সকলেরই স্মরণ আছে যে ১৯৪৭ সালের ভারতীয় স্বাধীনতা আইনের বলে পাকিস্তান স্থাপিত হইয়াছে। এই আইনের তিন ধারার ২ উপধারা মতে রেফারেণ্ডামের মাধ্যমে আসামের সিলেট জিলা ‘পূর্ব-বাংলার’ অন্তর্ভূক্ত হইয়াছে। পক্ষান্তরে উক্ত আইনের ১৯ ধারায় ৩ উপধারা মতে রেফারেন্ডামের মাধ্যমে উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ পাকিস্তানের অন্তর্ভূক্ত হইয়াছে, পশ্চিম-পাকিস্তানের অন্তর্ভূক্ত হয় নাই। এ কথার তাৎপর্য এই যে সীমান্ত প্রদেশের উপর পশ্চিমাঞ্চলের প্রদেশগুলির যে দাবি, পূর্ব-বাংলার দাবিও অবিকল তাই। তার মানে সীমান্ত প্রদেশের উপর পশ্চিম পাকিস্তানের অন্যান্য প্রদেশগুলির কোনও বিশেষ অধিকার নাই। পূর্ব-বাংলার মোকাবিলায় সীমান্ত প্রদেশকে পশ্চিম পাকিস্তানের অংশ বলা বেআইনী ও শাসনতন্ত্র বিরোধী হইবে। এ অবস্থায় পূর্ব-বাংলার সাথে প্যারিটির পাল্লা দিবার উদ্দেশ্যে সীমান্ত প্রদেশকে পশ্চিম-পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত করিয়া যে ওয়ান ইউনিট করা হইয়াছিল, তা সম্পূর্ণরূপে অবৈধ বে-আইনী ও যবরদস্তিমূলক হইয়াছিল। লাহোর প্রস্তাবই পশ্চিম পাকিস্তান প্রদেশকে এই অবৈধতা হইতে বাঁচাইয়াছে। লাহোর প্রস্তাবই পশ্চিম যোনের সমস্ত প্রদেশগুলির সমন্বয়ে একটি মাত্র রিজিওন করিয়াছে। সীমান্ত প্রদেশ সম্বন্ধে যে কথা, পশ্চিম যোনের দেশীয় রাজ্যগুলি সম্বন্ধেও সেই কথা। ভারতীয় স্বাধীনতা আইনের ২ ধারার ৪ উপধারায় দেশীয় রাজ্যগুলি কে ভারত ও পাকিস্তান রাষ্ট্রদ্বয়ের যেকোন একটিতে সংযোজিত হইবার অবাধ অধিকার দেওয়া হইয়াছিল। সেই ধারা বলে উত্তর-পশ্চিম যোনের দেশীয় রাজ্যগুলি পাকিস্তান রাষ্ট্রে সংযুক্ত হইয়াছিল। কোনও একটি যোনের বা প্রদেশের অন্তর্ভুক্ত হয় নাই।
কাজেই দেশীয় রাজ্যগুলিকে গোটা পাকিস্তান রাষ্ট্রের বদলে খাস করিয়া পশ্চিম পাকিস্তানের অংশ দাবি করিতে গেলে লাহোর প্রস্তাবের আশ্রয় লওয়া ছাড়া উপায়ান্তর নাই। অতএব, ‘স্টেটস্’ শব্দের ‘এস’ হরফ বাদ দিয়া হিসাব করিলে লাহোর প্রস্তাব পূর্ব-পাকিস্তানের চেয়ে পশ্চিম-পাকিস্তানের স্বার্থের জন্যই বেশি দরকার।
সুতরাং দেখা গেল, লাহোর প্রস্তাব ১৯৪০ সাল ও ১৯৪৭ সালে পাকিস্তানের জন্য যেমন সত্য ছিল, আজ ১৯৭০ সালেও তেমনি সত্য আছে। লাহোর প্রস্তাব সত্য-সত্যই পাকিস্তান রাষ্টীয় সৌধের ইস্পাতের কাঠাম। এ কাঠাম ভাংগিলে কারও রক্ষা নাই।
৯. পশ্চিম পাকিস্তানে ওয়ান ইউনিট
পূর্ব-পাকিস্তানের পূর্ণ আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন পশ্চিম-পাকিস্তানের ইউনিটির উপর নির্ভরশীল, একথা আজ সবাই বুঝিতে পারিয়াছেন। পূর্ব-পাকিস্তানের দাবি মোতাবেক কেন্দ্রকে তিন সাবজেক্ট দিয়া অবশিষ্ট সব সাবজেক্ট পশ্চিমাঞ্চলের কোনও প্রদেশই একা বা স্বভাবে নিতে পারে না। সেজন্য তাদের একটি যোনল সাব ফেডারেশন করিতেই হইবে। কিন্তু পনর বছরের ওয়ান ইউনিটের তিক্ত অভিজ্ঞতায় মাইনরিটি প্রদেশগুলি পাঞ্জাবের সাথে কোনও ঐক্য করিতেই রাযী না। চুন খাইয়া তাদের মুখ পুড়িয়াছে। দই দেখিয়াও তাদের ভয় হইতেছে। তাই তারা সাব ফেডারেশনের বদলে নিখিল-পশ্চিম-পাকিস্তানী বিষয়গুলির জন্য ওয়াপদা পি.আই.ডি.সি. ইত্যাদির মত অটনমাস বডি স্থাপনের কথা ভাবিতেছেন।
কিন্তু একটু চিন্তা করিলেই প্রদেশসমূহের নেতারা বুঝিতে পারিবেন, ঐ ব্যবস্থা কোনও সমাধান নয়। প্রথমতঃ স্বায়ত্তশাসিত সংস্থাগুলিকেও কোনও-না কোন প্রদেশ বা কেন্দ্রের হাতে থাকিতে হইবে। দ্বিতীয়তঃ, ঐ ব্যবস্থায় গণতান্ত্রিক শাসনের স্থলে আমলাতান্ত্রিক একাধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হইবে। এই কারণেই প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া ওয়ান ইউনিট ভাংগিয়া সাবেক প্রদেশগুলি পুনর্বহাল করিলেও রেল, পি.আই.ডি.সি. ওয়াপদা, সি ইত্যাদি বিষয়গুলি কোনও প্রদেশকে না দিয়া নিজ হাতে অর্থাৎ কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে রাখিয়াছেন। প্রকারান্তরে এতদিনের প্রাদেশিক বিষয়গুলি এখন কেন্দ্রীয় বিষয় হইয়া গিয়াছে। এই অবস্থার পরিবর্তন আনিতে হইলে যোনাল সাব-ফেডারেশনই একমাত্র সমাধান।
১৯৫৪ সালে বড়লাটের অর্ডিন্যান্সে যে ইউনিট করা হইয়াছিল এবং যা ১৯৫৫ সালের পশ্চিম-পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা আইনে বলবৎ করা হইয়াছিল, তেমন ইউনিট আর হইবে না। মাইনরিটি প্রদেশসমূহ তা মানিবেও না। কিন্তু উপরোক্ত কারণে বিভিন্ন প্রদেশের স্বার্থেই তাদের সমন্বয়ে একটি মাত্র রাষ্ট্রীয় সংস্থা হওয়া অত্যাবশ্যক।
পশ্চিমাঞ্চলের সকল প্রদেশের সমন্বয়ে একটি মাত্র সাব-ফেডারেশন করা অত্যাবশ্যক আরও কতকগুলি কারণে। সংক্ষেপে সে কারণগুলির দিকেও আমি সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করিতেছি। পূর্ব-পাকিস্তানের আঞ্চলিক পূর্ণ স্বায়ত্তশাসনের মত পূর্ব-বাংলার স্বার্থের কোনও প্রত্যক্ষ সম্পর্ক এই কারণগুলির সাথে নাই। এগুলি বিশেষ করিয়া পশ্চিম-পাকিস্তানেরই স্বার্থের কথা। পশ্চিম-পাকিস্তানের স্বার্থও গোটা পাকিস্তানেরই স্বার্থ এই হিসাবে এসবে পূর্ব-পাকিস্তানের স্বার্থ রহিয়াছে নিশ্চয়ই।
(১) পশ্চিমাঞ্চলের দেশীয় রাজ্যসমূহ পশ্চিম-পাকিস্তান প্রদেশের অন্তর্ভুক্ত হইয়াছে। কোনও বিশেষ প্রদেশের অন্তর্ভুক্ত হয় নাই। সকলেরই স্মরণ আছে, ১৯৫৪ সালের ২২শে নবেম্বর তারিখে পাকিস্তান সরকার পশ্চিমাঞ্চলের সবগুলি প্রদেশের সমবায়ে পশ্চিম-পাকিস্তান প্রদেশ গঠনের সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেন। ২৪শে নবেম্বর সীমান্ত প্রদেশের আইন পরিষদ, ৩০শে নবেম্বর পশ্চিম-পাঞ্জাব আইন পরিষদ ও ১১ই ডিসেম্বর সিন্ধু আইন পরিষদ ঐ এক ইউনিট গঠনের প্রস্তাব সমর্থন করেন। অতঃপর ১৪ই ডিসেম্বর বেলুচিস্তান, বাহওয়ালপুর, খায়েরপুর ইত্যাদি দেশীয় রাজ্যের শাসকগণ যার-তাঁর রাজ্যের পক্ষ হইতে চুক্তি স্বাক্ষর করিয়া ঐসব রাজ্যকে পশ্চিম পাকিস্তান প্রদেশের অন্তর্ভুক্ত করিতে সম্মত হন। এই চুক্তির বলে ঐসব দেশীয় রাজ্যকে এক ইউনিটের শামিল করিয়া ১৯৫৫ সালের ৮ই আগস্ট তারিখে গণ পরিষদে পশ্চিম-পাকিস্তান প্রদেশ প্রতিষ্ঠা নামে একটি বিল পেশ করা হয়। ঐ বিল ৩০শে সেপ্টেম্বর পাশ হয়। ৩রা অক্টোবর উহা বড়লাটের অনুমোদন লইয়া পাকিস্তান গেযেটে প্রকাশিত হয়।
