প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার আগের ঘোষণায় বুঝা গিয়াছিল প্রেসিডেনশিয়াল প্যাটার্ন হইতে পার্লামেন্টারি পদ্ধতিতে ফিরিয়া আসা তাঁর মতে একটা সেটলড় প্রশ্ন। কিন্তু পরবর্তীকালে ঘোষণায় তিনি পার্লামেন্টারি কথাটা না বলায় সংবাদপত্র রিপোর্টারা ঐ অমিশনের কারণ জিগ্গাসা করিয়াছিলেন। জবাবে প্রেসিডেন্ট বলিয়াছেন বারে বারে একই কথার পুনরাবৃত্তি করা তিনি দরকার বোধ করেন না ইডিওলজি ফেডারেল ও ম্যাক্সিমাম প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন কথাগুলি বহুবার পুনরাবৃত্তি করিতে আপত্তি না হইলে পার্লামেন্টারি কথাটার পুনরাবৃত্তিও নিশ্চয়ই দোষের হইত না। এ বিষয়ে আমার আশংকা মিথ্যা হউক, এই মুনাজাত করি। কিন্তু সে আশংকার কথাটা না বলিয়া পারিতেছিনা। বর্তমান সরকারের বিশ্বস্ত কেউ-কেউ আমাকে বলিতেছিলেন যে নিজ পার্লামেন্টারি ও নিভাজ প্রেসিডেনশিয়াল সিস্টেম পাকিস্তানের উপযোগী নয়। এখানে তুর্কী শাসনতন্ত্রের অনুকরণে উক্ত দুই সিস্টেমের মিশ্রনে একটি নয়া প্যাটার্ন বাহির করিবার চেষ্টা হওয়া উচিৎ। উক্ত ভদ্রলোকেরা প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া ও তাঁহার আইন উপদেষ্টাদের মনের কথা বলিয়াছেন কি না কে জানে?
পশ্চিম-পাকিস্তানের ওয়ান ইউনিট ও দুই অঞ্চলের প্রতিনিধিত্বের প্যারিটি বাতিল করিয়া প্রেসিডেন্ট জনমতের প্রতি শ্রদ্ধা দেখাইয়াছেন। কথাটা বিচার-সাপেক্ষ। পশ্চিম পাকিস্তানের মাইনরিটি প্রদেশেসমূহ ওয়ান ইউনিটের বিরুদ্ধে বিক্ষুব্ধ ছিল; তাহাদের নেতাদের বিপুল মেজরিটি বরাবর ওয়ান ইউনিটের বিরুদ্ধে আন্দোলন করিয়া আসিতেছেন। ইহা ঠিক কথা। ওয়ান ইউনিট-বিরোধী এই আন্দোলনটা নিরর্থক ছিল না। উহার বিরুদ্ধে মাইনরিটি প্রদেশসমূহের বাস্তব ও গুরুতর অভিযোগ ছিল। সে অভিযোগের প্রতিকারের পন্থা হিসাবে সকল প্রদেশই যার তা স্বায়ত্তশাসিত পূর্বাবস্থায় ফিরিয়া যাইতে চাহিতেছিল, একথাও ঠিক। কিন্তু গোটা পশ্চিম পাকিস্তান ও সংলগ্ন দেশীয় রাজ্যসমূহের সাধারণ স্বার্থের বিষয়গুলি এজমালিতে পরিচালনের পন্থা হিসাবে সবগুলি স্বায়ত্তশাসিত প্রদেশ ও দেশীয় রাজ্যগুলির সমন্বয়ে একটি যোনাল ফেডারেশন করিবার আবশ্যকতা কেউ অস্বীকার করেন নাই। প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া এই দিককার কথাটা একদম বিচার না করিয়া শুধু সবগুলি প্রদেশকেই পূর্বাবস্থায় ফিরাইয়া নেন নাই, বরঞ্চ ওয়ান ইউনিট গঠনের আগে যে-সব দেশীয় রাজ্য স্বায়ত্তশাসিত ছিল, সেগুলির বেশির ভাগকেই পার্শ্ববর্তী প্রদেশের সহিত সংযুক্ত করিয়া ফেলিয়াছেন। এটা আইনের বিচারে ঠিক হয় নাই। রাজনীতির বিচারে ঠিক হইয়াছে কি না অয়দিন পরেই বুঝা যাইবে। দৃষ্টান্ত স্বরূপ বলা যায়, বাহওয়ালপুর হইতে প্রতিবাদ উঠিয়াছে। এটা কতদূর গড়াইবে কে জানে? প্রেসিডেন্টের আইন-উপদেষ্টারা তাঁহাকে কি উপদেশ দিয়াছেন জানি না। কিন্তু ১৯৪৭ সালের ভারত স্বাধীনতা আইন অনুসারে এইসব দেশীয় রাজ্য পাকিস্তানেই এক্সিড করিয়াছিল, কোনও একটি প্রদেশে এক্সিড করে নাই। তারপর ১৯৫৪ সালের অক্টোবর মাসে বড়লাটের অর্ডিন্যান্স-বলে পশ্চিম পাকিস্তান প্রদেশ গঠিত হওয়ার পর ঐসব দেশীয় রাজ্য পাকিস্তান সরকারের সহিত দস্তখতী চুক্তি বলে পশ্চিম পাকিস্তান প্রদেশের অন্তর্ভুক্ত হইয়াছিল। পশ্চিম-পাকিস্তান প্রদেশ ভাংগিয়া যাওয়ার পর প্রদেশসমূহের মতই দেশীয় রাজ্যগুলিও পূর্বেকার অবস্থায় ফিরিয়া গিয়াছে। এ অবস্থায় ঐসব দেশীয় রাজ্যের সহিত নূতন চুক্তি না করিয়া তাদেরে পাশ্ববর্তী কোনো প্রদেশের অংগ করা যায় না। প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার মধ্যস্থতায় এরূপ কোনও চুক্তি তাদের সাথে হইয়াছে কিনা, সরকারী ঘোষণায় তা প্রকাশ নাই।
তারপর ধরুন, রাজনৈতিক দিকটার কথা। ওয়ান ইউনিট ভাংগিয়া দিবার সময় উহাদের সমন্বয়ে একটা যোনাল ফেডারেশনের সম্ভাবনার কথা ত কোথাও বলাই হয় নাই, বরঞ্চ তেমন কোনও যোনাল ফেডারেশন না হওয়ার ব্যবস্থাই করা হইয়াছে বলিয়া মনে হয়। প্রথমতঃ ট্রাইবাল এরিয়াগুলিকে আলাদা করিয়া ঐগুলি কেন্দ্রীয় সরকারের শাসনাধীনে আনা হইয়াছে। দ্বিতীয়তঃ ঐসব এলাকার উন্নয়নের জন্য কেন্দ্রীয় সরকারের পরিচালনাধীন কর্পোরেশন গঠনের কথা বলা হইয়াছে। এতে এটাই বোঝা যায় যে সিন্ধু উপত্যকা পরিকল্পনা, তারবেলা, মংলা, সুইগ্যাস, রেল, পোস্ট, টেলি, ইনফর্মেশন, ব্রডকাস্টিং, পানি বিদ্যুৎ ইত্যাদি বিষয় কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে রাখিবার জন্য বর্তমান সরকার মনের দিকে তৈয়ার হইয়াই গিয়াছেন। সকল প্রদেশ ও দেশীয় রাজ্যসমূহের সমন্বয়ে একটি যোনাল ফেডারেশন না হইলে পশ্চিমাঞ্চলের ঐ সব বিষয় কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে না আনিয়া উপায়ান্তরও নাই। পশ্চিমাঞ্চলে যদি তা হয় তবে পূর্বাঞ্চলে কি হইবে?
এইখানেই পশ্চিম পাকিস্তানের বিভিন্ন প্রদেশের ঐক্য ও বিভক্তির সাথে পূর্ব পাকিস্তানের ভাগ্য ওতপ্রোতভাবে জড়িত হইয়া পড়ে। এইখানেই লাহোর প্রস্তাব, আঞ্চলিক নাম প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন, দুই অঞ্চলের প্যারিটি, পশ্চিম-পাকিস্তানের ওয়ান ইউনিট, সব কথা অনিবার্যরূপে প্রাসংগিক হইয়া পড়ে। পূর্ব-পাকিস্তানের স্বার্থের কথা বিচারে পশ্চিম পাকিস্তানের গঠন-প্রকৃতি-আকৃতির কথা অবান্তর এ কথা আর বলা চলে না। আবশ্যিকভাবেই এটা ‘বান্তর’ হইয়া পড়ে। একটু পরেই এসব বিষয়ই যথাসম্ভব সংক্ষেপে আলোচনা করিব। তার আগে আরেকটা ব্যাপারের দিকে পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করিয়া রাখিতেছি। প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া আসন্ন নির্বাচিত আইন পরিষদের মতামতের অপেক্ষা না করিয়া নিজ দায়িত্বে যে দুইটি ব্যাপাত্র দশ বছরের প্রচলিত ব্যবস্থা বাতিল করিয়াছেন, তার একটি ওয়ান ইউনিট, অপরটি পারিটি। ওয়ান ইউনিটের বিরুদ্ধে পশ্চিম-পাকিস্তানের মাইনরিটি প্রদেশসমূহে ঘোরর আপত্তি উঠিয়াছিল এ কথা আগেই বলিয়াছি।
