প্রথম গণ-পরিষদে বাংলার প্রতিনিধি ছিলেন ৪৪ জন, পশ্চিম-পাকিস্তানের ছিলেন ২৮ জন। তবু ঐ গণ-পরিষদ পশ্চিম-পাকিস্তানীদের মতের বিরুদ্ধে নিজেদের সংখ্যাগুরুত্ব খাটায় নাই। বরঞ্চ এত উদার নিখিল-পাকিস্তানী মনোভাব দেখাইয়াছে যে তাতে পূর্ব-বাংলার ন্যায্য হকও কোরবানি হইয়া গিয়াছে।
তাছাড়া দুই উইং-এর মধ্যে মেজরিটি-মাইনরিটি কমপ্লেক্স দূর করিবার জন্যই প্রতিনিধিত্বের প্যারিটি হওয়া দরকার। মেজরিটি ও মাইনরিটি কমপ্লেক্সে উইং-এর জন্য পৃথক-পৃথকভাবে এবং পাকিস্তানের জন্য সামগ্রিকভাবে অনিষ্টকর। অতীতে পূর্ব-পাকিস্তানীদের এই মেজরিটি কমপ্লেক্স তাদের আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসনের গুরুত্ব বুঝিতে দেয় নাই। পূর্ব-পাকিস্তানী মুসলিম লীগ নেতারা বলিতেন, বিশ্বাসও করিতেন : ‘করাচি বসিয়াই আমরা সারা পাকিস্তান শাসন করিব, ঢাকায় ক্ষমতা আনিবার দরকার কি?’ বস্তুতঃ জনসংখ্যা ভিত্তিক প্রতিনিধিত্ব পুনঃপ্রবর্তিত হওয়ার সাথে-সাথে অনেক পশ্চিম-পাকিস্তানী নেতা এই কথাটাই বলা শুরু করিয়াছেন। অথচ পূর্ব-পাকিস্তানের পূর্ণ স্বায়ত্তশাসনের প্রয়োজন রাজনৈতিক কারণে নয়, ভৌগোলিক কারণে। মেজরিটি-কমপ্লেক্স-ওয়ালারা এটা বুঝিতে পারেন নাই। এই মেজরিটি-কমপ্লেক্সের প্রতিক্রিয়ায় পশ্চিম-পাকিস্তানী নেতাদের মধ্যে একটা মাইনরিটি-কপ্লেক্স সৃষ্টি হইয়াছে। এই কমপ্লেক্স তাদের মধ্যে নাহক, কিন্তু স্বাভাবিক, এটা পূর্ব-বাংলা-বিরোধী মনোভাব সৃষ্টি করিয়াছে। ফলে পূর্ব-পাকিস্তানের প্রতি জ্ঞাতে-অজ্ঞাতে পশ্চিমা শাসকরা হাইল হইয়াছেন। পূর্ব-পাকিস্তানের সমস্ত দূর্গতি পশ্চিম-পাকিস্তানী নেতাদের এই মনোভাবের ফলে। পূর্ব-বাংলার মেজরিটিই পশ্চিমা ভাইদের মধ্যে ঐ মনোভাবের স্রষ্টা।
অথচ পূর্ববাংলার এই মেজরিটি এ অঞ্চলের কোনও কাজে অতীতেও লাগে নাই, ভবিষ্যতেও লাগিবে না। এই মেজরিটির জোরে আমরা পাকিস্তানের রাজধানী ও দেশরক্ষা বাহিনীর হেড কোয়ার্টার কার্যতঃ পূর্ব-পাকিস্তানে আনিতে পারিনা। বস্তুতঃ পাকিস্তানীদের মতে কোন কিছুই করিতে পারিব না। এমনকি ভোটের জেরে শাসনও রচনা করিতে পারি না। পশ্চিমা ভাইদের সম্মতিই যদি অপরিহার্য হয়, অবে মেজরিটি আমাদের কোন কাজে লাগিবে?
আরেক দিক হইতে দুই উইং-এ প্রতিনিধিত্বের প্যারিটি হওয়া আবশ্যক। এটা দুই উইং-এর প্রতিনিধিত্বের চিরস্থায়ী নিশ্চয়তা। জনসংখ্যা পরিবর্তনশীল। জনসংখ্যার ভিত্তিতে দুই উইং-এর প্রতিনিধিত্ব থাকিলে সেটাও হইবে পরিবর্তনশীল। তার মানে অনিশ্চয়তা। সুস্পষ্ট কারণেই দুই উইং-এর মধ্যে গণতন্ত্রের মামুলি নিয়ম চলিতে পারে না। প্রতিনিধিত্বের অনিশ্চয়তা দুই উইং-এর সম্পর্কেও অনিশ্চয়তা ও তিক্ততা সৃষ্টি করিতে পারে। যার-তার সংখ্যাবৃদ্ধির প্রতিযোগিতায় অসাধু পন্থা গ্রহণ করিতে পারে। সত্য-সত্যই যদি তা না-ও হয়, তবু আন্তঃআঞ্চলিক সন্দেহ ও তিক্ততা বাড়িবে। পশ্চিম-পাকিস্তানের আয়তন অনেক বেশি। মাইল-প্রতি বসতি কম। কাশ্মির, সীমান্ত এলাকা ও ভারত হইতে আগত লোক-সমাগমে যদি ভবিষ্যতে পশ্চিম-পাকিস্তানের লোসংখ্যা বাড়িয়াও যায়, তবু সেন্সাস রিপোর্টের সত্যতা সম্বন্ধে পূর্ব-পাকিস্তানীরা ভুল বুঝিতে পারে। আগামী শাসনতন্ত্রে সেন্সাস যদি ফেডারেশনের বিষয় থাকে, তবে সেন্সাস কমিশনের হেড অফিস ও অফিসাররা পশ্চিম পাকিস্তানে অবস্থিত হইবেন এবং চূড়ান্ত সংখ্যা প্রকাশের ক্ষমতাও তাঁদের হাতেই থাকিবে। পক্ষান্তরে সেন্সাস যদি অংগ-রাজ্যের বিষয় হয়, তবে দুই উইং-এর সেন্সাসেই মেনিপপালেশন হইতে পারে। ফলে কেউ কারোটা বিশ্বাস করিবে না। এইভাবে ভুল বুঝাবুঝির সম্ভাবনা রহিয়াছে। তাছাড়া সত্য-সত্যই যদি পূর্ব-পাকিস্তান লোকসংখ্যায় মাইনরিটি হইয়া যায় তবে সে অবস্থায় বর্তমানে পূর্ব-পাকিস্তানের একমাত্র শক্তি যে সংখ্যাধিক্য তারও অবসান হইবে। সকলদিক হইতে পূর্ব পাকিস্তানীরা অসহায় হইয়া পড়িবে। সে উপায়হীনতা আমাদের বরাতে অনেক বিপদ আনিতে পারে। কি কি বিপদ-হইতে পারে তা চোখে আংগুল দিয়া দেখাইবার দরকার নাই। পাঠকগণ তা অনুমান করিতে পারেন।
১১. এক চেম্বার না দুই চেম্বার?
জনসংখ্যার ভিত্তিতে কেন্দ্রীয় পরিষদ গঠিত হইতে যাইতেছে। তাই প্রশ্ন উঠিয়াছেঃ এক চেম্বার, না দুই চেম্বার? প্রশ্নটা উঠিয়াছে স্বাভাবিকভাবেই। পাকিস্তানের দুই অঞ্চলের প্রতিনিধিত্বের প্যারিটি যখন উঠিয়া গিয়াছে তখনই ধরিয়া নেওয়া হইয়াছে, দুই চেম্বারের পার্লামেন্ট হইতে হইবে। সভ্য জগতের বড়-বড় প্রায় সব দেশেই দুই চেম্বারের পার্লামেন্ট প্রচলিত আছে। ফেডারেল পদ্ধতির রাষ্ট্রে ত আছেই,ইউনিটরি পদ্ধরি রাষ্ট্রও আছে। তাই অনেকে ধরিয়া লইয়াছেন যে পাকিস্তান যখন ফেডারেল রাষ্ট্র তখন এরও পার্লামেন্ট দুই কক্ষ-বিশিষ্ট হইতে বাধ্য। এই দিক দিয়া কথাটা দৃশ্যতঃ ন্যায়সংগত। তাই এটা প্রধানতঃ পশ্চিম পাকিস্তানী নেতাদের কথা হইলেও পূর্ব-পাকিস্তানের কোনও-কোনও নেতাও এর সমর্থন করিতেছেন। এক চেম্বারের পার্লামেন্টে পূর্ব-পাকিস্তানীদের নিরংকুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকিবে। সেই মেজরিটির জোরে তারা দেশের শাসন ব্যাপারে পশ্চিম-পাকিস্তানীদের উপর অবাধ কর্তৃত্ব করিবে। এই ভয় হইতেই পশ্চিম-পাকিস্তানী নেতারা দুই পরিষদের কথা তুলিয়াছেন এটা কারো-কারো জন্য সত্য হইলেও সকলের জন্য সত্য নয়। দুনিয়ার সব ফেডারেল রাষ্ট্রেই দুই চেম্বারের পার্লামেন্ট আছে যে কারণে, ঠিক সেই কারণেই তাঁরাও দুই চেম্বারের কথা বলিতেছেন, এটা ধরিয়া লওয়া যাইতে পারে। আর যদি এটাও সত্য হয় যে পশ্চিম-পাকিস্তানী নেতারা পূর্ব-পাকিস্তানের মেজরিটি চেক করিবার উদ্দেশ্যেই দুই চেম্বারের কথা ভাবিতেছেন, তবু তাঁদের দোষ দেওয়া যায় না। কারণ, ফেডারেল রাষ্ট্রে বড় অংগরাজ্যের যুলুম হইতে ছোট অংগরাজ্যগুলিকে বাঁচাইবার রক্ষাকবচ হিসাবেই দুই চেম্বারের বিধান করা হইয়াছে।
