নিমজ্জমান তরী ভাসাইয়া রাখিবার উদ্দেশ্যে প্রেসিডেন্ট আইউব ‘উন্নয়ন দশক’ উত্যাপনের আয়োজন করিলেন বছরের শুরুতেই। আইউব ও তাঁর ফন্দিবায উপদেষ্টাদের সমবেত চেষ্টায় আয়োজনটাও হইল নিখুঁত। উদ্যাপনটাও চলিল বিপুল জাক-জমকে। বছর দীঘালি উৎসবের আয়োজন হইয়াছিল। খবরের কাগজের খরিদ করা পৃষ্ঠাকে-পৃষ্ঠায়, দালান-ইমারতের গাত্র-চূড়ায় অফিস-আদালতের ভিতর বাহিরে, সরকারী-বেসরকারী চিঠি-পত্রে, কভার-লেটারহেডে, রেলস্টেশনে ও বিমানবন্দরের আষ্টেপৃষ্ঠে, রাস্তা-ঘাটে, নদী-বন্দরে, ট্রেনে-বাসে, মানুষের বুকে-পিঠে, এক কথায় আসমান-জমিনের মধ্যেকার সকল স্থানে উন্নয়ন দশকের আগুন দাউ দাউ করিয়া জ্বলিয়া উঠিল। আগে কেউ বুঝিতে না পারিলেও এইবার সবাই বুঝিল, ‘উন্নয়ন’ সত্যই হইয়াছে। উন্নয়নের আলোকসজ্জায় রাত হইল দিন। কাজেই দিনও রাত হইবার সময় হইল আসন্ন।
ন বছরের নিরবচ্ছিন্ন জুলুম-সেতম, বঞ্চনা-প্রবঞ্চনা, নির্লজ্জ উন্নতশির দুর্নীতি, দুঃসাহসিক স্বজনপ্রীতি, রাষ্ট্রীয় তহবিলের বেপরোয়া ছিনিমিনি, জনমতের প্রতি গর্বিত বুড়া আংগুল প্রদর্শন ইত্যাদি-ইত্যাদি নজিরবিহীন সুশৃংখল অরাজকতা দেখিয়া পাকিস্তানের গণ-মন যখন স্তম্ভিত অসাড় ও নিষ্পন্দ, ঠিক সেই সময়ে কাটা ঘায়ে নূনের ছিটা দিয়া, জুতা মারার পরেও আরও অপমান করিয়া ও ‘মড়ার উপর খাড়ার ঘা’ মারিয়া প্রেসিডেন্ট আইউব ও তাঁর সহকর্মীরা দেশের সেই অসাড় নিস্পন্দ দেহে ইলেকট্রিক শক ট্রিটমেন্ট করিলেন। আগড়তলা মামলা এই থিরাপির শেষ বড় ডোয়। এর আশু ফল ফলিল। কুম্ভকর্ণের নিদ্রা ভংগ হইল। আসহাব-কাহাফের ঘুম টুটিল। তারা জাগিল। চোখ কচলাইতে-কচলাইতে নয়। চমকিয়া উঠিয়া। বিছানায় বসিয়া নয়। লাফ দিয়া দাঁড়াইয়া। ঘুমন্ত জনতার নিদ্রা ভংগ হয় এমনি করিয়াই।
ফল হইল এক বিস্ময়কর। অচিন্তনীয়। গণ-ঐক্যের ভাংগা কিল্লায় নিশান উড়িল। উন্নয়ন দশকের শেষ বছর শেষ হইবার আগের পাকিস্তানের রাষ্ট্র দেহের বিডি পলিটিক) বিভিন্ন প্ৰত্যংগে ব্রন ফোড়া ও ইপারশন দেখা দিল। মেলিগন্যান্ট টাইপের। শেষ পর্যন্ত গণ-বিক্ষোভের আকারে বিষফোড়া ফাটিয়া পড়িল। ১৯৬৮ সালের অক্টোবর হইতে ১৯৬৯ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত চার-চারটা মাস দেশবাসী কাটাইল সুখের দায় দুঃস্বপ্নের মধ্যে। একের পর আরেকটা বিক্ষোভের বিফোরণ ফাটিতে লাগিল উপরে নিচে ডাইনে বাঁয়ে।
শেষ পর্যন্ত ১৯৬১ সালের পয়লা ফেব্রুয়ারি প্রেসিডেন্ট আইউব ঘোষণা করিলেন রাজনৈতিক নেতাদের সাথে তিনি আলোচনা করিতে রাখী আছেন। এতদিনের ‘ধিকৃত ঘৃণিভজনগণ-কবর্জিত’ নেতাদের সাথে ডিক্টেটরআইউবের আলোচনা? দেশবাসী যা বুঝিবার বুঝিল। আইউবের ভক্তরাও কি বুঝিলেন না? নিশ্চয় বুঝিলেন। তাদের মধ্যে সন্ত্রাস সৃষ্টি হইল। ইতিমধ্যে রাজনীতিক নেতারা প্রায় সব দল মিলিয়া ডিমোক্র্যাটিক এ্যাকশন কমিটি (ডাক) গঠন করিয়াছিলেন। তাঁরা প্রেসিডেন্টকে জানাইলেন : আলোচনায় বসিতে তাঁরাও রাখী।
ভারপর ৫ই ফেব্রুয়ারি প্রেসিডেন্ট আইউব আরেক বিবৃতিতে ডাকের প্রেসিডেন্ট নবাবজাদা নসরুল্লা খাঁর দেশপ্রেমের মুখ-রা তারিফ করিয়া গোলটেবিল বৈঠকে নি+যোগ্য নেতাদের তালিকা করিবার ভার একচ্ছত্রভাবে তাঁর উপর দিয়া দিলেন। তিনি সে দায়িত্ব গ্রহণ করিলেন। ১৬ই ফেব্রুয়ারি সে কথা নবাবজাদা নসরুল্লা খাঁ ‘ডাকের’ পক্ষ হইতে যাবেদাভাবে প্রেসিডেন্ট আইউবকে জানাইয়া দিলেন। সবই চলিতে লাগিল ‘একডিং টু প্ল্যান’। এরমধ্যে কোথায় কি ঘটিল জানা গেলনা। হঠাৎ ২১শে ফেব্রুয়ারি (পূর্ব-বাংলার ভাষা-আন্দোলনের ঐতিহাসিক শহীদ দিবস এক অঘোষিত বেতার-ভাষণে সকলকে বিস্মিত করিয়া প্রেসিডেন্ট আইউব ঘোষণা করিলেনঃ তিনি প্রেসিডেন্ট পদের জন্য আর কনটেস্ট করিবেন না। তিনি সম্ভবত উপদিষ্ট হইয়াছিলেন যে এমন ঘোষণায় তাঁর বিরুদ্ধে জনগণের ক্রোধ প্রশমিত হইবে; বিক্ষোভ নরম হইবে। হয়ত কোনও-কোনও কোয়ার্টার হইতে অনুরোধ আসিবে না সার আপনি মেহেরবানি করিয়া অন্ততঃ আরেকটা টার্ম দেশবাসীকে নেতৃত্ব দান করুন। কিন্তু কেউ কিছু বলিলেন না। বিক্ষোভ নরম হওয়ার বদলে আরও গরম হইল। ভক্তবৃন্দের সন্ত্রাস দিশাহারা আতংকে পরিণত হইল। চাচা আপন বাঁচা বলিয়া ভক্তেরা ছুটাছুটি শুরু করিয়া দিলেন।
২৬শে ফেব্রুয়ারি গোলটেবিল বৈঠকের তারিখ আগেই স্থির করা হইয়াছিল। ন্যাপ-নেতা মওলানা ভাসানী ও পিপলস পার্টির নেতা জনাব তুই গোল টেবিলে যোগ দিবেন না জানাইলেন। আওয়ামী লীগ নেতা শেখ মুজিবুর রহমান বৈঠকে যোগ দিতে রাধী হইলেন। কিন্তু আগড়তলা মামলার আসামী হিসাবে যোগ দিতে সম্মত হইলেন। ‘ডাক’ নেতারাও শেখ মুজিবকে ছাড়া আলোচনায় যোগ দিবেন না, জানাইয়া দিলেন। শেষ পর্যন্ত আগড়তলা মামলা প্রত্যাহার করিয়া শেখ মুজিবকে গোলটেবিলে যোগদানের ব্যবস্থা করা হইল। কারামুক্ত স্বাধীন ব্যক্তি হিসাবে শেখ মুজিবুর রহমান গোল টেবিলে যোগ দিলেন। তাঁর মর্যাদা ও জনপ্রিয়তা আকাশচুম্বী হইল।
নির্ধারিত দিন-ক্ষণে যথারীতি গোল টেবিল বৈঠক বসিল। যথারীতি পারস্পরিক শুভেচ্ছা ও তারিফ-তারুফের শিষ্টাচারের পর আসন্ন ঈদের দরুন সম্মিলনী মুলতবি হইল। ১০ই মার্চ পরবৰ্তী বৈঠকের দিন স্থির হইল।
