৪. আগড়তলা ষড়যন্ত্র মামলা
জেনারেল আইউবের সর্বশেষ ও সব চেয়ে আত্মঘাতী ভুল হইয়াছে, তথাকথিত আগড়তলা ষড়যন্ত্র মামলা করা। যদি মামলায় বর্ণিত সব বিবরণ সত্য হইত, তবু আইউব সরকারের এই মামলা পরিচালনা করা উচিত হইত না। দেশরক্ষা বাহিনীর পূর্ব-পাকিস্তানী অফিসারদের বিরুদ্ধে সে অবস্থায় বিভাগীয় দণ্ডবিধান করিলেই যখে হইত। তানা করিয়া ঢাক-ঢোল পিটাইয়া পূর্ব-পাকিস্তানী অফিসারদের বিরুদ্ধে পূর্ব বাংলা স্বাধীন করিবার অভিযোগে একটা রাজনৈতিক চাঞ্চল্যকর মামলা দায়ের করা হইল। তার উপর মামলার তদন্তাদি কার্য শেষ করিয়া আসামীদের বিরুদ্ধে চার্জশিট করিবার পর পূর্ব-বাংলার সবচেয়ে জনপ্রিয় সর্বাপেক্ষা নির্যাতিত এবং তথাকথিত ঘটনার সময়ের আগাগোড়া জেলখানায় বন্দী, তরুণ নেতা শেখ মুজিবুর রহমানকে নূতন করিয়া মামলার আসামী ত করা হইলই, এক নম্বর আসামী করা হইল। এই একটি মাত্র ঘটনায় মামলাটির অন্তর্নিহিত রাজনৈতিক দূরভিসন্ধি ধরা পড়িল। তিন তিনজন সিনিয়ার পূর্ব-পাকিস্তানী সি. এস. পি. অফিসারকে কেন আসামী করা হইয়াছিল, মুজিবুর রহমানকে আসামী করা হইতে গণ-মনে তা সুস্পষ্ট হইয়া পড়িয়াছিল। তিনজন সি. এস. পি অফিসারই কেন্দ্রীয় সরকারের সেক্রেটারি হইবার যোগ্যতা অর্জন করিয়াছিলেন। বিশেষতঃ ঐ তিন জনের মধ্যে একজন তাঁর মনীষা পাণ্ডিত্য ও শিষ্টাচারের জন্য অফিসারদের মধ্যে এবং সাধারণ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় শ্রদ্ধেয় ও সম্মানিত ব্যক্তি ছিলেন। তার উপর ইনি হইলেন পূর্ব বাংলার সবচেয়ে জনপ্রিয় সাবেক প্রধান মন্ত্রী জনাব আতাউর রহমান খাঁর কনিষ্ঠ সহোদর। এইভাবে এই মোকদ্দমা বাংগালী মিলিটারি অফিসারদেরেই শুধু নয় পূর্ব বাংলার সবচেয়ে জনপ্রিয় দুইজন রাজনৈতিক নেতাকেই কার্যতঃ পূর্ব বাংলার স্বাধীনতার ষড়যন্ত্রে জড়ান হইল। এটা ত গেল মামলার বিশ্রী চেহারার দিক।
পরিবেশ ও সময়টাও ছিল তেমনি বিষ্ফোরক। অবস্থাগতিকে মার্শাল-লর প্রেসিডেনশিয়াল শাসনটা চেহারা ও প্রকৃতিতে হইয়া পড়ে পূর্ব-পাকিস্তানীদের উপর পশ্চিম পাকিস্তানীদের সার্বিক ও সামগ্রিক শাসন। তার উপর প্রেসিডেন্ট আইউব মাত্র কয়েকদিন আগে পূর্ব-পাকিস্তানীদেরে ভারতের আদিম অধিবাসী ধর্ম-কৃষ্টিতে হিন্দু প্রভাবিত স্বাধীনতায় অনভ্যস্ত ও স্বায়ত্তশাসনের অযোগ্য নাহক সন্দেহরায়ণ ক্ষুদ্র অন্তঃকরণের লোক ইত্যাদি বলিয়া গালি দিয়াছিলেন। দুই অঞ্চলের অধিবাসীদের মধ্যে শুধু আর্থিক ও রাজনৈতিক অসাম্যই সৃষ্টি করেন নাই, গৃহযুদ্ধ ও অস্ত্রের যুক্তিরও ডর দেখাইয়া দুই পাকিস্তানের অধিবাসীদের মধ্যে আমর-তোমরা মনোভাব তীব্র করিয়াছিলেন। এমনি সময়ে এবং এই পরিবেশে আগড়তলা মামলা দায়ের করায় পূর্ব বাংলায় দল-মত নির্বিশেষে জনগণের মনে এই প্রতিক্রিয়া হইল যে গোটা পূর্ব বাংগালীর বিরুদ্ধেই এই মামলা দায়ের করা হইয়াছে। সকল দলের রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যে অমন সংঘবদ্ধ প্রতিরোধের ভাব গড়িয়া উঠিল যে তাঁরা প্রায় সমস্বরেই বলিলেন : আগড়তলা মামলা প্রত্যাহার না করা পর্যন্ত প্রেসিডেন্ট আইউব-প্রস্তাবিত গোলটেবিল বৈঠকে তাঁরা যোগ দিবেন না। ছাত্র-জনতার ফাটিয়া পড়া বিক্ষোরে সামনে নেতাদের অমন করা ছাড়া গত্যন্তর ছিল না।
নিখিল-পাকিস্তান গণ-আন্দোলনের অংশ হিসাবেই পূর্ব-বাংলার ছাত্র তরুণদের নেতৃত্বে এই সার্বজনীন গণ-আন্দোলন চলিতেছিল। আগড়তলা মামলা এই আন্দোলনের বহিতে বিশেষ ইন্ধন যোগাইল।
শেষ পর্যন্ত প্রেসিডেন্ট আইউব গণ-আন্দোলনের চাপে জন-মতের সামনে মাথা হেট করিলেন। আগড়তলা মামলা প্রত্যাহৃত হইল। বড় দেরিতে জন-মতের সামনে মাথা হেট করিয়া মামলা প্রত্যাহার করা হইয়াছিল বলিয়াই একজন সম্মানিত বিচারপতিকে অপমান সহিতে হইয়াছিল। ঐ বেশি দেরি হওয়ার কারণেই জন মতের কাছে আইউবের মাথা হেট করাটা যথেষ্ট গ্রেসফুল হয় নাই। তাই আইউবের পতন তাতে প্রতিরুদ্ধ হয় নাই। ব্যক্তি বিশেষের পতনে জাতির বিশেষ কিছু আসে যায় না। আইউবের পতনেও আসিয়া যাইত না। কিন্তু জাতির দুর্ভাগ্য এই যে ঘটনাটা দুই অঞ্চলের মধ্যে তিক্ততা দুরপনেয় করিয়া তুলিয়াছে। এইদিক হইতে আইউবের আমলটা হইয়া পড়িয়াছে পাকিস্তানের ইতিহাসের সবচেয়ে অন্ধকার যুগ।
৫. নেতাদের ভুল
পাকিস্তানের সমস্ত দুর্ভাগ্যের জন্য দায়ী দেশের নেতৃবৃন্দ, এ কথা পুনরাবৃত্তির অপেক্ষা রাখে না। পাকিস্তানের মত এমন সমস্যাহীন নয়া রাষ্ট্র আর হয় না। এক ভৌগোলিক সমস্যা ছাড়া বলিতে গেলে পাকিস্তানের আর কোন সমস্যাই ছিল না। একটু বুদ্ধি খরচ করিয়া গণতান্ত্রিক পন্থাতেই এ সমস্যার সমাধান করা যাইত। তা না করিয়া নেতারা কেকল নিত্য-নতুন সমস্যা সৃষ্টিই করিয়া গিয়াছে। ফলে আজ আমাদের জাতীয় জীবনে সমস্যার অন্ত নাই।
নেতাদের গোড়ার ভুল এই যে যে-একক মনীষা ও নেতৃত্বের বলে তাঁরা পাকিস্তান পাইলেন, সেই কায়েদে-আযমের ওসিয়তের বরখেলাফে পাকিস্তানের রাজনীতিকে তারা ভুল পথে চালাইলেন। নেশন-স্টেট হিসাবে পাকিস্তান গড়িবার প্রথম শর্ত যে পাকিস্তানী নেশন তৈয়ার করা, তাই তাঁরা করিলেন না। ফলে নেতারা নিজেরা গণতন্ত্রী হইলেন না। জনগণকে গণতন্ত্রের পথে শক্তিশালী করিলেন না। তার অবশ্যম্ভাবী পরিণাম স্বরূপ সরকারী কর্মচারিরা রাজনীতি করিতে লাগিলেন। নেতারাই তাঁদেরে রাজনীতি করাইলেন। অবস্থা-গতিকে সরকারী কর্মচারিরাই আমাদের দেশে শিক্ষিত সম্প্রদায়ের ক্রিম। ক্ষমতাসীন অফিসার ও রাজনৈতিকের মধ্যে একমাত্র পার্থক্য এই যে একজন নিয়োজিত আরেকজন নির্বাচিত। বিনা-নির্বাচনের রাজনীতিই যদি করিতে হয়, তবে আর অপেক্ষাকৃত কম ডিগ্রীধারী পলিটিশিয়ানদের নেতৃত্ব কেন? অপেক্ষাকৃত উচ্চ ডিগ্রিওয়ালা অফিসাররাই ভাল। অতএব তাঁরা নিজেরাই রাষ্ট্রনায়কত্ব গ্রহণ করিয়াছেন। স্থায়ী সরকারী কর্মচারিদের যে-রাজনৈতিক নিরপেক্ষতাই পার্লামেন্টারি শাসনতন্ত্রের বুনিয়াদ, পাকিস্তানে আজ সে বুনিয়াদই ভাংগিয়া পড়িয়াছে। সরকারী কর্মচারি অপেক্ষা রাজনৈতিক নেতাদের দোষেই এটা ঘটিয়াছে।
