লাহোর প্রস্তাবই পাকিস্তান প্রস্তাব এটা সর্বজনস্বীকৃত। এই প্রস্তাবই পাকিস্তানের দুই উইংকে দুইটি ‘রিজিওন’ করিয়াছে। তাই পূর্ব-পাকিস্তানের রাষ্ট্রনেতারা পূর্ববাংলার স্বায়ত্তশাসনকে রিজিওনাল অটনমি বলিয়া থাকেন। পরবর্তী অনুচ্ছেদে লাহোর প্রস্তাবের মর্ম আলোচনা করা হইবে। তা হইতেই পাঠক বুঝিবেন, পূর্ব পাকিস্তানের দাবিকে রিজিওনাল অমি বলিয়া এ অঞ্চলের রাষ্ট্র নেতারা পাকিস্তান প্রস্তাবের প্রতি পূর্ণ আনুগত্যই দেখাইতেছেন।
ফেডারেশন খ ইউনিটসমূহের মধ্যে বিষয় বন্টনের মূলনীতি এই যে, যে সব বিষয়ে সকল ইউনিটেরমত্ব ও স্বার্থ এক বা কমন এবং যে সব বিষয় ইজমালিতে পরিচালন করিলে ফলের দিকে বেশি ও খরচের দিকে কম হয়, সেইগুলিই ফেডারেশনের হাতে দেওয়া হয়। আর যেসব বিষয়ে সকল ইউনিটে ও স্বার্থ এক ও কমন নয়, যেগুলির ইজমালি পরিচালনে কোনও বিষয়ে সুবিধা নাই, সে সব বিষয়ই ইউনিটসমূহের যার-তার পরিচালনাধীনে রাখা হয়।
এর মধ্যে ব্যতিক্রম দুইটি। দেশরক্ষা ও পররাষ্ট্র। সুস্পষ্ট কারণেই এই দুইটি বিষয় সকল প্রকার ফেডারেশনেই ফেডারেল সরকারের হাতে রাখা হয়। পূর্ব পাকিস্তানী নেতারা তাদের স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে বরাবর এই দুইটি বিষয়ই ফেডারেল সরকারের হাতে রাখিয়াছেন। তাছাড়া যদিও কারেন্সি ফেডারেল সরকারে রাখাটা বাধ্যতামূলক নয়, তথাপি পাকিস্তান রাষ্ট্রের ঐক্যের প্রতীকরূপে কারেন্সিও ফেডারেল সরকারের হাতে রাখা হইয়াছে। এইভাবেই ইতিহাস-বিখ্যাত যুক্তফ্রন্টের ২১ দফা রচিত হইয়াছিল। এটাই পূর্ববাংলার জাতীয় দাবি। ১৯৫৪ সালের সাধারণ নির্বাচনে শতকরা সাড়ে সাতান্নবইটি ভোট দিয়া পূর্ব-পাকিস্তানীরা একুশ দফার দাবি সমর্থন করিয়াছে।
এই তিনটি বিষয় ছাড়া আর সব বিষয় ইউনিটের হাতে থাকিবে। পূর্ব-বাংলার বেলা সে একাই এই ইউনিট। এ দাবি পূর্ববাংলার অন্যায়ও নয়; কেন্দ্রকে দুর্বল করার অভিপ্রায়ও এতে নাই। এর অতিরিক্ত আর কোনও বিষয়েই পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মা ও স্বার্থ এক ও কমন নয়। সাধারণতঃ যেসব বিষয় ফেডারেশনের হাতে থাকা উচিত এবং অন্যান্য ফেডারেশনে যেসব বিষয় কেন্দ্রের হাতে আছে তার মধ্যে যোগাযোগ, রেলওন্ত্রে, ডাক ও তার, ইনফরমেশন ও ব্রডকাস্টিং, ইরিগেশন, পানি, বিদ্যুৎ, গ্যাস ও প্ল্যানিং-এর নাম করা যাইতে পারে। কিন্তু ভৌগোলিক দ্বিধাবিভক্তির দরুন পাকিস্তানে এর একটাও কেন্দ্রীয় বিষয় হইতে পারে না। সুখের বিষয় ও আশার কথা এই যে খুব দেরিতে হইলেও পশ্চিম-পাকিস্তানের নেতারা এটা বুঝিতে পারিয়াছেন। তাই তিন বিষয়ের ফেডারেশন করিতে তাঁরা মোটামুটি রাযী হইয়াছেন। কোন-কোন বিষয়ে, বিশেষতঃ কর ধার্যের ক্ষমতা লইয়া, যেটুকু বিরোধ ও মতভেদ আজও দেখা যায়, জাতীয় ঐক্যবোধ ও বাস্তব জ্ঞান লইয়া সকলে আলোচনায় বসিলে সে-সব বিষয়েও সমঝোতা হইয়া যাইবে।
পূর্ব-পাকিস্তানের এই দাবির ঐতিহাসিক তাৎপর্য বুঝিতে গেলে পাকিস্তানের বুনিয়াদ যে লাহোর প্রস্তাব সেটি ভাল করিয়া বুঝিতে হইবে। পরের অনুচ্ছেদে সে আলোচনাই করিতেছি।
৮. লাহোর প্রস্তাব
লাহোর প্রস্তাবের আরেক নাম পাকিস্তান প্রস্তাব। পাকিস্তান রাষ্ট্র এই প্রস্তাব হইতেই জন্ম ও রূপ লাভ করিয়াছে। কৃতজ্ঞতার নিদর্শন স্বরূপ আমরা লাহোর প্রস্তাব পাশের জায়গাটিতে এক সুউচ্চ, সুরম্য পাকিস্তান মিনার নির্মাণ করিয়াছি।
কিন্তু বিস্ময়কর মজার কথা এই যে পাকিস্তানের শাসনন্ত্র রচনার কাজে লাহোর প্রস্তাবের নাম শুনিলে আমরা অনেকেই চটিয়া যাই। মুসলিম-মেজরিটির দেশে বাস করিয়া যাঁরা ইসলামের নাম শুনিলেই চটিয়া যান, তাঁরা নিশ্চিয়ই নিন্দার্হ। কিন্তু পাকিস্তানের নাগরিক হইয়া যাঁরা পাকিস্তান প্রস্তাবের নাম শুনিলে চটিয়া যান, তাঁরা কি নিন্দার্হ নন? অথচ তাই ঘটিতেছে। লাহোর প্রস্তাবের নাম শুনিলেই আমাদের রাষ্ট্রনেতাদের অনেকেই তেলে-বেগুনে জ্বলিয়া উঠেন। এর হেতু কি? একদিকে পূর্ব-পাকিস্তানের রাষ্ট্র-নেতাদের অনেকেই শাসনতন্ত্র রচনার কথা বলিতে গিয়া লাহোর প্রস্তাবের নাম উল্লেখ করেন। অপরদিকে পশ্চিম-পাকিস্তানের অধিকাংশ নেতা লাহোর প্রস্তাবের নামোল্লেখ সহ্য করিতে পারেন না।
পশ্চিম-পাকিস্তানী নেতাদের এই লাহোর-প্রস্তাব-বিরোধী মনোভাবের মূল কারণ মাত্র একটি। লাহোর প্রস্তাবে ভারতের উত্তর-পূর্ব ও উত্তর-পশ্চিম মন্ডলে (যোনে) দুইটি স্বাধীন রাষ্ট্রের কথা বলা হইয়াছে। এই কারণে পশ্চিম-পাকিস্তানী নেতাদের অধিকাংশের মনে লাহোর প্রস্তাব সম্পর্কে একটা কমপ্লেক্স একটা ফোবিয়া আছে। পূর্ব-পাকিস্তান হইতে লাহোর প্রস্তাবের নাম উঠিলেই ওঁরা মনে করেন যে পূর্ব-পাকিস্তানীরা বুঝি দুই স্বাধীন পাকিস্তানের কথা বলিতেছে।
ধারণাটা সম্পূর্ণ ভুল। পূর্ব-পাকিস্তানের কোনও পার্টি বা নেতা এক পাকিস্তান ভাংগিয়া দুইটি স্বতন্ত্র স্বাধীন রাষ্ট্র গড়িবার কল্পনাও করেন না। লাহোর প্রস্তাবে ‘স্টেটস’ শব্দ থাকা সত্ত্বেও কায়েদে আযমের নেতৃত্বে উভয় অঞ্চলের নেতৃবৃন্দ জানিয়া বুঝিয়াই এক পাকিস্তান কায়েম করিয়াছেন। পাকিস্তান রাষ্ট্র ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতার দরুন রাষ্ট্রবিজ্ঞানের বিচারে একটা অভিনব এক্সপেরিমেন্ট। আমাদের জাতীয় নেতৃত্ব এই অভিনবত্ব সম্পর্কে সম্পূর্ণ সচেতন থাকিয়াই এই এক্সপেরিমেন্টে হাত দিয়াছেন। এই অভিনব এক্সপেরিমেন্টকে সফল করিতে আমরা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। আমাদের পথে প্রাকৃতিক ও ভৌগোলিক যত বাধাই থাকুক, রাজনৈতিক দূরদশী মনীষার দ্বারা সে সব বাধা আমরা অতিক্রম করিবই। এক অখন্ড নেশন-স্টেট হিসাবে পাকিস্তানকে আমরা সফল ও চিরস্থায়ী করিবই। কোন বিঘুকেই আমাদের জাতীয় সংকল্প ব্যর্থ করিতে দিব না যদি পশ্চিমা ভাইএরা ব্যর্থ না করেন।
