পলিটিশিয়ানদের এই দুর্বলতাই দেশের প্রধান সেনাপতির পক্ষে রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের পথ পরিষ্কার করিয়া দিয়াছে। তাঁদের এই দুর্বলতাই আইউবী আমলকে দশ বছরস্থায়ীকরিয়াছে। এই নিরংকুশ একনায়কত্বের দরুন আইউব তাঁর উন্নয়ন দশকে শাসনযন্ত্রের সমস্ত কাঠামোই এমন তছনছু করিয়াছেন যে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার পর এর সবগুলিই আবার কেচে গণ্ডুষ করিতে হইবে।
কিন্তু কাজটা শুধু কঠিন নয়। প্রায় অসম্ভব। অবাধ্যতা, উচ্ছংখলতা কর্তব্যে অবহেলা, স্তাবকতা, উচ্চাকাংখা, রেষারেষি ও স্বজনপ্রীতি সব মিলিয়া আজ আমাদের শাসনযন্ত্র ঘূণে ঝর-ঝরা হইয়া গিয়াছে। ভাংগিয়া পড়ার অবস্থা। সাম্প্রতিক কালে বর্তমান শাসনামলে ৩০৩ জন উচ্চপদস্থ কর্মচারির আচরণই তার প্রমাণ। এ সম্পর্কে আমার নেতা শহীদ সাহেবের একটা কথা মনে পড়িতেছে। ১৯৬১ সালের শেষের দিকে একবার তাঁকে জানান হয় যে পশ্চিমা গণন্ত্রী দেশ সমূহের চাপে জেনারেল আইউব গণতন্ত্র পুনঃপ্রর্বতনে রাযী হইয়াছেন এবং তারই প্রথম পদক্ষেপ হিসাবে শহীদ সাহেবের নেতৃত্বে বিভিন্ন দলের নেতাদের হাতে ক্ষমতা ফেরত দিতে রাযী হইয়াছেন। অবশ্য শহীদ সাহেবের এন্তেকালের পরে আইউব সাহেব তার প্রভু নয় বন্ধু বই-এ এই গুজবের তীব্র প্রতিবাদ করিয়াছেন। কিন্তু গুজবটার সত্য মিথ্যা বিচার করে এর উল্লেখের উদ্দেশ্য নয়। শহীদ সাহেবের অভিমতটাই এখানে বিচার্য। তিনি এ অফার আসিবার খবর পাইয়া আমাদের সকলের সাথে সমবেত ও পৃথকভাবে আলোচনা করেন। তাঁর জিগগাস্য ছিলঃ অমন অফার আসিলে তিনি সে দায়িত্ব নিবেন কি না? আমরা সবাই প্রায় এক বাক্যে বলিলাম : যে রাষ্ট্রক্ষমতা পুনরুদ্ধারের জন্য আমরা প্রত্যক্ষ সংগ্রাম ও গণ-আন্দোলনের কথা ভাবিতেছি, আইউব সেটা স্বেচ্ছায় ফিরাইয়া দিতে চাহিলে তা না নেওয়া হইবে জনগণের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা। এই যুক্তিতে আমরা সর্বসম্মত রায় দিলাম : তেমন অফার আসিলে তা নিতেই হইবে। তখন শহীদ সাহেব বলিলেন : এই তিন বছরে আইউব শাসনযন্ত্রে এমন অচিন্তনীয় বিশৃংখলা ঢুকাইয়াছেন যে আমার ভয় হয়, শাসন-তার হাতে নিয়া আমরা গণতান্ত্রিক মামুলি উপায়ে সরকার চালাইতে পারি না; কঠোর হস্তে এমন ওলট-পালটের দরকার হইবে যে এক পার্টি-ডিক্টেটরশিপ ছাড়া তেমন কঠোরতা সম্ভব নয়। তেমন অবস্থা আমাদের দেশে নাই। করিতে গেলে গণতন্ত্র থাকিবে না।
লিডারের কথায় ও মুখ-তাবে অমন অতি নৈরাশ্য দেখিয়া ব্যক্তিগতভাবে আমি দুঃখিত হইয়াছিলাম। সৌভাগ্য বশতঃ আইউব শেষ পর্যন্ত তেমন অফার দেন নাই।
শহীদ সাহেব যখন এ-কথা বলিয়াছিলেন, তারপরে আরও সাত বছর আইউবের ঐ ডিক্টেটরি চলিয়াছে। শাসনযন্ত্রে আরও বেশী ঘূণে ধরিয়াছে। শহীদ সাহেবের ঐ আশংকার কারণ গভীরতায় ও ব্যাপকতায় আরও বাড়িয়াছে। শাসনযান্ত্রিক ব্যাপারেও ব্যক্তিগতভাবে আমি শহীদ সাহেবের মতের মূল্য বরাবরই দিতাম। চিন্তার সেই অভ্যাস বশতঃই আজও আমার মনে হয়, আমাদের শাসন মেরামতের স্তর পার হইয়া গিয়াছে। জেনারেল ইয়াহিয়ার আন্তরিক চেষ্টায় গণতন্ত্রের পুনঃপ্রতিষ্ঠার শুভ দিন যতই আসন্ন হইতেছে, গণতান্ত্রিক পাকিস্তানের সুখ-সৌভাগ্যের কথা ভাবিয়া যতই উৎফুন্ন হইতেছি, কল্যাণমূলক রাষ্ট্র জনগণের জীবনের রংগীন ছবির গোলাবী কল্পনায় যতই রোমাঞ্চ বোধ করিতেছি, শাসনযন্ত্রে উচ্ছংখলতার দিকে চাহিয়া ততই আতংকিত হইতেছি। সত্যই কি শাসনযন্ত্রে বিপ্লবী পরিবর্তন না আনিলে নির্বাচিত সরকার জন কল্যাণের কিছু করিতে পারিবেন না? গণতন্ত্র কি এবার সত্য-সত্যই ফেল করিবে? যদি তাই হয় তবে তার প্রতিকারের জন্য সুশৃংখল সংঘবদ্ধ আদর্শবাদী তেমন শক্তিশালী পার্টি ডিক্টেটরশিপ পাইব কোথায়?
এমনি জটিল সমস্যার সামনে দেশকে নিক্ষেপ করিয়াছে জেনারেল আইউবের দশ বছরস্থায়ী ব্যক্তি-ডিক্টেটরশিপ। পার্লামেন্টারি আমলে এ বিপদ আমাদের ছিল না। যতই অযোগ্য ও দিশাহারা হউন আমাদের পার্লামেন্টারি নেতারা পার্লামেন্ট অফিশিয়ালদেরে অত খারাপ করিতে পারেন নাই। অধিকাংশ অফিসারই তখন বৃটিশ ঐতিহ্যের রাজনীতিক নিরপেক্ষতা রক্ষা করিয়া চলিয়াছেন।
ব্যক্তি-ডিক্টেটরশিপ ও পার্টি-ডিক্টেটরশিপ উভয়টাতেই অসাধারণ মনীষার দরকার। গণতন্ত্র অসাধারণ প্রতিভাধর নেতৃত্বের দরকার নাই। এইখানেই ডিক্টেটরশিপের চেয়ে গণতন্ত্র শ্রেষ্ঠ। আমাদের রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যে গণতান্ত্রিক চেতনার অভাবই গণতন্ত্রকে ডিক্টেটরশিপের পদানত করিয়াছিল।
রাজনৈতিক নেতাদের অন্তর্নিহিত এই দুর্বলতার জন্যই আইউবী স্বৈরাচারের অবসান করিতে দশ বছর লাগিয়াছে। এটাও করিয়াছে প্রধানতঃ ছাত্র-তরুণদের নেতৃত্বে জনসাধারণ। নেতাদের কৃতিত্ব এতে সামান্যই আছে। নিঃস্বার্থ সংগ্রামী ছাত্র তরুণদের নেতৃত্বের গণআন্দোলনের ফলে ডিক্টেটর আইউব মাথা নত করিতে বাধ্য হইলেন। তিনি নেতাদের সাথে গোল টেবিল বৈঠকে বসিতে রাযী হইলেন। দেশের নেতৃত্বের ঐ অন্তর্নিহিত দুর্বলতাই শেষ পর্যন্ত গোল টেবিল বৈঠক ব্যর্থ করিয়া দিল।
গোলটেবিল বৈঠক ফেল হইবার অনেক কারণ ছিল। তার মধ্যে সবচেয়ে বড় কারণ এই যে এটা আসলে গোলটেবিল সম্মিলনীই ছিল না। প্রেসিডেন্ট আইউব ও নেতাদের কেউই এই সম্মিলনীর প্রাপ্য মর্যাদা তাকে দেন নাই। এটাকে জাতির ভাগ্য নির্ধারণের একটা পবিত্র ঘটনা বলিয়া কেউ মনেই করেন নাই। করেন নাই বলিয়াই এই সম্মিলনীর কোন সিরিয়াস প্রস্তুতি ও ম্যাজিষ্টিক গাম্ভীর্য ছিল না। একদিকে প্রেসিডেন্ট আইউব ফাটিয়া-পড়া গণ-আক্রোশের মুখে। আত্মরক্ষার তাগিদে রাজনৈতিক নেতাদের সাথে একটা যাবে-তাবে বোঝাঁপড়া করিতে চাহিয়াছিলেন যত পারেন কম দাম দিয়া। অপর দিকে ক্ষুধার্ত নেতারা প্রেসিডেন্ট আইউবের বর্তমান বিপদের সুযোগে গদি দখল করিতে চাহিয়াছিলেন যতটা পারেন বেশী দাম আদায় করিয়া। উভয়পক্ষের মনেই ছিল ত্রস্ত-ব্যস্ততার তাগিদ। তাঁদের প্রতি কাজে যে ব্যস্ততা ফাটিয়া পড়িতেছিল। একদিকে কনফারেন্সে সমবেত নেতাদের সাথে আন্দোলনের ম্পিয়ারহেড ছাত্র-জনতার কোন যোগাযোগ ছিল না। নেতারা আন্দোলনকে শক্তিশালী সুসংহত ও নিয়ন্ত্রিত করিবার কোন চেষ্টাই করেন নাই। এইভাবে আন্দোলনে নেতাদের কোন অবদান ছিল না বলিয়া স্বভাবতঃই তার উপর কোনও প্রভাব তাঁদের ছিল না। ছিল না বলিয়াই কনফারেন্সের মূদ্দতের জন্য কোনও আর্মিস্টিস্ও ঘোষণা করেন নাই। এদিকে নেতাদের ব্যস্ততা ও তাড়াহুড়ায় ছাত্র-তরুণরা স্বভাবতই সন্দিগ্ধ হইয়া পড়ে। তাদের আশংকা হয়, নেতাদের অনেকেই গদির দামে গণতন্ত্র ও গণ-স্বার্থ বিক্রয় করিয়া আইউবের সাথে আপোস করিয়া ফেলিতেছেন। মওলানা ভাসানী ও মিঃ জুলফিকার আলী ভুট্টোর মত জনপ্রিয় নেতৃদ্বয় সম্মিলনীতে যোগ না দেওয়ায় ছাত্র-তরুণ ও জনতার এই সন্দেহ আরও দৃঢ় হয়। কাজেই সম্মিলনীর বৈঠক চলিতে থাকা অবস্থায়ও দেশের সার্বিক কল্যাণের কথা চিন্তা করিবার ও সুষ্ঠু সিদ্ধান্ত নিবার উপযুক্ত আবহাওয়া সম্মিলনীর বৈঠকে বা বাহিরে দেশের মধ্যে সৃষ্ট হয় নাই।
