প্রেসিডেন্টের এই আদেশ মানিতে বাধ্য ছিলেন। না মানিলে বরঞ্চ অবাধ্যতা হইত ও আনুগত্যের খেলাফ কাজ করা হইত। কাজেই স্পষ্টতঃই জেনারেল ইয়াহিয়া ব্যক্তিগত ক্ষমতালোভে রাষ্ট্রের শাসনভার নেন নাই। বরঞ্চ বলা যায় অনিচ্ছা সত্ত্বেও নিয়াছেন।
দ্বিতীয় ব্যাপারটা হইতে প্রথমটা পরিষ্কার বোঝা যায়। তিনি প্রথম হইতেই গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার দ্বারা জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধি-সরকারের হাতে রাষ্ট্র ক্ষমতা তুলিয়া দিবার সকল প্রকার চেষ্টা করিয়াছেন। সে চেষ্টায় তিনি দেশময় ভ্রমণ করিয়াছেন। রাজনৈতিক দলসমূহের নেতাদের সাথে পৃথক ও সমবেত আলাপ আলোচনা করিয়াছেন। এই আলাপ-আলোচনায় তিনি নেতাদের বিভিন্ন ও পরস্পর বিরোধী মতবাদের ভিতরে একটা সমঞ্জস মধ্যপন্থা আবিষ্কারের চেষ্টা করিয়াছেন। শেষ পর্যন্ত নির্ধারিত মেয়াদে ও তারিখে সার্বজনীন ভোটে প্রত্যক্ষ নির্বাচনে আইন পরিষদ গঠনের ব্যবস্থা করিয়াছেন। সেই আইন পরিষদকে প্রাথমিক পর্যায়ে গণ পরিষদ রূপে শাসনতন্ত্র রচনার দায়িত্ব দিয়াছেন। মার্শাল ল’র অস্বাভাবিক ও অগণতান্ত্রিক অবস্থা হইতে গণতন্ত্রে ফিরিয়া যাইবার এর চেয়ে উত্তম আর কোন রাস্তা নাই। কাজেই এই পর্যন্ত প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া নির্ভুল পথে অগ্রসর হইয়া ঠিক-ঠিক কাজই করিয়াছেন।
কিন্তু এই দিকে না গিয়া অন্য দিকে তাঁর যাওয়া উচিত ছিল। সেটা না করাই তাঁর প্রথম ভুল। এই ভুল ‘৫৬ সনের শাসনটি পূনর্বহাল না করা। চীফ মার্শাল ল এডমিনিস্ট্রেটর হিসাবে তিনি এটা করিবার সম্পূর্ণ অধিকারী ছিলেন। এটা করিতে তাঁর জনমত যাচাই করিবার দরকার ছিল না আইন বা নীতির কোনও দিক দিয়াই।
অথচ এটা করা দরকার ছিল। দরকার ছিল পাকিস্তান রাষ্ট্রের ও সরকারের লেজিটিমেসি (বৈধতা) ও কন্টিনিউটি (সিলসিলা)র জন্য। ১৯৫৮ সালের ৭ই অক্টোবর পর্যন্ত পাকিস্তান রাষ্ট্র ও সরকারের লেজিটিমেসি ও কনটিনিউটি বজায় ছিল। খাজা নাজিমুদ্দিনের বেআইনীভাবে প্রধানমন্ত্রী হওয়া, গোলাম মোহাম্মদের খাজা সাহেবকে ডিসমিস করা এবং শেষ পর্যন্ত গণ-পরিষদ ভাংগিয়া দেওয়া, কোনটাতেই রাষ্ট্রের বা সরকারের লেজিটিমেসি ও কনটিনিউটি ব্যাহত হয় নাই। গণ-পরিষদ ভাংগার দরুন যে সংকট দেখা দিয়াছিল, সুপ্রীমকোট সেটা রেগুলারাইয করিয়া দিয়াছিল। রাষ্ট্রের ও সরকারের লেজিটিমেসি ভংগ ও কনটিনিউটি ছিন্ন হয় প্রথম ১৯৫৮ সালের ৭ই অক্টোবর হইতে। এই দিন ইস্কান্দর-আইউবের ষড়যন্ত্রে পাকিস্তানের শাসনতন্ত্র বেআইনী বেদাঁড়াভাবে বাতিল করা হয়।
পাকিস্তানের মত ভৌগোলিক আকৃতির নয়া জাতির ও নয়া নামের নয়া রাষ্ট্রের জন্য লেজিটেমেসি ভাংগা কনটিনিউটি ছিন্ন করা অত্যন্ত বিপজ্জনক। ইতিহাস তার সাক্ষী। কাজেই যথাসম্ভব শীঘ্র ও প্রথম সুযোগেই এই লেজিটিমেসি ও কন্টিনিউটি পুনর্বহাল অত্যাবশ্যক। সেটা আজও হয় নাই। ১৯৬২ সালে আইউব ব্যক্তিগতভাবে যে শাসনতন্ত্র দিয়াছিলেন, তার দ্বারা এই কাজটি হয় নাই। ঐ শাসনতন্ত্র নিজেই বেদাঁরা ও কেইনী ছিল। ফলে ‘৫৮ সালের ৭ই অক্টোবর পাকিস্তান রাষ্ট্রের ও সরকারের যে লেজিটিমেসি ও কনটিনিউটি ছিন্ন হইয়াছিল, ‘৬২ সালের তথাকথিত শাসনতন্ত্রে তা জোড়া লাগে নাই। রাষ্ট্র ও সরকারের বেদাঁরা ও বেআইনী অস্তিত্ব চলিতেই থাকে। ১৯৬৯ সালের ২৫শে মার্চ জেনারেল ইয়াহিয়া যে মার্শাল ল ঘোষণা করেন তাতে আইউবের ঘোষিত মার্শাল ল’র বর্ধিত মেয়াদই চলিতে থাকে। প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া সোজাসুজি পাকিস্তান রাষ্ট্রকে ‘৫৮ সালের ৭ই অক্টোবরের লেজিটিমেসি ও কনটিনিউটিতে পুনর্বহাল করিতে পারিতেন। ‘৫৬ সালের শাসনতন্ত্র পুনর্বহাল করিলেই এটা ঘটিত। প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া একটি মাত্র ঘোট ঘোষণায় ইহা করিতে পারিতেন। এতে এক সংগে দুইটা ব্যাপার ঘটিয়া যাইত। এক, পাকিস্তান রাষ্ট্রের ও সরকারের লেজিটিমেসি ও কন্টিনিউটি (বৈধতা ও সিসিলা) পুনর্বহাল হইয়া যাইত। দুই, এই অক্টোবরের শাসনত্ম বাতিলের বেআইনী কাজটি অননুমোদিত ও নিন্দিত হইয়া যাইত। এই দ্বিতীয় ঘটনাটির দ্বারা ভবিষ্যতের সম্ভাব্য শাসন বাতিলের আশংকা তিরোহিত হইয়া যাইত। পাকিস্তান রাষ্ট্র ও পাকিস্তানের জনগণ কোনও প্রকার শাসনবিরোধী বিপ্লব’ চায় না, এটা প্রতিষ্ঠিত হইয়া যাইত।
কিন্তু প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া এটা করেন নাই স্পষ্টতঃই এই জন্য যে ৫৬ সালের শাসনতন্ত্র আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসনের অভাব-হেতু পূর্ব-পাকিস্তানে এবং ওয়ান ইউনিটের বিধান হেতু পশ্চিম পাকিস্তানে অজনপ্রিয় ও অগ্রহণযোগ্য ছিল। এই পরিস্থিতিটা চিফ মার্শাল ল এডমিনিস্ট্রেটর প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার জন্য দুঃসাধ্য ও অসমাধ্য সমস্যা ছিলনা। তিনি তাঁর আইন-উপদেষ্টাদের দ্বারা ঠিকমত উপদিষ্ট হইলে সহজেই এর সমাধান করিতে পারিতেন। চিফ মার্শাল ল এডমিনিস্ট্রেটর হিসাবে খুব ন্যায় সংগতভাবে ও জোরের সাথে তিনি সমস্ত দলের নেতাদিগকে বলিতে পারিতেন : ‘রাষ্ট্রের ও সরকারের লেজিটিমেসি ও কনটিনিউটির জন্য আমি ‘৫৬ সালের শাসনক্স পুনরুজ্জীবিত করিয়া রাষ্ট্রকে পূর্বের বৈধ অবস্থায় পুনর্বহাল করিতে বাধ্য। এ কাজে আপনারা আমার সহযোগিতা করুন। আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন ও ওয়ান-ইউনিট রদ-বদলের বিধান সম্বন্ধে আপনারা একমত হইয়া সুপারিশ করুন। আমি রাষ্ট্রের প্রধান হিসাবে সুপ্রিম কোর্টে রেফারেন্স করিয়া সে সব সুপারিশ আইনসিদ্ধ বাধ্যকর করিয়া লই।‘ প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার চার মাসের শর্তের মতই এই কথার প্রতিক্রিয়াও শুভ হইত। ঐ ধরনের সুপারিশের ভিত্তিতে ‘৫৬ সালের শাসনতন্ত্র বহাল হইলে একদিকে যেমন লেজিটিমেসি-কনটিনিউটি জোড়া লাগিত, অপর দিকে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার লিগ্যাল ফ্রেম ওয়ার্ক ঘোষণার কোন দরকার হইত না। লিগ্যাল ফ্রেমওয়ার্কের বেশীর ভাগই ৫৬ সালের শাসনতন্ত্রেই আছে।
