এতে দেখা গেল যে পশ্চিম-পাকিস্তানের সবগুলি দেশীয় রাজ্য পশ্চিম পাকিস্তানে ওয়ান ইউনিট গঠনের পর পাকিস্তান সরকারের সাথে চুক্তিপত্র স্বাক্ষর করিয়া পশ্চিম-পাকিস্তান প্রদেশের সহিত সংযুক্ত হইয়াছিল। এখন ওয়ান ইউনিট ভাংগিবার পর অন্যান্য প্রদেশের মতই তারাও আইনতঃ পূর্ব অবস্থায় ফিরিয়া গিয়াছে। অতঃপর তারা ইচ্ছা করিলে নিজ-নিজ স্বাতন্ত্র রক্ষাও করিতে পারে। অথবা তাদের ইচ্ছামত ও পঙ্গমত ভিন্ন ভিন্ন প্রদেশের সাথে সংযুক্ত হইতে পারে। যাই করুক, নূতন চুক্তিপত্র স্বাক্ষর করিয়া নূতন-নূতন আইন করিতে হইবে। এতে সমস্যা ও জটিলতা বাড়িবে। অথচ যদি সাব-ফেডারেশনরূপে পশ্চিম-পাকিস্তান ইউনিট বজায় থাকে তবে পূর্ব চুক্তি মোতাবেক তারা এক ইউনিটের শামিল থাকিয়া যাইবে। নতুন জটিলতা বা সমস্যার সৃষ্টি হইবে না।
(২) ফেডারেল রাজধানী করাচি হইতে পিণ্ডি স্থানান্তরিত করার পর করাচি শহরকে পশ্চিম-পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত করা হইয়াছিল। কোনও একটি প্রদেশের সাথে সংযুক্ত করা হয় নাই। এক ইউনিট ভাংগার পর কাচির অধিকার লইয়া তর্ক উঠিয়াছে। যদিও প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া তাঁর সর্বশেষ ঘোষণায় করাচিকে সিন্ধু প্রদেশের অন্তর্ভুক্ত করিয়া দিয়াছেন, তবু এটাকে চূড়ান্ত মীমাংসা বলা যায় না। ফেডারেল ক্যাপিটালকে কায়েদে-আযমের অভিপ্রায়মত করাচিতে ফিরাইয়া আনিবার দাবির কথাও বাদ দেওয়া সহজ নয়। তেমনি করাচির উপর সারা পশ্চিম-পাকিস্তানের দাবিও তুড়ি মারিয়া উড়াইয়া দেওয়া যাইবে না। তাঁর উপর আছে করাচির স্বতন্ত্র একটি প্রদেশ হইবার দাবি। এ দাবিও কম জোরদার নয়। এসবই জটিল ও সমস্যা-সংকুল প্রশ্ন। পশ্চিম-পাকিস্তানকে যোনাল ফেডারেশনের আকারে বজায় রাখিতে পারিলে এসব জটিলতার উদ্ভব হইবে না।
(৩) পশ্চিম-পাকিস্তানের ইউনিটি ভাংগিয়া প্রদেশগুলিকে পূর্বাবস্থায় বহাল করিবার পর যার-তার পূর্ব নাম গ্রহণ করিবে। প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার সর্বশেষ ঘোষণায় যার-তার পূর্ব নাম বহাল হইয়া গিয়াছে। যোনাল ফেডারেশনের দ্বারা সে নাম বজায় না রাখিলে ‘পশ্চিম-পাকিস্তান’ নামে কোন শাসনতান্ত্রিক রাষ্ট্র-সংস্থা আর থাকিবে। সে অবস্থায় পূর্ব-বাংলাকে পূর্ব-পাকিস্তান বলিবার কোনও যুক্তিসংগতি থাকিবে। সে পরিস্থিতি ঘটিলে পূর্ব-পাকিস্তান ও পশ্চিম-পাকিস্তান নামের দুইটি অঞ্চলের যুক্তনাম যে পাকিস্তান আছে, সে অবস্থাও আর থাকিবে না।
এই তিন নম্বর দফাটির আরেকটি রাষ্ট্রীয় গুরুত্ব রহিয়াছে। যদি অবস্থা-গতিকে পূর্ব-পাকিস্তান ও পশ্চিম-পাকিস্তান নামে পাকিস্তান রাষ্ট্রের শাসনতান্ত্রিক নামধারী দুইটি ইউনিট নাও থাকে, তবু পাকিস্তানের ভৌগোলিক আকৃতির পরিপ্রেক্ষিতে দিক নির্দেশক পরিচিতি হিসাবে পূর্বাঞ্চলীয় পাকিস্তান, ইংরাজীতে ইস্টাণ পাকিস্তান ও পশ্চিমাঞ্চলীয় পাকিস্তান, ইংরাজীতে ওয়েস্টার্ণ পাকিস্তান, বলিতেই হইবে। এতে অচিন্তনীয় ও অভিনব ধরনের বিভ্রান্তি ও জটিলতা দেখা দিতে পারে।
এই সম্পর্কে ইস্ট পাকিস্তান বা পূর্ব-পাকিস্তান এবং ওয়েস্ট পাকিস্তান বা পশ্চিম-পাকিস্তান এই দুইটি শাসনতান্ত্রিক রাষ্ট্র-নামের প্রয়োজনীয়তার দিকে পাঠকদের দৃষ্টি আর একবার আকর্ষণ করিতেছি। পূর্ব-পাকিস্তানের অধিকাংশ চিন্তাবিদ ও রাষ্ট্রনায়ক পাকিস্তানের শাসন রচনার বেলা লাহোর প্রস্তাবের কথা বলেন। পক্ষান্তরে পশ্চিম-পাকিস্তানী অনেক নেতা লাহোর প্রস্তাবের নামে চটিয়া যান। তাঁরা ভুলিয়া যান লাহোর প্রস্তাবের ‘স্টেটস’ শব্দটার ‘এস’ বাদ দিয়া দুইটার বদলে এক পাকিস্তান করিয়াছি বটে, কিন্তু ভৌগোলিক দুই খণ্ডকে এক খণ্ড করিতে পারি নাই। তাঁরা ভুলিয়া যান লাহোর প্রস্তাবের ‘এস’টাই শুধু কার্যতঃ বাদ গিয়াছে; আর সবই ঠিক আছে। এ অবস্থায় পশ্চিমের খণ্ডও পাকিস্তান, পূর্বের খণ্ডও পাকিস্তান। ভূগোলের বিচারে পাকিস্তান দুইটা। মাত্র এক খণ্ডই পাকিস্তান, অপর খও তার প্রদেশ বা উপনিবেশ, অবস্থা তা নয়। অবস্থাগতিকে পশ্চিমের অনেক নেতাই তা বুঝেন না। ভিন্ন রাষ্ট্রের দ্বারা বিযুক্ত দুই খণ্ডে বিভক্ত রাষ্ট্র পাকিস্তানের মত আর একটিও নাই, এই যুক্তির জবাবে এক পশ্চিম-পাকিস্তানী নেতা বলিয়াছেন : ‘কেন থাকিবে না? যুক্তরাষ্ট্র ও আলাস্কাও ত কানাডার দ্বারা বিযুক্ত।‘ যদি আরও কোনও পশ্চিমা নেতা আমেরিকা-আলাক্কা দিয়া দুই পাকিস্তানের সম্পর্ক বিচার করেন, তবে সেটা পাকিস্তানের জন্য সত্যই চিন্তার কথা।
পশ্চিম-পাকিস্তানের যোনাল ফেডারেশন হওয়ার পক্ষে আরও একটা বড় যুক্তি আছে। সে যুক্তি এই যে ফেডারেল ভিত্তি ছাড়া আর কোনও উপায়েই পশ্চিম পাকিস্তানের সমস্ত প্রদেশকে ঐক্যবদ্ধ করা যায় না। কারণ পশ্চিম-পাকিস্তানের প্রদেশগুলির জনসংখ্যার অবস্থা এই যে পাঞ্জাব একাই পশ্চিম-পাকিস্তানের মোট জনসংখ্যার শতকরা ৬০ জন লোকের অধিবাস। আর তিন প্রদেশ একত্রে মিলিয়া মাত্র শতকরা ৪০ জনের অধিবাস। এ অবস্থায় জনসংখ্যার ভিত্তিতে সংযুক্ত পশ্চিম পাকিস্তানের আইন পরিষদ গঠিত হইলে তাতে পাঞ্জাবের নিরংকুশ একাধিপত্য হইবে। এই অবস্থার প্রতিকারের জন্যই ওয়ান ইউনিট গঠনের সময় পাঞ্জাব দশ বছরের জন্য তার মেজরিটি কোরবানি করিয়া মাইনরিটি হইয়াছিল। পাঞ্জাবের প্রতিনিধিত্ব ছিল ৪০। আর মাইনরিটি প্রদেশগুলির ছিল ৬০। মাইনরিটি প্রদেশগুলিকে প্রলুব্ধ করা ছাড়া এই অগণতান্ত্রিক ব্যবস্থার আর কোনও যুক্তি ছিল না। পাঞ্জাবের এত বড় ত্যাগে কৃতজ্ঞ না হইয়া মাইনরিটি প্রদেশগুলি বরঞ্চ সন্দিগ্ধ হইয়াছিল। তাই ওয়ান ইউনিট টিকে নাই। যদি গোড়া হইতেই ওয়ান ইউনিট ফেডারেল ভিত্তিক হইত তবে উহা টিকিত। ভবিষ্যতে উহা করিলেও টিকিবে। ওটা যখন হইবে একটা ফেডারেশন, তখন ওতে জনসংখ্যার ভিত্তিতে প্রদেশসমূহের প্রতিনিধিত্ব হইবে কেন? ফেডারেশনের প্রচলিত ও সর্বসম্মত নীতি অনুসারে যোনাল ফেডারেশনের আইন পরিষদ হইবে বিভিন্ন প্রদেশের সমান সংখ্যক প্রতিনিধি লইয়া। সেখানে জনসংখ্যার প্রশ্ন উঠিতেই পারে না। জনসংখ্যা নির্বিশেষে সকল প্রদেশের সমান প্রতিনিধি লইয়া যোনাল ফেডারেশনের আইন-পরিষদ গঠিত হইলে কোনও প্রদেশই তাতে আপত্তি করিবে না বলিয়াই আমার দৃঢ় বিশ্বাস। অতএব পশ্চিমাঞ্চলের ঐক্যের খাতিরে জন সংখ্যায় বিপুল মেজরিটি হইয়াও পাঞ্জাব এই প্যারিটি ভিত্তিক প্রতিনিধিত্ব মানিয়া লইবে, এটা আশা করা যায়। এই সাবফেডারেশনের নাম হইবে স্টেট-অব ওয়েস্ট পাকিস্তান। পশ্চিম-পাকিস্তান নেতাদের সকলের, বিশেষতঃ পাঞ্জাবী নেতাদের, স্মরণ রাখা উচিত যে লাহোর প্রস্তাবের ভিত্তিতে যদি পূর্ব ও পশ্চিমাঞ্চলে দুইটা স্বতন্ত্র পাকিস্তান হইত তবে তারাও হইত দুইটি ফেডারেশন।
