কিন্তু প্যারিটির বিরুদ্ধে পূর্ব-পাকিস্তানে তেমন কোন আন্দোলন হইয়াছিল, তা বলা যায় না। পূর্ব-পাকিস্তান-ভিত্তিক যতগুলি জনপ্রিয় গণ-প্রতিষ্ঠান ও ছাত্র প্রতিষ্ঠান আছে তাদের ছয় দফা, সাত দফা, এগার দফা ও চৌদ্দ দফা নামে বহু পার্টি-প্রোগ্রাম আছে। আইউবী আমলের গোটা দশ বছরব্যাপি যুলুমের প্রতিবাদে এই সব প্রতিষ্ঠান অনেক দাবি-দাওয়া স্পষ্ট ভাষায় দেশবাসী ও গভর্ণমেন্টের সামনে পেশ করিয়া আসিয়াছে। তার একটিতেও প্যারিটি বাতিল করিয়া জনসংখ্যাভিত্তিক প্রতিনিধিত্ব চাওয়া হয় নাই। বরঞ্চ প্রতিনিধিত্বের প্যারিটিকে ভিত্তি করিয়াই ঐসব পার্টি দুই অঞ্চলের স্বকীয়তা, দুই ভাষা, দুই কৃষ্টি, দুই অর্থনীতি ও দুই স্বত্র রাষ্ট্রীয় সত্তার বাস্তবায়নের পন্থা হিসাবেই লাহোর-প্রস্তাব-নির্দেশিত আঞ্চলিক স্বায়ত্বশাসন দাবি করিতেছিল।
পক্ষান্তরে যাঁরা শক্তিশালী কেন্দ্রের নামে আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসেনর বিরোধিতা করিতেছিলেন, তাঁরাই প্রতিনিধিত্বের প্যারিটির বিরূপ সমালোচনা করিতেছিলেন। তাঁরা বলিতেছিলেন যে প্রতিনিধিত্বের প্যারিটি যাঁরা প্রবর্তন করিয়াছেন, তাঁরা কার্যত পাকিস্তানের দুই স্বতন্ত্র সত্তা মানিয়া লইয়া পাকিস্তানের এক ও অবিভাজ্যতার মূলে কুঠারাঘাত করিয়াছেন। বস্তুতঃ তাঁদের মতে প্রতিনিধিত্বের প্যারিটি প্রবর্তন করিয়া পূর্ব-পাকিস্তানের পূর্ণ আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসনের দাবিকে দুর্নিবার করিয়া ভোলা হইয়াছে।
এমনি সময়ে সর্বাপেক্ষা শক্তিশালী কেন্দ্রের দাবিদার প্রেসিডেন্ট আইউবের এক পূর্ব-পাকিস্তানী সমর্থক, তাঁর সাবেক মন্ত্রী, হঠাৎ একদিন পূর্ব-পাকিস্তানের পক্ষ হইতে প্যারিটির স্থলে জনসংখ্যা-ভিত্তিক প্রতিনিধিত্বের দাবি করিয়া বসেন। যেমন দাবি অমনি স্বীকার। যেই ইজাব অমনি কবুল। পূর্ব-পাকিস্তানের এই ন্যায় সংগত দাবি মানিয়া লইবার জন্য পশ্চিম-পাকিস্তানের সকল নেতা যেন এক পায় খাড়াই ছিলেন। কি উদ্দেশ্যে তাঁরা পূর্ব-পাকিস্তানের উপর ঐ অবিচারের প্রতিকার করিতে উন্মুখ হইয়াছিলেন, পরের দিনই তা প্রকাশ হইয়া পড়িল। তাঁরা বলিতে লাগিলেন। এখন যখন পূর্ব-পাকিস্তানের জনসংখ্যাভিত্তিক প্রতিনিধিত্বের দাবি মানিয়া নেওয়া হইল, তখন আর আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসনের দাবি করা হয় কোন মুখে?
এই কথার সংগে সংগে তারা আরেকটি কথা বলিলেন। সেটি উচ্চ পরিষদের কথা। এটি সম্বন্ধে পরে আলোচনা করিতেছি। এখানে শুধু এইটুকু বলিয়া রাখিতেছি যে উচ্চ পরিষদ সৃষ্টি করিয়া তদ্বারা পূর্ব-বাংলার মেজরিটি কনট্রোলই যদি করা হইল, তবে নিম্ন পরিষদে এই মেজরিটি লইয়া পূর্ব-বাংলার কি লাভ হইল? প্রকারান্তরে সেই প্যারিটিই হইয়া গেল না কি? তাতে পূর্ণ আঞ্চলিক স্বায়ত্ত্বশাসনের আবশ্যকতা ও যৌক্তিকতা কিছু হ্রাস পাইল কি?
এ অবস্থায় প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার শুত ও প্রশংসনীয় কাজটি করিতে গিয়া আমাদের জাতীয় জীবনের রাষ্ট্রীয় কাঠামোতে এবং সর্বোপরি দুই অঞ্চলের সম্পর্কের মধ্যে কি কি জটিলতা সৃষ্টি করিলেন এবং তার ফল পরিণামে কি কি ভক্ত ও অবাঞ্ছনীয় রূপ ধারণ করিতে পারে, নিচে সংক্ষেপে তারই আলোচনা করিতেছি।
৭. আঞ্চলিক বনাম প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন
প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া তাঁর ঘোষণায় পাকিস্তান ফেডারেশনের ইউনিটগুলির জন্য সর্বাধিক প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসনের কথা বলিয়াছেন। তার মানে এই যে ইউনিটগুলির নাম তিনি প্রদেশ রাখিয়াছেন। এক কানাডা ছাড়া দুনিয়ার আর সব ফেডারেশনের অংগরাজকে ‘স্টেট’ বলা হয়। শুধু কানাডাতেই ওদের ‘প্রভিন্স’ বলা হয়। অস্ট্রেলীয় ফেডারেশনের শাসনতান্ত্রিক নাম কমনওয়েলথ-অব-অস্ট্রেলিয়া। আমাদের প্রতিবেশী ভারত ঠিক ফেডারেশন নয়। শাসনতান্ত্রিক নাম তার ইউনিয়ন। তবু তার অংগরাজ্যগুলিকে ‘স্টেট’ বলা হইয়াছে। ‘প্রভিন্স’ বলা হয় নাই।
সুতরাং নামে কিছু আসে যায় না। ফেডারেশন ও ফেডারেটিংইউনিটগুলির মধ্যে ক্ষমতা বন্টনটাই আসল কথা। তবু আমাদের বেলা ‘স্টেট’ ও ‘প্রভিন্স’ দুইটা শব্দই খুব উপযোগিতার সাথে ব্যবহার করা যাইতে পারে।
কিন্তু প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া ওয়ান ইউনিট ভাংগিয়া পূর্ব-পাকিস্তানকে পশ্চিম পাকিস্তানের প্রদেশগুলির সমপর্যায়ের ও সমমর্যাদার প্রদেশ করিয়া ফেলিয়াছেন। অতএব প্রদেশগুলির স্বায়ত্তশাসনকে প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন বলিতে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার বাধে নাই।
স্মরণীয় যে পূর্ব-পাকিস্তানের রাষ্ট্রনেতা ও চিন্তা-নায়করা বরাবর পূর্ব-বাংলার দাবিকে ‘আঞ্চলিক স্বায়ত্বশাসন’ বলিয়াছেন, ’প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন’ বলেন নাই। কারণ অতি সোজ। পূর্ব-বাংলা কোনও অর্থেই একটি প্রদেশ নয়। ইউনিটরি রাষ্ট্রের অংগরাজ্য হিসাবে না, ফেডারেল রাষ্ট্রের অংগরাজ্য হিসাবেও না। বলা যাইতে পারে, পূর্ববাংলার রাষ্ট্রনেতাও চিন্তা-নায়ক প্রভিনশিয়াল অটনধি দাবির বদলে ‘স্টেট অটনমি’ দাবি করিতে পারিতেন। তা কেন করেন নাই? তাঁরা ‘আঞ্চলিক স্বায়ত্বশাসন’ ‘রিজিওনাল অটনমি’ দাবি করিতেছেন কেন? দুই কারণে। এক, দুনিয়ার জন্য ফেডারেশনের অংগরাজ্যের স্বচ্ছন্দে ও নিজেদের সুবিধার খাতিরে যেসব বিষয় ফেডারেশনের হাওলা করিয়াছে, পূর্ব-বাংলা ভৌগোলিক কারণে তার সবগুলি ফেডারেশনকে দিতে পারেনা। পূর্ব-বাংলা ঐ কারণে আরও ম বিষয় ফেব্রশনের হতে দিতে বাধ্য। এই জন্যই ‘স্টেট অটনমি’ বলিলেও পূর্ব-বাংলার দাবি সবটুকু বোঝা যাইত না। দুই, পূর্ব-বাংলার নিজের স্বায়ত্তশাসনের কথা ভাবিবার সময় পশ্চিম-পাকিস্তানের প্রদেশগুলির স্বায়ত্তশাসনের কথা ভুলিয়া যায় নাই। তাদেরও পূর্ণ বায়ত্তশাসনের কথা ভাবিয়াছে। কিউপায়ে তাদের পূর্ণ স্বায়ত্তশাসনকে বাস্তবে প্রয়োগ করা যায়, সে চিন্তাও পূর্ব-বাংলা করিয়াছে কতকটা নিজের স্বার্থেই। এটা ঘটিয়াছে এইরূপে পশ্চিম-পাকিস্তানের বিভিন্ন প্রদেশের মধ্যে যে পারস্পরিক সম্পর্ক আছে ও থাকিতে পারে,পূর্ব-বাংলার সাথে তাদের তেমন সম্পর্ক নাই ও থাকিতে পারেনা। সোজা কথায় পশ্চিম-পাকিস্তানের প্রদেশগুলি যে অর্থে পাকিস্তানের অংগরাজ বা প্রদেশ, পূর্ব-বাংলা সে অর্থে পাকিস্তানের অংগরাজ্য বা প্রদেশ নয়। পাকিস্তান কায়েম হওয়ার দিন পূর্ব-বাংলাকে পশ্চিম অঞ্চলের চারটি প্রদেশের মতই একটি প্রদেশ কলা হইয়াছিল বটে, কিন্তু ভৌগোলিক বাস্তবতার দিক হইতে পূর্ব-বাংলা একাই পশ্চিম অঞ্চলের চারটি প্রদেশ ও সবগুলি দেশীয় রাজ্যের যোগফলের সমান। পূর্ব-বাংলা একাই একটি অঞ্চল। তাকে পাকিস্তান ফেডারেশনের একটি স্টেট বলা যাইতে পারে। আর পশ্চিম-পাকিস্তানের সকল প্রদেশ মিলিয়া আরেকটি অঞ্চল। একে পাকিস্তান ফেডারেশনের আরেকটি স্টেট বলা যাইতে পারে। শাসনতন্ত্র রচনার সময় শাসনতান্ত্রিক বিধানে শান-ক্ষমতা ও অর্থনৈতিক অধিকার বন্টনে এই দুই পৃথক আঞ্চলিক পার্থক্যের মাপকাঠিতেই বিচার ও সিদ্ধান্ত করিতে হইবে। এই বাস্তব-জ্ঞান হইতেই পূর্ববাংলার রাজনৈতিক চিন্তা-নায়করা বরাবর এটাকে আঞ্চলিক কার্যত বলিয়াছেন; প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন বলেন নাই। স্পষ্টতই ও-দুই জিনিস এক বস্তু নয়।
