এ ভুলটা প্রধানতঃ নেতাদের। প্রেসিডেন্ট আইউবের ভুল ততটা নয়। প্রেসিডেন্ট আইউব স্বভাবতঃই অতিমাত্রায় ত্রস্ত-ব্যস্ত হইয়া পড়িয়াছিলেন। কিন্তু নেতারা ইচ্ছা করিলেই তার প্রতিকার করিতে পারিতেন। সম্মিলনীতে কাকে-কাকে দাওয়াত দিতে হইবে, তা ঠিক করিবার তার প্রেসিডেন্ট নেতাদের উপর সম্পূর্ণরূপে ছাড়িয়া দিয়াছিলেন। সে দায়িত্ব পালনে নেতারা চরম শোচনীয় অযোগ্যতার পরিচয় দিয়াছেন। সে অযোগ্যতার ও অদূরদর্শিতার সবচেয়ে বড় প্রমাণ এই যে সম্মিলনীতে (১) কোনও মাইনরিটি প্রতিনিধিকে, (২) কোনও নারী প্রতিনিধিকে দাওয়াত দেওয়া হয় নাই। পাকিস্তানের বারকোটি অধিবাসীর মধ্যে দেড়কোটি মুসলমান। পূর্ব পাকিস্তানে এরা গোটা বাসেন্দার প্রায় এক-পঞ্চমাংশ। মুখে এদেরে সমান-অধিকারভোগী নাগরিক বলা হয়। গত দুই-দুইটা শাসনতন্ত্রেই এদের সকল প্রকার নাগরিক অধিকারের সুস্পষ্ট বিধান করা হইয়াছে। পার্লামেন্টারি আমলের কয়েক বছর কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক সরকারে যথেষ্ট-সংখ্যক মাইনরিটি মন্ত্রী নেওয়া হইত। তাঁরা সকলেই যোগ্যতা ও আনুগত্যের সাথে মেম্বরগিরি ও মন্ত্রিগিরি করিয়াছেন। কিন্তু ১৯৫৮ সালে মার্শাল ল হওয়ার পর হইতে এগারটি বছর পাকিস্তানের রাজনীতি হইতে গোটা মাইনরিটি সম্প্রদায় মুছিয়া গিয়াছে। এই দশ বছরে কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভায় ও আইন পরিষদে একজন হিন্দুরও স্থান হয় নাই। পূর্ব পাকিস্তানের মন্ত্রিসভায় প্রায় দুই ডজনের মধ্যে একজন মাত্র অমুসলমান মন্ত্রী কিছুদিনের জন্য নেওয়া হইয়াছিল। শিক্ষা-দীক্ষায় উন্নত, দেশের স্বাধীনতার জন্য যুগ-যুগ ধরিয়া উৎসগীকৃত-প্রাণ, চরম প্রতিকূল অবস্থার মধ্যেও আজও পাকিস্তানের বিভিন্ন ক্ষেত্রে জনসেবায় নিযুক্ত হিন্দুদের প্রতি এমন উপেক্ষা অবহেলা দেখাইয়া আমরা কিরূপে তাঁদের মনে পাকিস্তানী জাতির অনুগত ও গর্বিত মেম্বর হিসাবে ‘আমরাত্ব’ ও ‘আমাদেরত্ব’ সৃষ্টি আশা করিতে পারি? অবশ্য গত এগার বছরের ব্যাপারের জন্য গণন্ত্রী নেতারা দায়ী ছিলেন না। ডিক্টেটর আইউবের খেয়াল খুশী মতই রাষ্ট্র চলিয়াছে। মানিলাম। কিন্তু এ বঞ্চনা ও মাইনরিটির প্রতি এই অবিচারের প্রতিকারের প্রথম সুযোগ ছিল গোল টেবিল বৈঠকের আয়োজন। সেখানে নেতারা কি করিয়াছেন? প্রেসিডেন্ট আইউব নেতাদের হাতেই নিমন্ত্রিতদের সংখ্যা, প্রকৃতি ও নাম ঠিক করিবার ভার দিয়াছিলেন। রাউও টেবিল সফল হউক বা বিফল হউক, তাঁর কোনও ক্ষমতা থাকুক বা না থাকুক, গোটাজাতির রাজনৈতিক ভাগ্য নির্ধারণের মহান উদ্দেশ্য লইয়াই ঐ সম্মিলনী বসিয়াছিল। পাকিস্তানের শতকরা দশজন ও পূর্ব পাকিস্তানের শতকরা বিশজন অধিবাসীকে বাদ দিয়া, আলোচনায় শরিক না করিয়া, জাতির ভাগ্য নির্ধারণ করা উচিত বা সম্ভব, নেতারা কি রূপে তা ভাবিতে পারিলেন?
তারপর ধরুন, নারীর প্রতিনিধিত্বের কথা। আর আর দেশের মতই পাকিস্তানেও নারী-পুরুষের সংখ্যা সমান। পাকিস্তানের নারীরা শিক্ষা-দীক্ষায় রাজনৈতিক কৃষ্টিক সাহিত্যিক জীবনে অন্যান্য বহু নয়া রাষ্ট্রের তুলনায় অনেক উন্নত। পাকিস্তান আন্দোলনে ও পরবর্তীকালের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে নারীজাতির অবদান সামান্য নয়। দুই দুইটা শাসনতন্ত্রে যতই কম হউক নারী জাতির জন্য আসন রিযার্ভ ছিল। প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়াও প্রস্তাবিত আইন পরিষদে কয়েকটি আসন নারীর জন্য রিজার্ভ রাখিয়াছেন। এর বাহিরে সাধারণ আসনেও নারীর ক্যানডিউেট হওয়ার অধিকার স্বীকৃত হইয়াছে। কালক্রমে সাধারণ আসনেও নারীরা নির্বাচিত হইবেন। অথচ আশ্চর্য এই যে গোলটেবিল বৈঠকে প্রতিনিধিত্বের বেলা নারী জাতির কথা নেতাদের একবার মনেও পড়িল না। বর্তমান যুগে নারী জাতিকে বাদ দিয়া, আলোচনায় নারীকে অংশ গ্রহণের অধিকার ও সুযোগ না দিয়া, যে-দেশের নেতারা জাতির রাষ্ট্রীয় সামাজিক ও অর্থনৈতিক ভাগ্য নির্ধারণ করিতে চান, তাঁরা ব্যর্থ হইতে বাধ্য। আমাদের গোলটেবিল ব্যর্থ হইবার এটাও একটা বড় কারণ।
৬. প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার ভুল
জেনারেল ইয়াহিয়াও আমাদের জাতীয় ইন্টেলিজেন্শিয়ার অংশ। সেই হিসাবে আগের-আগের নেতাদের মত ভুল তিনিও করিয়াছেন এবং করিতেছেন। এটা দুর্ভাগ্যবশতঃ আমাদের শিক্ষিত সম্প্রদায়ের রাজনৈতিক চিন্তা-ধারার মৌলিক ত্রুটি। কাজেই প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া যদি ভুল করিয়া থাকেন, তবে সেটা অস্বাভাবিক কিছু নয়।
প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার একটি মাত্র ভুলেরই বিচার আমরা এখন করিতে পারি। আর সব ভুলের বিচারের সময় এখনও আসে নাই। সেগুলি আদৌ তুল কি না, তাও বলা যায় না। কারণ তাঁর কাজ আজও সমাপ্ত হয় নাই। যখন হইবে তখনই দুইটি কথা মনে রাখিয়াই প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার কাজের বিচার করিতে হইবে।
সে দুইটি কথার একটি এই যে, যে-মার্শাল ল’র বলে তিনি চিফ মার্শাল ল এডমিনিস্ট্রেটর ও প্রেসিডেন্ট হইয়াছেন, সে মার্শাল ল তাঁর ইচ্ছাকৃত সৃষ্টি নয়। এইখানে আমাদিগকে জেনারেল আইউবের মার্শাল ল’ এবং জেনারেল ইয়াহিয়ার মার্শাল ল’র বুনিয়াদী পার্থক্যটা উপলব্ধি করিতে হইবে। জেনারেল আইউব মার্শাল ল’ করিয়াছিলেন রাজনৈতিক অভিষ্ট হাসিলের জন্য আগে হইতে চিন্তা-ভাবনা করিয়া। সে কাজ করিতে গিয়া তিনি আনুগত্যের শপথ ভাংগিয়া নিজের উদ্দেশ্য সফল করিয়াছেন। পক্ষান্তরে জেনারেল ইয়াহিয়া পূর্বকল্পিত কোন রাজনৈতিক উদ্দেশ্য লইয়া মার্শাল ল করেন নাই। সে কাজ করিতে গিয়া তাঁর আনুগত্যের শপথও ভাংগিতে হয় নাই। বরঞ্চ তিনি আনুগত্যের শপথ অনুসারেই মার্শাল ল করিতে বাধ্য হইয়াছিলেন। জেনারেল আইউব রাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ও দেশরক্ষা বাহিনীর সুপ্রীম কমাণ্ড হিসাবে প্রধান সেনাপতি জেনারেল ইয়াহিয়ার রাষ্ট্রীয় মনিব ছিলেন। তাঁরই কাছে জেনারেল ইয়াহিয়া খাঁর আনুগত্য। সেই প্রেসিডেন্ট ও সুপ্রিম কমাণ্ড লিখিতভাবে জেনারেল ইয়াহিয়াকে আদেশ দিয়াছিলেন। দেশের শাসন-তার তাঁহার নিজের হাতে নিতে। জেনারেল ইয়াহিয়া
