পাকিস্তানের স্থায়িত্বের সবচেয়ে গ্যারান্টি দুই অঞ্চলের জনগণের সমান শরিকানার মনোভাব। যেদিন উভয় অঞ্চলের জনগণের প্রত্যেকে অনুভব করিবে : পাকিস্তান আমার সম্পদ; এতে আমাদের সমান অধিকার, সেইদিনই রাষ্ট্র হিসাবে পাকিস্তান এবং জাতি হিসাবে পাকিস্তানীরা অক্ষয় হইয়া যাইবে। গত তেইশ বৎসরে আমরা এই মনোভাবটিই সৃষ্টি করিতে পারি নাই। সৃষ্টি হইতে দেই নাই বলিলেই ঠিক কথা বলা হইবে।
আমাদের ভৌগোলিক দূরত্ব, ভাষা-কৃষ্টি, গোষ্ঠী ও ঐতিহ্যের স্বাতন্ত্রের দরুন আমাদের জাতীয় ঐক্য-বোধ সহজাত নয়। আমাদের নেশনহুড আপ্রায়রি নয়। এটা ইতিহাসের ওয়ারিসি নয়। আমরা আগেই রাষ্ট্র গড়িয়াছি। পরে রাষ্ট্রীয় জাতীয়তা গড়িতেছি। এটা আমাদের তৈয়ার করিয়া নিতে হইবে। সেজন্য আমাদের মধ্যে একটা সার্বিক ও সার্বজনীন আমরা চৈতন্য ও আমাদের বোধ সৃষ্টি করিতে হইবে। তার প্রথম পদক্ষেপ হইবে আমাদের দুই উইং-এর মধ্যে সাম্য ও সমতার নিশ্চিত, নিরাপদ ও অপরিবর্তনীয় অনুভূতি। উর্দু ও বাংলাকে সমান মর্যাদার দুইটি রাষ্ট্রভাষা করিয়া আমরা এই সমতাবোধ সৃষ্টির চমৎকার শুভ সূচনা করিয়াছি। এই সমতা বোধকে সম্পূর্ণ ও স্থায়ী করিতে হইলে আমাদের জাতীয় ও রাষ্ট্রীয় জীবনের সকল ক্ষেত্রে দুই উইং-এর জনগণকে সমান অধিকারী ও ক্ষমতাবান হইতে হইবে। এটা হইতে পারে কেন্দ্রীয় সরকার পরিচালনে, দেশরক্ষায়, পার্লামেন্টে আইন প্রণয়নে, এক কথায়, রাষ্ট্রশাসনের সামগ্রিকতায়, দুই অঞ্চলের সমতা সুস্পষ্ট ও নিশ্চিত করিয়া। এ সুস্পষ্টতা ও নিশ্চয়তা দিতে পারে শুধু শাসনতান্ত্রিক বিধান।
শাসনতান্ত্রিক বিধান ছাড়াই কতকগুলি কনভেনশন গড়িয়া উঠিতেছিল। পার্লামেন্টারি পদ্ধতি ব্যাহত না হইলে আরও হইত। যথা : প্রেসিডেন্ট ও প্রাইম মিনিস্টার পর্যায়ক্রমে দুই উইং হইতে হওয়া, কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভায় দুই উইং হইতে সমান সংখ্যক মন্ত্রী নেওয়া ইত্যাদি কনভেনশন গড়িয়াই উঠিয়াছিল। তবু শাসনতান্ত্রিক বিধানের দ্বারা এইগুলি এবং প্রেসিডেন্ট ও ভাইস প্রেসিডেন্ট, প্রাইম মিনিস্টার ও ডেপুটি প্রাইম মিনিস্টার অপর উইং হইতে লইবার নিশ্চিত ও তর্কাতীত ব্যবস্থা করা যাইতে পারে। কেন্দ্রীয় চাকরি-বাকরিতেও তেমনি করা যাইতে পারে। করা উচিত।
কিন্তু তাতেই আমাদের সমস্যা মিটিবে না। এ সবের সাথে দুই উইং-এর মধ্যে আর্থিক বন্টনে সমতাও আনিতে হইবে। পাকিস্তানের রাজধানীসহ সমস্ত কেন্দ্রীয় সংস্থা ও বিদেশী মিশনাদি পশ্চিম-পাকিস্তানে অবস্থিত। দুই অঞ্চলের মধ্যে মবিলিটি অব-লেবার-ক্যাপিটাল না থাকায় ঐ সবের খরচের সুবিধা শুধু পশ্চিম-পাকিস্তান পাইতেছে। দুই অঞ্চলের আর্থিক অসাম্যের মূল কারণ এই। এইসব ব্যয় যাতে দুই অঞ্চলের সমান অংশ থাকে, তার নিশ্চিত ব্যবস্থা করিতে হইবে। এই উদ্দেশ্যে অনেকে রাজধানী ঢাকায় আনার দাবি করেন। এ দাবি অন্যায় নয়। কিন্তু ঢাকায় রাজধানী হইলে ঐ একই কারণে পশ্চিম-পাকিস্তানীরা কেন্দ্রীয় ব্যয়ের আয় হইতে বঞ্চিত হইবে। এই অসুবিধা দূর করার জন্য অনেকে কুড়ি বছরের জন্য ঢাকায় রাজধানী আনিতে চান। তার মানে, কুড়ি বছর পরে রাজধানী আবার পশ্চিম-পাকিস্তানে যাইবে। স্পষ্টতঃই এটা স্থায়ী ব্যবস্থা নয়। কাজেই অবাস্তব ও অযৌক্তিক। কায়েদে আযমের করাচিতে রাজধানীকে চিরস্থায়ী করিয়া এবং উপকূল বাণিজ্য জাতীয়করণ ও নিম্নশ্রেণীর ভাড়া সাবসিডাইযড করিয়া জনগণের স্তরে জাতীয় সংহতি প্রসারিত করিলে রাজধানীর তর্ক স্থায়ীভাবে মিটিয়া যাইবে। আর কেন্দ্রীয় সরকারের সাকূল্য ব্যয় দুই অঞ্চলের মধ্যে সমানভাবে বিতরণের শাসনতান্ত্রিক ব্যবস্থা করিলেই দুই উইং-এর আর্থিক অসাম্যের মূল কারণ দূর হইবে। এটা করা সম্ভব। শাসনতান্ত্রিক বিধানের বলে শাসনযান্ত্রিক সংস্কারই এই পন্থা। পাকিস্তানের স্থায়িত্ব ও নিরাপত্তার খাতিরে কোনও ব্যবস্থাই দুঃসাধ্য বিবেচিত হওয়া উচিৎ নয়।
কিন্তু এ সবই সম্ভব দুই ‘উইং’-এর বোঝা পড়া ও আদান-প্রদানের মধ্যে দিয়া। দুই অঞ্চলের এই সার্বিক সমতা আনিতে হইলে পশ্চিম-পাকিস্তানীরা হয়ত প্যারিটি নয়ত উচ্চ-পরিষদের মাধ্যমে পার্লামেন্টের প্রতিনিধিত্বের সমতা চাহিবেন। এটা অসংগত দাবিনয়। পূর্ব-পাকিস্তানীদের উচিত উপরোক্ত শর্তে এই দাবি মানিয়া লওয়া। আমার দৃঢ় বিশ্বাস তারা মানিবেও। ১৯৫৫ সালে পূর্ণ আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন ও সর্বক্ষেত্রে প্যারিটির বিনিময়ে প্রতিনিধিত্বের প্যারিটিতে রাযী হইয়া হক সাহেব ও সুহরাওয়ার্দী সাহেব পাঁচদফা মারী চুক্তিতে দস্তখত করিয়াছিলেন। সার্বিক প্যারিটি ও পূর্ণ আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন দিয়া সেই চুক্তির পশ্চিম পাকিস্তানী অংশ রক্ষিত হয় নাই বলিয়াই পূর্ব-পাকিস্তানীদের কেউ-কেউ এতদিন পরে জনসংখ্যা ভিত্তিক প্রতিনিধিত্ব দাবি করিয়াছে। পূর্ব-বাংলার মেজরিটির বিনিময়ে যদি পশ্চিম-পাকিস্তানীরা এবার উপরে-বর্ণিত ব্যবস্থা করিয়া দুই অঞ্চলের মধ্যে স্থায়ী সমতা স্থাপন করিতে রাযী হয়, তবে পূর্ব-পাকস্তানীরা নিশ্চয় তাদের মেজরিটি, ত্যাগে সম্মত হইবে। কারণ পূর্ব পাকিস্তানীরা তাদের মেজরিটি দিয়া পশ্চিম-পাকিস্তানের উপর প্রাধান্য করিতে চায় না, নিজেদের স্বার্থ রক্ষা করিতে চায় মাত্র। পশ্চিম-পাকিস্তানীদের সম্মতিতে সেসব স্বার্থ যদি শাসনতন্ত্রে সুরক্ষিত হইয়া যায়, তবে মেজরিটি দিয়া পূর্ব-পাকিস্তানীরা কি করিবে?
