তবু আমরা পূর্ব-পাকিস্তানীরা শাসনতন্ত্রের কথা বলিতেই লাহোর প্রস্তাবের নাম করি কেন। উত্তর অতি সোজা। এই প্রস্তাবটিই পাকিস্তান-সৌধের স্টিল ফ্রেম। লাহোর প্রস্তাবে দুই উইং-এ দুই স্বাধীন রাষ্ট্র স্থাপন ছাড়াও আরও কথা আছে। রাষ্ট্রের রূপরেখা সম্পর্কে তাতে গুরুত্বপূর্ণ মূল্যবান নির্দেশ আছে। কিন্তু পশ্চিমা ভাইএরা তা পড়িয়া দেখিবার বা বুঝিবার চেষ্টা করেন না বলিয়াই মনে হয়। কারণ পড়িবার তাঁদের দরকার নাই। বিনা-লাতে মানুষ কিছু করেও না, পড়েও না। পশ্চিমা ভাইএরা পাকিস্তান পাইয়াছেন। পাকিস্তানের রাজধানী পাইয়াছেন। সরকার পাইয়াছেন। সরকারী সব চাকরি পাইয়াছেন। দেশরক্ষা বাহিনীর, সুপ্রিম কোর্টের, স্টেট ব্যাংকের, ন্যাশনাল ব্যাংকের, সব ইনশিওরেন্স কোম্পানীর, পি. আই. এ. ইত্যাদির সদর দফতর পাইয়াছেন। বিদেশী মিশন পাইয়াছেন। সবই তাদের। একটার ঠাই তিনটা রাজধানী ভাংগা-গড়ার কন্ট্রাকদারি তাঁরাই করিয়া থাকেন। সরকারী-বেসরকারী সব খরচা সেখানেই। অতএব আল্লার ফজলে তাঁরা সুখেই আছেন। সুখে থাকিলে মানুষ গরিব আত্মীয়ের কথা ভাবে না। কাজেই পূর্ব-পাকিস্তানীরা কেমন আছে, কি চায়, কি খায়, সে-সব কথা ভাবিবার অত সুখে তাঁদের সময় কই? কেউ স্মরণ করাইয়া দিলেও উৎপাত মনে করেন। গরিব শরিক অংশ চাহিলে মুতাওলীরা ‘ওয়াকফ আল্লার সম্পত্তি’ ও ‘মুসলমান ভাই-ভাই’ বলেন। ওয়ারিসী আইনের কথা ওয়াকফনামার কথা তাঁরা ভাবিতে যাইবেন কেন? বরঞ্চ তাঁরা মনে করেন, ওসব না থাকিলেই ভাল হইত।
সারা দুনিয়াই আল্লার। পাকিস্তানও আল্লার। আমাদের বাতিল দুইটা শাসনতন্ত্রেই একথা বলা হইয়াছে। আয়েন্দাতেও বলা হইবে। সেই হিসাবে পাকিস্তান ওয়া সম্পত্তি ঠিকই। তা যদি হয় তবে লাহোর প্রস্তাবই এই ওয়াফের তৌলিয়তনামা। এই তৌলিয়তনামার তৃতীয় দফাটিই আমাদের বিবেচ্য। এই দফায় তিনটি প্যারা। প্রথম প্যারায় দুইটি বিধান। একটি বিধানে ‘স্টেট’ বা একাধিক স্বাধীন রাষ্ট্রের কথা বলা হইয়াছে। একাধিকের স্থলে এক পাকিস্তান করিয়া আমরা বরাবরের জন্য সে তর্কের মীমাংসা করিয়া ফেলিয়াছি। দ্বিতীয় বিধানে যে রাষ্ট্রীয় কাঠামোর সুনির্দিষ্ট রূপরেখা বর্ণনা করা হইয়াছে, এক পাকিস্তান করায় সেই রূপরেখার কি কি পরিবর্তন স্বতঃই ঘটিয়াছে, তা আমাদের বিচার করা দরকার। এই প্রস্তাবে তিনটি শব্দ ব্যবহার করা হইয়াছে। এক, ‘যোন’ বা মন্ডল; দুই, ‘রিজিওন’ বা অঞ্চল; তিন, ‘ইউনিট’ বা প্রদেশ। বলা হইয়াছে, উত্তর-পূর্ব ও উত্তর-পশ্চিম দুই যোন বা মন্ডলের মুসলিম মেজরিটি এলাকাগুলির সীমাসরহদ্দ প্রয়োজনীয় পুনর্বিন্যাস করিয়া ‘রিজিওন’ গঠিত হইবে। রিজিওনগুলির অন্তর্ভুক্ত ইউনিটগুলো ‘সভারেন’ ও ‘অটমাস’ হইবে। মূল প্রস্তাবে ‘রিজিওন’ বা অঞ্চলগুলিতে স্বাধীন-স্বাধীন রাষ্ট্র হওয়ার কথা। পরবর্তী ব্যবস্থায় যখন দুই রিজিওন মিলিয়া এক স্বাধীন রাষ্ট্র হইল, তখন স্বভাবতঃই এবং স্বতঃই রিজিওন বা অঞ্চল দুইটিই পাকিস্তান রাষ্ট্রের ‘কনস্টিটিউয়েন্ট ইউনিটের স্থান দখল করিল। ‘ইউনিটের’ বর্ণিত অধিকার দুইটি ‘সভারেইনটি’ এবং ‘অটনমিও’ স্বতঃই ‘রিজিওনের’ উপর বর্তাইল। ‘রিজিওন’ গঠনের বেলা তাদের প্রচলিত সীমা-সরহদ্দের পরিবর্তন হইতে পারে লাহোর প্রস্তাবে তা অনুমান করা হইয়াছিল। সে পুনর্বিন্যাস এমন সাংঘাতিক হইবে, তা মুসাবিদাকারীরা নিশ্চয়ই ধারণা করিতে পারেন নাই। কিন্তু পুনর্বিন্যাসের অনুমানটা তাঁদের ঠিকই হইয়াছে। পূর্বের ‘রিজিওন’ পুনর্বিন্যস্ত সীমার বাংলা-আসাম লইয়া হইবে, এটা তাঁরা অনুমান করিয়াছিলেন। কার্যতঃ তাই হইয়াছে। বাংলার অংশ ও আসামের অংশ লইয়া পুনর্বিন্যস্ত সীমার মধ্যে পূর্ব রিজিওন গঠিত হইয়াছে। ঠিক, তেমনি বিভক্ত পাঞ্জাব ও গোটা অন্য তিনটি প্রদেশ এবং দেশীয় রাজ্যগুলি লইয়া পশ্চিম রিজিওন গঠিত হইয়াছে।
অতএব দেখা গেল, লাহোর প্রস্তাবই দুই যোনে দুইটি রিজিওন সৃষ্টি করিয়াছে। লাহোর প্রস্তাবই দুই রিজিওনকে ‘অটমাস’ ও ‘সভারেন’ ইউনিট করিয়াছে। তাহোর প্রস্তাবের বলেই আমাদের অটনমির নাম রিজিওনাল অটনমি বা আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন; প্রভিনশিয়াল অটনমি বা প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন নয়। লাহোর প্রস্তাবের ‘সভারেনটি’ কথাটাই পাকিস্তান রাষ্ট্রকে ফেডারেশন করিয়াছে। অন্য কিছুতেই নয়। রাজধানীসহ সবগুলি কেন্দ্রীয় সংস্থা। ঘরের দরজায় পাইয়া পশ্চিমা নেতারা ঈংসেন্টারের নামে ইউনিটরি স্টেট করিতে চান। প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসনের নামে এক রিজিওনকে অন্য রিজিওনের প্রদেশ করিতে চান। এ অবস্থায় লাহোর প্রস্তাবই ফেডারেল পাকিস্তান ও অটমাস রিজিওনের একমাত্র রক্ষাকবচ। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ছাত্রমাত্রেই জানেন, ফেডারেশনে সভারেনটি থাকে ফেডারেটিং ইউনিট বা অংগ-রাজ্যগুলিতেই। রাজধানীর অবস্থিতি বৈগুণ্যে পূর্ব-বাংলার হক-সনদ লাহোর প্রস্তাব। রাজধানী এপারে আসিলে এটাই হইবে পশ্চিম-পাকিস্তানের হক-সনদ। খোদ পশ্চিম-পাকিস্তানের অস্তিত্ব নির্ভর করিতেছে লাহোর প্রস্তাবের উপর। পশ্চিমা ভাইদের বিবেচনার জন্য এই কথাটাই এখানে বিশেষভাবে উল্লেখ করিব।
