পক্ষান্তরে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া ও-পথে না গিয়া নিজ দায়িত্বে পঞ্চশিলা ঘোষণা করায় ৫৬ সালের শাসনতন্ত্রের সবগুলি মূলনীতি ঠিক থাকিল বটে, কিন্তু প্রথমতঃ রাষ্ট্র ও সরকারের লেজিটিমেসি-কনটিনিউটি পুনর্বহাল হইল না। দ্বিতীয়ত : ৫৮ সালের ৭ই অক্টোবর শাসন বাতিলটা অনুমোদিত হইয়া গেল। ভবিষ্যতের জন্য খারাপ নযির স্থাপিত হইল। ভাবী রাজনৈতিক উচ্চাকাংখী পলিটিক্যাল এ্যাডভানচারিস্টদের জন্য একটা সুন্দর আশকারা হইয়া থাকিল।
অনেকে আশংকা করিয়া থাকে যে ‘৫৬ সালের শাসন বাতিলের আইউবী বিপ্লব বাতিল করিয়া রাষ্ট্র ও সরকারকে ১৯৫৮ সালের ৭ই অক্টোবর অবস্থায় ফিরাইয়া নিলে তকালের মন্ত্রী-মেষরা বকেয়া শুদ্ধ বেতন-ভাতা ও মন্ত্রীগিরি-মেগিরি দাবি করিয়া বসিবেন। তাতে রাষ্ট্রের কোষাগারে বিপদ ঘটিতে পারে। কথাটা নিতান্তই বাজে। আঞ্চলিক প্যারিটি ও স্বায়ত্তশাসন এবং ওয়ান ইউনিটের মত জটিল ও রাজনৈতিক সমস্যার সমাধান চিফ-মার্শাল ল এডমিনিস্ট্রেটর প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া করিতে পারিলে ঐ তুচ্ছ ব্যাপারটাই পারিতেন না, এটা কোনও কাজের কথা নয়।
কিন্তু প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া এই সোজা পথে না গিয়া অধিকতর জটিল গণতন্ত্রের পথে যাওয়ায় ভাল কাজটিই করিয়াছেন। তবে এই ভাল কাজটি করিতে গিয়াই তিনি এমন কয়টি কাজ করিয়াছেন বা আপাততঃ ও দৃশ্যত ভাল। কিন্তু যার পরিণাম ভাল নাও হইতে পারে। যদি এসব কাজের পরিণাম ভাল হয়, তবে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খুব দুঃসাহসিক পুণ্যের কাজই করিয়াছেন। সেজন্য পাকিস্তানের ইতিহাসে তাঁর নাম সোনার হরফে লেখা থাকিবে। কিন্তু যদি পরিণাম ভাল না হয়, তবে ইতিহাসে তাঁর বদনাম থাকিবে। সে বদনাম জেনারেল আইউবের বদনামের চেয়ে কম হইবে না।
প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার এমন কাজের মধ্যে দুইটি প্রধান। এক, দুই অঞ্চলের মধ্যে সম-প্রতিনিধিত্বের স্থলে জনসংখ্যা ভিত্তিক প্রতিনিধিত্বের পুনঃপ্রতিষ্ঠা। দুই, পশ্চিম পাকিস্তানের ওয়ান ইউনিট ভাংগিয়া দিয়া প্রদেশগুলিকে পূর্ব অবস্থায় পুনর্বহাল করা। দৃশ্যতঃ দুইটি কাজই জনমতের দাবি পূরণের উদ্দেশেই করা হইয়াছে। কিন্তু আসলে এটাই জনমতের দাবি ছিল কি না তা যেমন বিচার করিতে হইবে, নয়া ব্যবস্থায় দেশের সমস্যা মিটিল কি না, লাভ কি ক্ষতি হইল তাও বিচার করিয়া দেখিতে হইবে।
এটা বিচার করিতে হইলে মনে রাখিতে হইবে যে এই দুইটি বিষয় পাকিস্তান রাষ্ট্রীয় কাঠামোর প্রতিষ্ঠিত পাঁচটি সতু ও রুকনের অন্যতম। দীর্ঘদিনের অনিশ্চয়তা ও চিন্তা-বিভ্রান্তির পরে এই পাঁচটি সতু ও রুকন চূড়ান্তরূপে মীমাংসিত হইয়া গিয়াছিল।
(১) পাকিস্তান পার্লামেন্টারি ফেডারেল রিপাবলিক।
(২) দুইটি পূর্ণ স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল। তার মানে পশ্চিমা ওয়ান ইউনিট।
(৩) দুই অঞ্চলের সার্বিক প্যারিটির প্রথম স্তর হিসাবে প্রতিনিধিত্বের প্যারিটি। তার মানে যুক্ত নির্বাচন প্রথা।
(৪) উর্দু ও বাংলা দুইটি সম-মর্যাদার রাষ্ট্র ভাষা।
(৫)করাচি ফেডারেশনেরক্যাপিটাল।
প্রেসিডেন্ট আইউব তাঁর ডিক্টেটরির শুরুতেই এই পাঁচটি সতুনের দুইটি (এক নর ও পাঁচ নর) ভাংগিয়া ফেলেন। পার্লামেন্টারি ফেডারেল পদ্ধতির বদলে তিনি প্রেসিডেনশিয়াল ইউনিটরি ব্যবস্থা করিয়া ফেলেন। রাজধানী ব্রাচি হইতে মিলিটারি হেড কোয়ার্টার পিণ্ডিতে লইয়া যান। মার্শাল ল করিতে জনমত লাগে না। কাজেই রাজধানী স্থানান্তরিত করতে ও রাষ্ট্রের প্যাটার্ন বদলাইতেও জন-মতের দরকার নাই। এটাই ছিল আইউবের এটিচুড। বাকী থাকিল তিনটি সতুন। প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া ভাংগিলেন আরও দুইটি (দুই নম্বর ও তিন নম্বর)। বাকী থাকিল মাত্র চার নম্বরেরটি উর্দু ও বাংলা রাষ্ট্রভাষা।
পাকিস্তান নয়া রাষ্ট্র নামেও জাতিত্বেও। তেইশ বছরের কুশাসন ও ভুল পরিচালনার ফলে আমাদের রাষ্ট্রীয় ও জাতীয় জীবনের বিদ্যমান সমস্যাগুলির এই পাঁচটি বাদে আর একটাও মিটান হয় নাই, বরঞ্চ নিত্য-নতুন সমস্যা সৃষ্টি করা হইয়াছে। বহুদিনের ঝাঁকাঝাঁকি ও টানা-হেঁচড়ায় ঐ পাঁচটি ব্যাপারের মীমাংসা হইয়াছিল। আসল সমস্যাগুলি মিটাইবার রাস্তা পরিষ্কার হইয়াছিল।
অবশিষ্ট সমস্যাগুলির মীমাংসা করার বদলে মীমাংসিত বিষয়গুলি পুনরায় উন্মুক্ত করা খুবই ঘোরতর বিপজ্জনক কাজ হইয়াছে। এর ফলে পাকিস্তান রাষ্ট্রের ভিত্তিমূলে ফাটল ধরিয়াছে। এ সবের মধ্য করাচি হইতে রাজধানী স্থানান্তরের কথাটা আগেই আলোচনা করিয়াছি। নতুন কথার মধ্যে শুধু এইটুকু বলিলেই চলিবে যে রাজধানীর সেটড ব্যাপারটা যখন আনসেটলড হইয়াছে, তখন ন্যায্যতঃ যেখানে রাজধানী থাকা উচিৎ সেই মেজরিটির অঞ্চল পূর্ব-পাকিস্তানেই তাকে আনিতে হইবে। ন্যায়তঃ রাজধানী ঢাকাতেই হওয়া উচিৎ ছিল গোড়াতেই। শুধু জাতির পিতা কায়েদে-আযমের সম্মানে পূর্ব-পাকিস্তানীরা করাচি রাজধানী রাখিতে রাযী হইয়াছিল। কায়েদে আযমের সম্মান রাখিতে যদি পশ্চিম-পাকিস্তানীরা রাযী না হয় তবে আমরা আমাদের ন্যায্য দাবি ছাড়িব কেন? বস্তুতঃ কাউন্সিল মুসলিম লীগ তাদের সাত দফা দাবির মধ্যে ঢাকায় রাজধানী স্থাপনের দাবি করিয়াছেন। প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া এদাবির জবাবে তাঁর ব্যক্তিগত মত প্রকাশ করিতে গিয়া বলিয়াছেন : রাজধানী বারেবারে পরিবর্তন করা যায় না। প্রথমতঃ এ ব্যক্তিগত মত গণ-পরিষদেরউপর বাধ্যকরনয়। দ্বিতীয়তঃ এ কথার জবাবে বলা যায় যে দেশবাসীর কোনও নির্বাচিত আইন পরিষদ রাজধানী বারেবারে দূরের কথা, একবারও বদলায় নাই। প্রেসিডেন্ট আইউব তাঁর ব্যক্তিগত খেয়াল-খুশীমত একবারই রাজধানী বদল করিয়াছেন। এই পরিবর্তন ঠিক রাখতে হইলেও আসন্ন নির্বাচিত পার্লামেন্টের এতে নিশ্চয়ই অনুমোদন লইতে হইবে। সে অনুমোদনের বেলা ঢাকা ও করাচির কথা নিশ্চয়ই বিবেচনা করিতে হইবে। প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া বা অন্য কোনও নেতা এটাকে ‘ক্লোযড’ প্রশ্ন বলিতে পারেন না।
