সভার ক্ষমতা দিনের পর দিন কাড়িয়া লইতেছে। লিখিত শাসনতন্ত্র দেশে একাজ সহজ হইবে না। শুধু জটিলতা বাড়িবে। ফেডারেল স্টেটে হোট-ঘোট অংগরাজ্যের স্বার্থরক্ষাই বর্তমানে উচ্চ পরিষদ রাখার একমাত্র যুক্তি। শাসনতন্ত্র ফেডারেশন অংগরাজ্যের অধিকারের সীমানির্দেশ করিয়া আদালতকে সে সীমারক্ষার ক্ষমতা দিলেই এই সমস্যার উচ্চ পরিষদের চেয়ে তাল সমাধান হইবে। এই সব কারণে পাকিস্তানে উক্ত পরিষদের দরকার নাই। এর পরেও যদি উচ্চ পরিষদ করা হয়, তবে সেটা হইবে বিনা-কাজে সাদা হাতী পোকা মাত্র। পাকিস্তানের মত গরিব রাষ্ট্র সে বিলাসিতা না থাকাই ভাল।
১২. পাকিস্তানী জাতীয়তাবাদ
প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া তাঁর লিগ্যাল মেওয়ার্কে পাকিস্তান রাষ্ট্রের নাম, প্রিয়েম্বল, ডিরেকটিত প্রিন্সিপলস ও ইসলামী বিধান সম্পর্কে ৫৬ সালের শাসন ও ‘৬২ সালের (সংশোধিত) শাসনতন্ত্রের বিধানসমূহ গণ-পরিষদের জন্য বাধ্যতামূলক করিয়া অন্ততঃ একটি ব্যাপারে পাকিস্তান রাষ্ট্রের ক্ষতি করিয়াছেন। এইসব বিধান পাকিস্তানী নেশন গঠনের বাধা সৃষ্টি করিয়াছে। পাকিস্তান রাষ্ট্রের স্থায়িত্বের দিক হইতে পাকিস্তানী নেশনের ব্যাপারটা গুরুতর সুদূরপ্রসারী প্রশ্ন। এমন ব্যাপারে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার পক্ষে ‘৫৬ সাল ও ‘৬২ সাপের শাসনতন্ত্রের অনুসরণ করা উচিৎ ছিল না। ‘৬২ সালের শাসনতন্ত্র ব্যক্তির দান; গণ-প্রতিনিধিদের দ্বারা রচিত নয়। ‘৫৬ শাসনতন্ত্রের আইন গত বুনিয়াদ ছিল বটে, কিন্তু এটা প্রকৃত অর্থে প্রস্তাবিত ‘৭০ সালের রচিত শাসনতন্ত্রের মত গণতান্ত্রিক পন্থায় রচিত হয় নাই। সার্বজনীন ভোটের প্রত্যক্ষ নির্বাচিত তিন শ’ তেরজন প্রতিনিধির গণ-পরিষদে এবারই প্রথম পাকিস্তানের শাসনন্ত্র রচিত হইতেছে। এই শাসনতন্ত্র পাকিস্তানী নেশনহুডের বুনিয়াদে রচিত না হওয়া খুবই পরিতাপের বিষয় হইবে।
