কিম্বা ডাঃ ইকবাল বা চৌধুরী রহমত আলীর প্রস্তাবমত যদি পাকিস্তান শুধু পশ্চিম ভারতেই হইত তবু সেটা হইত স্বায়ত্তশাসিত প্রদেশসমূহের সময়ের ফেডারেশন। কস্টিটিউয়েন্ট ইউনিটগুলি হইত অটমাস ও সভারেন। দুই এর বদলে এক পাকিস্তান হওয়ায় দুই কোণে দুই স্বায়ত্তশাসিত ইউনিট হইয়াছে। পূর্ব-পাকিস্তানকে এক করিয়াছে ভূগোল। পশ্চিম-পাকিস্তানকে এক করিতে পারে লাহোর প্রস্তাব। কাজেই পশ্চিমা ভাইএরা লাহোর প্রস্তাবের নাম শুনিলেই যে আঁতকিয়া উঠেন, এটা তাঁদের আহমকি।
পক্ষান্তরে মাইনরিটি প্রদেশের অনেকের আশংকা যোনাল ফেডারেশন হইলে প্রদেশগুলির স্বায়ত্তশাসনের কোনও বিষয়ই থাকিবে না। এটা তাঁদের ভূল। ১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইনে প্রদেশগুলি ছিল স্বায়ত্তশাসিত। সাব-ফেডারেশন হওয়ার পরেও ‘৩৫ সালের প্রাদেশিক তালিকার বিষয়গুলি তাদের ত থাকিবেই, আরও কিছু বেশিও থাকিতে পারে। এই প্রসংগে বিষয়গুলির বিচার করা যাক।
১৯৩৫ সালের আইনে ফেডারেল তালিকায় ছিল ৫৯টি, কারেন্ট তালিকায় ৩৬টি ও প্রাদেশিক তালিকায় ৫৪টি। ‘৫৬ সালের শাসনতন্ত্রে ফেডারেল তালিকায় ছিল ৩০টি, কারেন্ট তালিকায় ১৯টি ও প্রাদেশিক তালিকায় ৯৪টি। আইউবী। শাসনতন্ত্রে শুধু ফেডারেল তালিকায় ছিল ৪৯টি। বাকি সবই ছিল প্রাদেশিক। এই তিনটি শাসনতন্ত্রের তালিকা বিচার করিলে দেখা যাইবে যে মোট বিষয়ের সংখ্যা মোটামুটি ১৫০। এর মধ্যে ৫৬ সালের শাসনতন্ত্রেই সবচেয়ে কম সংখ্যা ৩০ কেন্দ্রে রাখিয়াছে। আমাদের নয়া শাসনতন্ত্র হইবে পূর্ণ আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন ভিত্তিক। তাতে সর্বসম্মত তিনটি বিষয়ের সাথে প্রয়োজনীয় আরও তিন-চারটি যোগ করিলেও সাতটির বেশি ফেডারেল বিষয় হইবে না। বাকি ১৪৩টি বিষয়ের মধ্যে সর্বাপেক্ষা বেশিসংখ্যক প্রাদেশিক বিষয় যে ‘৫৬ সালের ১৪টি, তাই প্রদেশগুলিকে দিলেও সাব-ফেডারেশনের ভাগে পড়িবে ৪৯টি। এর সাথে আরেকটি বিষয় সাব ফেডারেশন তালিকায় আসিবে। সেটি সাব-ফেডারেশনের সর্বোচ্চ আদালত সুপ্রিম কোর্ট। এটি হইবে পশ্চিম পাকিস্তানের বিভিন্ন প্রাদেশিক হাইকোর্টের আপিল আদালত।
সে অবস্থায় নিখিল-পাকিস্তান ফেডারেশনের সর্বোচ্চ আদালতের নাম হইবে ফেডারেল কোর্ট। এই অঞ্চলের দুইটি সুপ্রিম কোর্ট হইতে আপিল আসিবে পাকিস্তান ফেডারেল কোর্টে। তাছাড়া এটি হইবে শাসনতান্ত্রিক আদালত।
অতএব দেখা গেল যে পূর্ণ আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন-ভিত্তিক পাকিস্তান ফেডারেশনের স্বার্থে পশ্চিম-পাকিস্তানে একটি যোনাল ফেডারেশন হওয়া অপরিহার্য এবং প্রদেশগুলির স্বায়ত্তশাসন বজায় রাখিয়াও সেটা করা সম্ভব।
বলা যাইতে পারে পশ্চিম পাকিস্তানে যোনাল ফেডারেশন না করিয়াও ত পূর্ব-বাংলার পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন দাবি পূরণ করা যায়। তা যদি হয়, তবে পশ্চিমে যোনাল ফেডারেশন হইল কি হইল না, তা লইয়া পূর্ব-বাংগালীদের মাথা ব্যথা কেন? হ, এটা একটা অল্টারনেটিভ বটে। দুই উইং-এ ‘প্রদেশ’ থাকিল পাঁচটাই। কিন্তু পূর্ব বাংলা প্রদেশকে পশ্চিমা দেশগুলির চেয়ে অনেক বেশি স্বায়ত্তশাসন দেওয়া হইল। এতে কি আপত্তি আছে? আপত্তি দুইটা। এক, পূর্ব বাংলার গ্রহণযোগ্য-মাফিক স্বায়ত্তশাসন দিতে হইলে সেটা নামে প্রাদেশিক হইলেও কাজে আঞ্চলিক হইতে হইবে। পূর্ব-বাংলার দাবিমত সেটা ফেডারেল তিনটি বিষয় ছাড়া আর সব। দুই, এইভাবে দুই অঞ্চলের প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসনের পরিমাণে এত পার্থক্য থাকিলে কেন্দ্রীয় সরকারের ক্ষমতা, রাজ, বাজেট ও কেন্দ্র-প্রদেশের সম্পর্কে এত জটিলতা দেখা দিবে যে তাতে পাকিস্তানের ঐক্য ও নিরাপত্তা বিপন্ন হইতে বেশি দিন লাগিবে না। নেতারা পরীক্ষা করিয়া দেখিতে পারেন।
১০. প্যারিটি বনাম জনসংখ্যা
আগেই বলিয়াছি, পশ্চিম-পাকিস্তানে ওয়ান ইউনিটের বিরুদ্ধে যেরূপ আন্দোলন হইয়াছিল, পূর্ব-পাকিস্তানে প্যারিটির বিরুদ্ধে তেমন কোনও আন্দোলন ছিল না। পূর্ব পাকিস্তানের জনপ্রিয় পার্টিসমূহের কোন একটিরও মেনিফেস্টোতে প্যারিটি-বিরোধী কোনও দফা ছিল না। আজও নাই। এটা ঐতিহাসিক সত্য যে পূর্ব-পাকিস্তানের সংখ্যা-গুরুত্ব কাটিয়া যেদিন বড়লাটের অর্ডিন্যান্স-বলে প্রতিনিধিত্বে দুই অঞ্চলের মধ্যে প্যারিটি প্রবর্তিত হয়, সে দিন পূর্ব-বাংলার জনমত ত দূরের কথা আইন পরিষদের মতও নেওয়া হয় নাই।
তবু শেষ পর্যন্ত আঞ্চলিক পূর্ণ-স্বায়ত্তশাসন, যুক্ত-নির্বাচন, বাংলা রাষ্ট্রভাষা ও কেন্দ্রীয় সর্ব-ব্যাপারে প্যারিটির স্বীকৃতির বিনিময়ে প্রতিনিধিত্বের প্যারিটি পূর্ব-বাংলা মানিয়া লইয়াছিল। শেষ পর্যন্ত লাহোর-প্রস্তাব-ভিত্তিক দুই অঞ্চলের পূর্ণ অটনমি ও সমতার অন্যতম নিদর্শন হিসাবে প্রতিনিধিত্বের প্যারিটিকে নীতি হিসাবেই মানিয়া নেওয়া হইয়াছিল। প্যারিটি চলিত থাকার দশ বছরের মধ্যে কেন্দ্রের দ্বারা পূর্ব-বাংলার উপর অত-সব অন্যায় অবিচারের মধ্যেও পূর্ব-পাকিস্তানীরা শুধু পূর্ণ আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন ও চাকরি-বাকরিসহ সকল ব্যাপারে সমান অধিকারই দাবি করিয়াছে। কোনও নেতা বা পার্টিই প্রতিনিধিত্বে সংখ্যাগুরুত্ব দাবি করেন নাই।
প্যারিটি যদি শুধু পূর্ব-পাকিস্তানীদের মেজরিটি নষ্ট করিবার উদ্দেশ্যেই করা হয়, তবে স্পষ্টতঃই তাতে কেউ রাযী হইতে পারেন না। পাকিস্তানের রাজধানীসহ কেন্দ্রীয় সমস্ত শক্তি ও অর্থ-সংস্থাই পশ্চিম-পাকিস্তানে অবস্থিত। এ অবস্থায় জনসংখ্যাই পূর্ব পাকিস্তানের একটিমাত্র শক্তি। পাকিস্তানের বয়সের তেইশটি বছরে পূর্ব পাকিস্তান তার এই সংখ্যা শক্তি নিজের কাজে লাগায় নাই। গোটা পাকিস্তানের নামে কার্যতঃ পশ্চিম-পাকিস্তানের খেদমতেই লাগাইয়াছে। পশ্চিম-পাকিস্তানের নেতারা তার বদলা দিবেন দূরের কথা, কৃতজ্ঞতাও স্বীকার করেন নাই। বরঞ্চ সেন্সেশনের এলম লাগাইয়াছেন। তথাপি যদি পাকিস্তানের স্বার্থে পুনরায় প্যারিটি প্রবর্তনের দরকার হয়, তবে পূর্ব-পাকিস্তানীরা তা মানিতে আবার রাযী হইবে। কিন্তু সে পাকিস্তানের স্বার্থ মানে পূর্ব-পাকিস্তানের স্বার্থও বুঝিতে হইবে। এই দিক হইতে বিষয়টার বিচার করা যাউক।
