দুইদিন আগেই ৮ই মার্চ লাহোরে নেতৃবৃন্দের প্রতি বৈঠক বসিল। একটি সর্বসম্মত দাবি রচনা করাই ঐ বৈঠকের উদ্দেশ্য। সে উদ্দেশ্যে একটি সাব কমিটিও গঠিত হইল। ফেডারেল পার্লামেন্টারি পদ্ধতি, সার্বজনীন প্রত্যক্ষ ভোট, জনসংখ্যার ভিত্তিতে প্রতিনিধিত্ব, পশ্চিম পাকিস্তানের ইউনিট বাতিল ইত্যাদি বিষয়ে নেতারা একমত হইলেন। কিন্তু আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন ও পশ্চিম পাকিস্তানের সাব-ফেডারেশন সম্বন্ধে তাঁরা একমত হইলেন না। শেষ পর্যন্ত মাত্র দুইটি বিষয়ে সর্বসম্মত একটি প্রস্তাব লইয়া নেতারা ১০ই মার্চ পিণ্ডিতে গোলটেবিলে যোগ দিলেন। সম্মিলনীর বৈঠক তিন দিন চলিল। নেতাদের মধ্যে প্রচুর মতভেদ দেখা দিল। প্রেসিডেন্ট আইউব ১৬ই মার্চ সম্মিলনীর সমাপ্তি ঘোষণা করিলেন। পরবর্তী কোন বৈঠকের ব্যবস্থা না করিয়াই এটা করা হইল। তার মানে অশুভ লক্ষণ। সম্মিলনী ব্যর্থ হইয়াছে। কনফারেন্স হল হইতে বাহির হইয়াই আওয়ামী লীগ নেতা শেখ মুজিব ‘ডাক’ হইতে প্রতিষ্ঠানের সম্পর্কচ্ছেদের কথা ঘোষণা করিলেন। তাঁর সাথে যেন পাল্লা দিয়াই ‘ডাক’ প্রেসিডেন্ট নবাবজাদা নসরুল্লা ‘ডাক’ ভাংগিয়া দেওয়া ঘোষণা করিলেন। দুই নেতার কেউই যাঁর-তাঁর পার্টির কোনও বৈঠক দিয়া অন্যান্যের মতামত জিগ্গাসা করিলেন না। তার আর দরকার হইল না। গোলটেবিল বৈঠরে ফলে বিভিন্ন দলের নেতাদের মধ্যে ঐক্য বৃদ্ধি পাওয়ার বদলে অনৈক্যই বৃদ্ধি পাইল। সেটা বুঝা গেল পরবর্তী কয়েক দিনের মধ্যে। গোল টেবিলের ব্যর্থতার জন্য তাঁরা পরস্পরকে দোষাদুষি করিতে লাগিলেন। এতদিনের এত ত্যাগের এত সাধনার গণ-ঐক্য ভাংগিয়া খান-খান হইয়া গেল।
কিন্তু কোন অজ্ঞাত কারণে নেতাদের এই অনৈক্যের সুবিধা প্রেসিডেন্ট আইউব পাইলেন না। নেতাদের অনৈক্য ছাত্র-জনতার মধ্যে সংক্রমিত হইল। গণ-আন্দোলন আর রাজনৈতিক আন্দোলন থাকিল না। হইয়া উঠিল তা অরাজনৈতিক উচ্ছৃংখলতা, বন্য হিংস্রতা। এ কারণে অথবা ফলস্বরূপ প্রেসিডেন্ট আইউব প্রধান সেনাপতি জেনারেল ইয়াহিয়াকে ২৪শে মার্চের লিখিত পত্রে দেশের শাসন-ভার গ্রহণের নির্দেশ দিলেন। বেতারে নিজের পদত্যাগের কথা ঘোষণা করিলেন।
১৯৬৯ সালের ২৫শে মার্চ আবার মার্শাল ল’ ঘোষিত হইল। জেনারেল ইয়াহিয়া চিফ মার্শাল ল এডমিনিস্ট্রেটর ও প্রেসিডেন্ট হইলেন। ‘৬২ সালের শাসন বাতিল হইল। চার মাসের মধ্যেই জুলাই মাসে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া ঘোষণা করিলেন : তিনি অতিসত্বর দেশে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করিবেন। দেশময় সফর করিয়া সকল দলের নেতাদের সাথে আলাপ-আলোচনা করিয়া আরও চার মাস পরে ২৮শে নবেম্বর তিনি ঘোষণা করিলেন : আগামী ১৯৭০ সালের ৫ই অক্টোবর সার্বজনীন প্রত্যক্ষ ভোটে জনসংখ্যার ভিত্তিতে আইন-পরিষদ গঠিত হইবে। ইতিমধ্যেই ওয়ান ইউনিট ভাংগিয়া দেওয়া হইবে। নব-নির্বাচিত আইন-পরিষদ চার মাসের মধ্যে শাসনতন্ত্র রচনা করিতে বাধ্য থাকিবে। ঐ ঘোষণার চার মাস পরে ১৯৭০ সালের ২৮শে মার্চ তারিখে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া আগামী শাসনতন্ত্রের ফ্লেম ওয়ার্ক’ ঘোষণা করিলেন। তাতে তিনি কেন্দ্রীয় পরিষদের মোট সদস্য সংখ্যা ৩১৩ জন নির্ধারিত করিয়া দিলেন। পূর্ব-পাকিস্তানের জন্য তিনি ৭ জন মহিলা সদস্যসহ ১৬৯ জন ও পশ্চিম পাকিস্তানের বিভিন্ন প্রদেশের জন্য আলাদাভাবে ৭ জন মহিলা-সদস্যসহ মোট ১৪৪ জন মেম্বর নির্দিষ্ট করিয়া দিলেন। ঐ সংগে তিনি আরও ঘোষণা করিলেন যে ২২শে অক্টোবর তিনি পূর্ব-পাকিস্তান পরিষদের জন্য ১০ জন মহিলাসহ মোট ৩১০ ও পশ্চিম পাকিস্তানে বিভিন্ন প্রদেশের পরিষদের জন্য ১১ জন মহিলাসহ ৩২১ জন মেম্বর নির্ধারিত করিয়া দিয়াছেন। কেন্দ্রীয় আইন সভা গণ-পরিষদরূপে চার মাসে শাসনতন্ত্র রচনা শেষ করিবে। তার পরে মেজরিটি পার্টি বা কোয়েলিশন মন্ত্রিসভা গঠন করিবে। মার্শাল ল উঠিয়া যাইবে। নির্বাচিত সরকারের হাতে রাষ্ট্রক্ষমতা হস্তান্তরিত হইবে। ইহাই বর্তমানে আমাদের দেশের নেট রাজনৈতিক পরিস্থিতি।
৩. আইউবের ভুল
জেনারেল আইউবের ভুল ভ্রান্তি ও স্বৈরাচারের সমালোচনা করিবার জন্য এই পুনশ্চের অবতারণা করা হয় নাই। আইউব আজ পরাজিত পদচ্যুত। তিনি আজ শক্তিহীন। সম্ভবতঃ অসুস্থ। আজ তাঁর নিন্দা করা অতি সহজ। সে জন্য আজ সবাই তাঁর নিন্দা করিতেছেন। নিন্দার তিনি যোগ্যও। কিন্তু আমার বিবেচনায় নিন্দার চেয়ে তিনি আফসোসের পাত্ৰই বেশি। তাঁর এক কালের সমর্থক অনুচররাও তাঁর নিন্দা করিতেছেন। এটা শুধু আইউবের দুর্ভাগ্য নয়। জাতিরও দুর্ভাগ্য। কারণ এতে আমাদের জাতীয় চরিত্র প্রকট। ক্ষমতায় থাকা পর্যন্ত যাঁরা অন্যায়কারীকে জিন্দাবাদ দেন, তাঁরা আসলে অন্যায়কারীর পূজা করেন না। নিজেদের স্বার্থেরই পূজা করেন। ওঁরাই যখন গদি চ্যুতির পর তাঁর নিন্দায় অন্য সবাইকে ছাড়াইয়া যান, তখনও তাঁরা দেশের স্বার্থে তা করেন না, নিজেদের স্বার্থেই করেন। এরা সাধারণ স্বার্থপর ক্ষুদ্র অন্তরের বিষয়ী মানুষ। সব দেশেই সব জাতিরই মধ্যেই এই ধরনের কিছু লোক থাকে। থাকিবেও। কারণ মানুষ মানুষই, ফেরেশতা নয়। পাকিস্তানের দুর্ভাগ্য এই যে এই ধরনের লোকের সংখ্যা অন্য দেশের চেয়ে বেশী। এত বেশী যে আইউবও তার পরিমাণ আন্দায করিতে পারেন নাই। পারিলে তিনি হুঁশিয়ার হইতে পারিতেন।
