আইউবের দূর্ভাগ্য এই যে যে-দৃষ্টিশক্তির জোরে তিনি জনগণের অদৃশ্য অযোগ্যতা আবিষ্কার করিতে পারিলেন, তার জোরে তিনি নিজের অনুচরদের সুস্পষ্ট যোগ্যতা দেখিতে পারিলেন না। স্পষ্টতঃই তাঁর লং সাইটের মত শর্ট সাইটটা তেজী না। গোড়ায় তিনি পাকিস্তান রক্ষার জন্য নয়, বরঞ্চ ব্যক্তিগত ক্ষমতা-লোভেই, পদাধিকারের অপব্যবহার করিয়া রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করিয়াছিলেন। কিন্তু সে ক্ষমতা দখলের পরে তিনি সত্য-সত্যই দেশের ভাল করিতে পারিতেন। তিনি বুদ্ধিমান ছিলেন। তাঁর বিদ্যা-বুদ্ধি ও অভিজ্ঞতা ছিল। একাদিক্রমে আট বছর পাকিস্তানের প্রধান সেনাপতি এবং ঐ সংগে প্রায় বছর খানেক দেশরক্ষা মন্ত্রী থাকার ফলে তাঁর একটা আন্তর্জাতিক ‘পুল’ গড়িয়া উড়িয়াছিল। ঐ সংগে তিনি একটা ব্যক্তিত্বের অধিকারী ছিলেন। এতসব গুণের অধিকারী হইয়াও কোনও লোক নির্বিঘ্নে দশ বছর দেশ শাসন করার সুযোগ পাইলে তিনি ভাল না হইয়া পারেন না। গোড়াতে যতই খারাপ হউন, মহান দায়িত্বই তাঁকে মহৎ করিয়া তুলে। আইউবের দোষ এইখানে যে তিনি দশ দশটা বছরেও মহৎ হইয়া উঠিতে পারেন নাই। ক্ষমতা মানুষকে খারাপ করে, চূড়ান্ত ক্ষমতা চূড়ান্তভাবেই খারাপ করে। লর্ড এ্যাকটনের এই কথাটা আইউব আগেই জানিতেন নিশ্চয়। তাঁর মত বুদ্ধিমান বিদ্বান লোকের পক্ষে ক্ষমতার মোহে অন্ধ হওয়া উচিৎ ছিল না। তিনি বলিবেনঃ তাঁর স্বার্থপর স্তাবকেরা তাঁকে ভাল হইতে দেন নাই। তাঁর এতদিনের পূজারীরা বলিবেনঃ আইউবকে সুবুদ্ধি তাঁরা দিয়াছিলেন; আইউব তাঁদের পরামর্শ মানেন নাই।
দুই পক্ষের কথাই আংশিক সত্য আংশিক অসত্য। প্রথমতঃ স্তাবকের তুলনায় সুপরামর্শদাতার সংখ্যা ছিল নগণ্য। দ্বিতীয়তঃ সুপরামর্শ যাঁরা দিয়াছেন, তাঁরাও দেশ বা আইউবের ভালর জন্য দেন নাই, নিজেদের স্বার্থেই দিয়াছেন। কাজেই সুপরামর্শ হিসাবে ও-সবের কানাকড়ি দাম ছিল না। সভা-সমিতির জনতা দেখিয়া আইউব ঠিকই ভুল বুঝিয়াছিলেন যে ঐ বিপুল জনতা তার সমর্থক। সব ডিক্টেররাই কুস্তিগিরের মতই তামাশার বস্তু। তাঁরাও ঐ ভুল করিয়াছেন। কিন্তু এটাও তাঁরা জানিতেন যে স্তাবক-অনুচররা সবাই নিজ নিজ স্বার্থের জন্যই তাঁদের স্তাবকতা করিতেছেন। আইউবের ল হইয়াছিল এইখানে যে এত এত স্বার্থপর লোকের মধ্যে বাস করিয়াও তিনি নিজের আসল স্বার্থটা বুঝিতে পারেন নাই। তাঁর আসল স্বার্থ ছিল দেশবাসীর ভাল করিয়া নিজেকে অমর করা। রাষ্ট্রের সব ক্ষমতা তাঁর মধ্যে কেন্দ্রীভূত গোটা জাতির ভাগ্য তাঁর হাতে নিহিত। এই হিসাবে তাঁর ভালমন্দ জনগণের ভাল-মন্দের সাথে ওতপ্রোতভাবে গ্রথিত। তিনি একা এখানে সমস্ত স্তাবক হইতে পৃথক। স্তাবকেরা তাঁর কাঁধে বন্দুক রাখিয়া যাঁর-তাঁর স্বার্থের পাখি মারিয়া যাইতেছেন। সব রাষ্ট্র-ক্ষমতা তাঁর হাতে কেন্দ্রীভূত থাকায় দেশের অনিষ্টের জন্য তিনি ছাড়া আর কেউ দায়ী নন। এই অবস্থা ও পরিবেশেই তিনি স্তাবকদের স্বার্থ শিকারের বন্দুকটা নিজের কাঁধে লইয়ছিলেন। এইখানেই তিনি ছিলেন স্তাবকদের অনুসারী। স্তাবকরা তাঁর অনুসারী ছিলেন না। স্তাবকদের কথা না রাখিয়া তাঁর উপায় ছিল না।
সব ডিক্টেটরের পরিণতি এই। গোড়াতে তাঁরা সত্যিই ডিক্টেটর থাকেন। কিন্তু শেষ দিকে ডিক্টেটররা হইয়া পড়েন অনুচরদের দ্বারা ডিক্টেটেড। ক্ষমতা, স্বার্থ ও সম্পদ হাসিলের পর ডিক্টেটররা ও-সব রক্ষার জন্যই স্তাবক-অনুচদের উপর নির্ভরশীল হইয়া পড়েন। ওরা তখন হইয়া উঠেন ডিক্টটরের সব ক্ষমতা ও সম্পদের শরিক। কাজে-কর্মে ব্যবহার-আচরণে ওরা তখন ডিক্টেটরকে বুঝাইয়া দেন তাঁরাও ঐ ক্ষমতা ও সম্পদের অংশ চান। ‘না’ বলিবার তখন উপায় থাকে না। দিতেই হয় তা যত অন্যান্য পন্থায় হউক না কেন? অবস্থা শেষ পর্যন্ত এমন দাঁড়ায় যে বিবেকের দংশনে অথবা পরিতৃপ্তিতে ডিক্টেটর যদি ক্ষমতা ও সম্পদ বর্জন করিতে চান, তিনি তা পারেন না। ডিক্টেটর তখন বড় দেরিতে বুঝিতে পারেন যে তিনি নিজেই ডিক্টেটরি যন্ত্রের গোলাম হইয়া পড়িয়াছেন। তিনি আর সে যন্ত্র চালান না। যন্ত্রই এখন তাঁকে চালায়। তিনি ক্ষুধার্ত সিংহের পিঠের সওয়ার। সে পিঠ হইতে নামার আর উপায় নাই। নামিলে তাঁর বাহন ঐ সিংহই তাঁকে খাইয়া ফেলিবে। সব ডিক্টেটরই পরিণামে এমনি করিয়া নিজের শিকার নিজেই হইয়া পড়েন।
আইউবের সবচেয়ে মারাত্মক ভুলটা হইয়াছিল এই যে তিনি জনগণকে না চিনিয়া তাদের পরিচালক হইতে গিয়াছিলেন। দেশবাসীকে ঘৃণা করিয়া তিনি দেশের নেতা বনিতে চাহিয়াছিলেন। জনতার সমবেত বুদ্ধির চেয়ে নিজের বুদ্ধিকে শ্রেষ্ঠ মনে করুন যাঁরা, তাঁরা দুই রকমে মানুষের নেতা হইতে পারেন। এক, বই-পুস্তক লিখিয়া তাঁরা চিন্তা-নায়ক হইতে পারেন। দুই, ত্যাগ ও সংগ্রামের পথে সশরীরে গণ-যুক্তি আন্দোলনের নেতৃত্ব করিতে পারেন। সারাজীবন সুখের সরকারী চাকরি করিবেন, পান হইতে চুনটি খসিতে দিবেন না, আর শেষ জীবনে জোর করিয়া রাষ্ট্র-নায়ক হইবেন, তা হয় না। আইউব তাই করিতে চাহিয়াছিলেন। অমন চিন্তা-নায়ক, সফল অফিসার ও অভিজ্ঞ রাজনীতিক সবই দেশের জন্য দরকার। কিন্তু একের কাজ অপরের সাজে না।
