দুনিয়ার রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ক্রমবিকাশ আলোচনা করিলে দেখা যাইবে যে পার্লামেন্টে একটি উচ্চ পরিষদ সৃষ্টির মূল উদ্দেশ্য দুইটি। এক, গণতন্ত্রের মোটরের ব্রেক, ঘোড়ার লাগাম। দুই, ফেডারেল রাষ্ট্রে হোট-ঘোট অংগরাজ্যের রক্ষাকবচ। পাকিস্তানে প্রধানতঃ পূর্ব-পাকিস্তানের মেজরিটির মোকাবেলায় পশ্চিম-পাকিস্তানের হোট-ঘোট অংগরাজ্যগুলিকে রক্ষা করার উদ্দেশ্যেই দুই চেম্বারের কল্পনা করা হইয়াছিল। পাকিস্তানের শাসনতন্ত্র রচনার ইতিহাস আলোচনা করিলেই তা বোঝা যাইবে। এ ব্যাপারে লিয়াকত আলী, নাফিমুদ্দিন ও মোহাম্মদ আলী এই তিন প্রধানমন্ত্রী শাসনতন্ত্রের তিনটি মূলনীতির প্রস্তাব করিয়াছেন। লিয়াকত আলীর মূলনীতিতে ছিল নিম্ন পরিষদে জনসংখ্যার প্রতিনিধি; উচ্চ পরিষদে পাঁচ প্রদেশের সমান-সমান প্রতিনিধি নাযিমুদ্দিনের ফরমূলায় ছিল দুই চেম্বারই প্যারিটি-ভিত্তিক। এই ব্যবস্থায় পশ্চিম-পাকিস্তানের রক্ষাকবচ ডবল করা হইয়াছিল। মোহাম্মদ আলী-ফরমূলায় ছিল নিম্ন পরিষদ জনসংখ্যার ভিত্তিতে। উচ্চ পরিষদে পাঁচ প্রদেশের প্রত্যেকে দশ জন করিয়া। এতে দুই পরিষদকে সমান ক্ষমতা দেওয়া হইয়াছিল। অধিকন্তু ব্যবস্থা করা হইয়াছিল, দূই পরিষদের যুক্ত বৈঠকে ‘পূর্ব-বাংলা’ ও ‘পশ্চিম যোন’-এর মধ্যে প্যারিটি হইবে। অনাস্থা প্রস্তাবে ও প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে দুই অঞ্চলের প্রত্যেকটির অন্ততঃ শতকরা ত্রিশ জনের ভোট পাইতে হইবে। অবশেষে চৌধুরী মোহাম্মদ আলীর নেতৃত্বেনয়া গণ-পরিষদ ঘাড়ের পিছন ঘুরাইয়া প্যারিটি প্রবর্তনের বদলে সোজাসুজি প্যারিটি ভিত্তিক এক চেম্বারের পার্লামেন্ট করিলেন।
এই বিশ্লেষণে বোঝা গেল যে পাকিস্তানের রাষ্ট্রনেতারা বরাবরই দুই অঞ্চলের প্রতিনিধিত্বে সংখ্যা-সাম্য রাখার পক্ষপাতী ছিলেন। পূর্ব-বাংলার মেজরিটির উপর একটা চেক। শুধু নাযিমুদ্দিন-ফরমূলাতে আরও একটা বেশি চেকের ব্যবস্থা ছিল। ঐ ফরমূলায় নিম্ন পরিষদের দুই অঞ্চলের প্রতিনিধিত্বে প্যারিটি থাকা সত্ত্বেও একটা প্যারিটি-ভিত্তিক উচ্চ পরিষদ রাখা হইয়াছিল। পূর্ব-বাংলার মেজরিটি চেক করা ছাড়াও তাতে আরেকটা উদ্দেশ্য ছিল। সেটা গণতন্ত্রের মুখে লাগাম।
রাষ্ট্র বিজ্ঞানীরা বলিয়া থাকেন, উচ্চ পরিষদ গণতন্ত্রের মোটরের চাকার ব্রেক, ঘোড়ার লাগাম। এটার দরকার আছে। গণতন্ত্র সাধারণতঃ দ্রুত সংস্কারকামী। কারণ ‘স্টেটাস কো’, প্রচলিত সমাজ ও আর্থিক ব্যবস্থা, অনেক ক্ষেত্রেই জনগণের স্বার্থ বিরোধী। তাই জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধিরা বিপ্লবাত্মক আইন করিয়া অতি দ্রুত সংস্কার সাধন করিতে চান। এতে ক্রন্ত-ব্যস্ততার দরুন অনেক সময় ভুল ও অনিষ্টকর আইন করা হইয়া যায়। উচ্চ পরিষদ এই বেপরোয়া আইন-কানুন ধীরে সুস্থে বিচার-বিবেচনা করিয়া ওগুলির ভালমন্দ দেখিতে ও দেখাইতে পারেন। এক কথায় নিজ গণতন্ত্রের দ্রুত গতি একটু মন্থর করিয়া দেওয়াই উচ্চ পরিষদের কাজ। নাযিমুদ্দিন সাহেবের ফরমূলা এই কাজটিও করিতে চাহিয়াছিল। তিনি দুই অঞ্চলের প্যারিটি করিয়া পূর্ববাংলার মেজরিটি চেক করিয়াছিলেন এবং উচ্চ পরিষদ দিয়া গোটা পাকিস্তানের গণতন্ত্রের ঘোড়ার মুখে লাগাম লাগাইবার ব্যবস্থা করিয়াছিলেন। এটাও দোষের ছিল না। এই উদ্দেশ্যে উচ্চ পরিষদ গঠন করার রেওয়াজ সারা দুনিয়াতেই আছে তবে এটা বোঝা গেল যে এক নাযিমুদ্দিন-ফরমূলা ছাড়া আর কোনও ফরমূলায় দুই অঞ্চলের সংখ্যা-সাম্য ব্যতীত উচ্চ পরিষদের আর কোনও উদ্দেশ্য ছিল না। তা যদি তাঁরা চাহিতেন, তবে প্রাদেশিক পরিষদেও দুই চেম্বারের ব্যবস্থা করিতেন। আমাদের প্রতিবেশী ভারতে এবং বন্ধু রাষ্ট্র আমেরিকায় অনেক অংগ-রাজ্যেই দুই চেম্বারের পরিষদ আছে।
এখন এই দুই শ্রেণীর উচ্চ পরিষদের মধ্যে প্রথমটির আলোচনা করা যাক আগে। বোঝা গেল অবাধ গণতন্ত্র পূর্ণ অবস্থার অভাবেই গোড়াতে উচ্চ পরিষদের প্রবর্তন হইয়াছিল। উচ্চ পরিষদ ছাড়া পার্লামেন্টকে তখন সত্যই ব্রেকহীন মোটর ও লাগামহীন ঘোড়া মনে করা হইত। ধরিয়া লওয়া যাক, গণতন্ত্রের বিকাশের প্রাথমিক স্তরে এটার দরকার ছিল। নব-লব্ধ স্বাধীন ক্ষমতার অতি উৎসাহে ভুল করা অসম্ভব ছিল না। মাথার উপরে উচ্চ পরিষদের মত একটা প্রবীণ মুরুব্বির না হয় তখন দরকার ছিল। কিন্তু আজও কি দরকার আছে? সব সভ্য দেশেই এর প্রচলন দেখিয়া মনে হইবে, বোধ হয় আজও দরকার আছে। কাজেই ব্যাপারটা একটু তলাইয়া দেখা দরকার।
দুই দিক হইতে এর বিচার করা যাইতে পারে। এক, কিভাবে উচ্চ পরিষদ গঠিত হইবে। দুই, তার ক্ষমতা কতটুকু থাকিবে? গঠন-পদ্ধতির কথাই আগে ধরা যাউক। এর আকার যে ছোট হইবে, এটা ধরিয়া লওয়া যায়। প্রশ্ন এই, এটা নির্বাচিত হইবে কি না? নির্বাচিত হইলে প্রত্যক্ষ না পরোক্ষ ভোট হইবে? নির্বাচিত না হইয়া মনোনীত হইতে পারে। যথা : ইংলণ্ডে লর্ড সভা। ওতে নির্বাচন নাই। ওটা বংশানুক্রমিকও। রাজা যদি কাউকে লর্ড পদবি দেন, তবে তিনিও লর্ড সভার মেম্বর হইবেন। নির্বাচিত উচ্চ পরিষদ যদি পরোক্ষ নির্বাচনে হয় তবে নিম্ন পরিষদ সদস্যদের ভোটে অথবা উভয়ের যুক্ত ভোটে হইতে পারে। যদি প্রত্যক্ষ ভোটে হয়, তবে ভোটারদের ও প্রার্থীদের এলাকা সংকীর্ণ করিয়া তা করা যাইতে পারে। যেমন ধরুন, শুধূ আয়করদাতারাই ভোটার হইবেন। আর বিজ্ঞানী, দার্শনিক, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, অধ্যাপক, শিক্ষক প্রভৃতি বিশেষজ্ঞরাই প্রার্থী হইতে পারিবেন।
